শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ।। ১ কার্তিক ১৪৩৩ ।। ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :

স্বামী-স্ত্রীর কেউ পরকীয়ায় জড়ালে অপরজনের করণীয় কী?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক 

পরকীয়া দাম্পত্য জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি। এটি স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বিশ্বাস, আমানত ও অধিকার ক্ষুণ্ন করে। এর প্রভাব শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও পারিবারিক স্থিতিশীলতাও পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইসলামে ব্যভিচার ও তার দিকে নিয়ে যায়—এমন কাজ থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। তাই স্বামী কিংবা স্ত্রী—কেউ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে অপরজনের করণীয় কী এবং এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট স্বামীর ইমামতিতে নামাজ আদায়ের বিধান কী, তা জানা জরুরি।

পরকীয়া সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا

“আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত মন্দ পথ।”(সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৩২)

রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন,

لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ

“ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন সে মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না।”(বুখারি, হাদিস ২৪৭৫; মুসলিম, হাদিস ৫৭)

স্বামী-স্ত্রীর কেউ পরকীয়ায় জড়ালে অপরজনের করণীয়

স্বামী কিংবা স্ত্রী—যে-ই অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ুক, অপরজনের উচিত ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও শরিয়তের সীমারেখা মেনে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

১. গুনাহের ভয়াবহতা বোঝানো ও তাওবার আহ্বান জানানো

প্রথমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পরকীয়া, অবৈধ প্রেম ও ব্যভিচারের ভয়াবহতা বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহর অসন্তুষ্টি, গুনাহের পরিণতি এবং পরিবারে এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে নসিহত করা যেতে পারে।

তবে নসিহতের নামে অপমান, মারধর কিংবা জোরজবরদস্তি করা সমাধানের সঠিক পন্থা নয়। সংশোধনের সুযোগ দেওয়া। খালেস তাওবার প্রতি উৎসাহিত করা উচিত।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন,

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

“বলুন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩)

এ আয়াতে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে তাঁর কাছে ফিরে আসার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। তাই পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়া ব্যক্তির উচিত অবৈধ সম্পর্ক ছিন্ন করা। আন্তরিকভাবে তাওবা করা। ভবিষ্যতে এ গুনাহে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা।

২. হেদায়েতের জন্য দোয়া করা

পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়া ব্যক্তি যেন গুনাহ থেকে ফিরে আসে, সে জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করা উচিত। দাম্পত্য জীবনে শান্তি ও পারস্পরিক ভালোবাসা ফিরিয়ে আনার জন্যও দোয়া করা যায়।

আল্লাহ তাআলা নেক জীবনসঙ্গী ও সন্তানদের চোখের প্রশান্তি হওয়ার দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন।

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

“হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের প্রশান্তি দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানান।”(সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭৪)

৩. দাম্পত্য সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করা

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি, অসন্তোষ কিংবা সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। পারস্পরিক অধিকার আদায়, একে অপরকে সময় দেওয়া, সদাচরণ এবং সঙ্গীর প্রয়োজন বোঝার বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।

তবে দাম্পত্য জীবনে সমস্যা থাকলেও তা পরকীয়া বা অবৈধ সম্পর্কের বৈধতা দেয় না। কোনো পক্ষের আচরণে অসন্তুষ্ট হলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে; অন্যায় সম্পর্কের মাধ্যমে নয়। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের কাজের জন্য নিজেই দায়ী।

৪. স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে শরিয়তের বিধান বিবেচনা করা

স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে শরিয়তের বিধান, ন্যায়বিচার, আর্থিক সামর্থ্য এবং সংশ্লিষ্ট সবার অধিকার বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আলোচনা হতে পারে।

তবে স্ত্রী দ্বিতীয় বিয়েতে সম্মতি না দিলে তাকে স্বামীর পরকীয়ার জন্য দায়ী করা যাবে না। স্বামী বা স্ত্রী—কেউই নিজের অবৈধ সম্পর্কের দায় অন্যের ওপর চাপাতে পারেন না। দ্বিতীয় বিয়ে ও পরকীয়া দুটি পৃথক বিষয়; একটিকে অন্যটির অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা সমীচীন নয়।

৫. প্রয়োজনে পারিবারিক সালিশ বা আইনগত সহায়তা নেওয়া

ব্যক্তিগতভাবে সমস্যার সমাধান সম্ভব না হলে বিশ্বস্ত অভিভাবক, বিচক্ষণ আলেম কিংবা পারিবারিক সালিশের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে এবং কারও অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকলে প্রযোজ্য আইনগত সহায়তাও নেওয়া যেতে পারে।

তবে অভিযোগের সত্যতা ও প্রমাণ বিবেচনা না করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়। সন্দেহ, গুজব কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে কারও সম্মানহানি করা ইসলামের ন্যায়বিচারের শিক্ষার পরিপন্থী।

৬. সংশোধনের চেষ্টা ব্যর্থ হলে বিচ্ছেদের বিষয়টি বিবেচনা করা

নসিহত, দোয়া, পারিবারিক মধ্যস্থতা ও সংশোধনের চেষ্টা সত্ত্বেও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবং দাম্পত্য জীবন অসহনীয় হয়ে উঠলে বিচ্ছেদের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান, উভয়ের অধিকার এবং সন্তানদের কল্যাণ বিবেচনায় নিয়ে অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ইমামের স্ত্রী পরকীয়ায় জড়ালে তাঁর পেছনে নামাজের বিধান

কোনো ইমাম সাহেবের স্ত্রী পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে ওই ইমাম সাহেবের পেছনে নামাজ আদায় করা যাবে কি না? এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, স্ত্রীর অপরাধের দায় স্বামীর ওপর বর্তায় না। স্বামী নিজে যদি ওই অপরাধে জড়িত না থাকেন, বরং স্ত্রীকে সংশোধনের চেষ্টা করেন, তাহলে শুধু স্ত্রীর অপরাধের কারণে স্বামীকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ

“কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।”(সূরা আল-আনআম, আয়াত ১৬৪)

এ আয়াত দ্বারা এ কথা বোঝা যায়, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের কাজের জন্য দায়ী; একজনের অপরাধের দায় অন্যের ওপর চাপানো যায় না।

অতএব, কোনো ইমাম সাহেবের স্ত্রী পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছেন—এমন অভিযোগের কারণে ওই ইমাম সাহেবের পেছনে নামাজ আদায়কে অবৈধ বলা যাবে না। ইমাম সাহেবের নিজের আকিদা, আমল এবং ইমামতির যোগ্যতা বিবেচ্য। তাঁর নিজের পক্ষ থেকে ইমামতির পরিপন্থী কোনো বিষয় প্রমাণিত না হলে শুধু স্ত্রীর অপরাধের কারণে তাঁর ইমামতিতে নামাজ আদায়ে বাধা নেই।

বরং এমন সংকটের সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানো, তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়া এবং সমস্যা সমাধানে সহযোগিতা করা উচিত।

পরকীয়া গুরুতর গুনাহ এবং দাম্পত্য জীবনের জন্য ধ্বংসাত্মক। স্বামী বা স্ত্রী—যে-ই এ অপরাধে জড়িত হোক, তার উচিত আন্তরিকভাবে তাওবা করে অবৈধ সম্পর্ক থেকে ফিরে আসা। অপর পক্ষের উচিত পরিস্থিতি অনুযায়ী নসিহত, দোয়া, পারিবারিক মধ্যস্থতা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তার পথ অনুসরণ করা।

আর কোনো ইমাম সাহেবের স্ত্রী অপরাধে জড়িত হলে শুধু সে কারণে ইমাম সাহেবকে দায়ী করা কিংবা তাঁর পেছনে নামাজ আদায় নিয়ে আপত্তি তোলা সমীচীন নয়। প্রত্যেকের দায় তার নিজের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার, পরিবারে শান্তি বজায় রাখার এবং সঠিক পথে ফিরে আসার তাওফিক দান করুন।

এসএইচ/ 


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ