বিশেষ প্রতিনিধি
আট দল বা এগার দলের আসন সমঝোতার ঘোষণা শিগগির আসবে-এমন খবর গত কয়েক সপ্তাহে অসংখ্য বার গণমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু সেই ‘শিগগির’ আর শেষ হচ্ছে না। ভোটের ট্রেন পুরোদমে চলতে শুরু করলেও জামায়াতসহ ইসলামি ও সমমনা দলগুলোর জোট বা সমঝোতার চূড়ান্ত রূপ এখনো ঘোষণা হয়নি। ফলে বিএনপিবিরোধী বলয়ের রাজনীতিতে অনেকটা পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিএনপি ও তাদের মিত্র দলের প্রার্থীরা যখন পুরোদমে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন তখনও বিপরীতে কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন সেটা অনেক আসনেই চূড়ান্ত হয়নি। ফলে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে সময় কাটছে বিভিন্ন দলের প্রার্থী ও সমর্থকদের।
বার বার আশ্বাস দিয়েও প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করতে না পারায় এগার দলের অন্তর্ভুক্ত তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেটা আকারে-ইঙ্গিতে প্রকাশও করছেন। আবার নানা সময় ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুজবেও গা ভাসাচ্ছেন নেতাকর্মীরা। কেউ এসব গুজবে খুশি হচ্ছেন, আবার কেউ হচ্ছেন ক্ষুব্ধ। কোন দল কতটি আসন পাচ্ছে এটা নিয়ে নানা পরিসংখ্যান ফেসবুকে ভেসে বেড়াচ্ছে। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমও বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরছে। তবে দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন, এখনো চূড়ান্ত কিছু হয়নি। সব পরিসংখ্যানই অনুমাননির্ভর।
জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ আটটি ইসলামি ও সমমনা দল কয়েক মাস ধরেই একসঙ্গে পথ চলছে। আগামী নির্বাচনে ‘একবাক্স নীতি’ অবলম্বন করে লড়াইয়ের সিদ্ধান্তও নিয়েছে তারা। কথা ছিল, মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময়ের আগেই কে কত আসনে লড়বে সেটা চূড়ান্ত হবে। প্রতি আসনে একটি দলের প্রার্থীই লড়বেন, শরিক অন্য কোনো দলের প্রার্থী থাকবে না।
কিন্তু গোলমাল শুরু হয় আসন সমঝোতার বিষয়টি নিয়ে গড়িমসির কারণে। শরিকদের অভিযোগ, প্রধান দল জামায়াতে ইসলামী বিষয়টি নিয়ে গড়িমসি করে তা ঝুলিয়ে দেয়। এর মধ্যেই জামায়াত এনসিপিসহ আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আট দলের সমঝোতায় যুক্ত হয় আরও তিনটি দল। বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি শুরু থেকে যুক্ত থাকা বাকি সাতটি দল। তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই নতুন দলগুলো যুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয় জামায়াতের দিকে।
জোটের পরিধি বিস্তৃত করতে গিয়ে চাপে পড়ে জামায়াত। ইসলামী আন্দোলনসহ শরিকদের কেউ কেউ বেঁকে বসে। তারা আকারে-ইঙ্গিতে জোট ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দেয়। ফলে জামায়াত নতুন করে আসন সমঝোতার বিষয়টিতে জোর দেয়। যেকোনো মূল্যে এই জোট বা সমঝোতা শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে রীতিমতো ঘাম ঝরছে নীতি-নির্ধারকদের।
জোটের শরিক একটি দলের একজন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি আসন সমঝোতার জন্য গঠিত লিয়াজোঁ কমিটিতেও আছেন। তিনি বলছিলেন- শুরুতে আমরা বিষয়টি যতটা সহজ মনে করছিলাম, কাজ করতে গিয়ে দেখলাম বিষয়টি এতটা সহজ নয়। সব দলের চাহিদা মেটানো, সবার মন রক্ষা করা একটি জটিল ব্যাপারে। এক দলের মন রাখতে গেলে আরেক দল বেঁকে বসছে। আবার কয়েকটি আসন এমন রয়েছে, যেখানে একাধিক দলের হেভিওয়েট নেতা রয়েছেন। কাকে বাদ দিয়ে কাকে দেওয়া হবে সেটা নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। এতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে।
ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, আসন বণ্টন নিয়ে কিছুটা চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়েছে। কয়েকটি আসন নিয়ে আমরা এখনো আলোচনা পর্যায়ে রেখেছি। আশা করছি দুয়েক দিনের মধ্যে সব সমাধান হয়ে যাবে। চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত নানা অনিশ্চয়তা থাকে, তাই আমরা দ্রুত ঘোষণা করার চেষ্টা করছি।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলের মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, অর্ধশতাধিক আসনে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের একটা ঝামেলা ছিল। সেসব আসনে একটি নিরপেক্ষ টিম দিয়ে জরিপ করা হয়েছে কাদের জনপ্রিয়তা বেশি। জরিপ অনুযায়ী প্রার্থী তালিকা ঠিক করা হচ্ছে।
এদিকে দেশের অনেক আসনে দলগুলোর তৃণমূল নেতাকর্মীরা অন্ধকারে রয়েছেন। তারা বুঝে উঠতে পারছেন না, তাদের আসনে শেষ পর্যন্ত জোটের প্রার্থী কে হবেন। শেষ পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা লাগতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে অনেক প্রার্থী প্রচার-প্রচারণাও কমিয়ে দিয়েছেন। আবার অনেক প্রার্থী চূড়ান্তভাবে বহাল থাকবেন কি না সেই সংশয়ে থাকার ফলে পুরোদমে নির্বাচনি মাঠে মনোযোগ দিতে পারছেন না।
কয়েকটি এলাকার তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা অপেক্ষায় আছেন দ্রুত সময়ে যেন সমঝোতার বিষয়টি ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণায় যত বিলম্ব হবে তত ১১ দল পিছিয়ে যাবে বলে মনে করছেন তারা।
আরএইচ/