|| মুফতী আনোয়ার হুসাইন ||
যেখানে বসন্ত নামে সুখের বাতাসে, সেখানে যেন নিঃশব্দে বদলে যায় পৃথিবীর চেহারা। প্রকৃতির পালা বদলের এই ক্ষণটি শুধু ঋতু পরিবর্তনের ঘোষণা নয়—এ যেন নতুন জীবনের সূচনা। ফাল্গুনের দখিনা হাওয়ায় ভেসে আসে অদৃশ্য এক আহ্বান, যা মনকে টানে অজানার দিকে, হৃদয়কে রাঙিয়ে তোলে ভালোবাসার উজ্জ্বল রঙে।
কিন্তু প্রকৃতির বসন্তের চেয়েও মহিমান্বিত এক বসন্ত আছে—সে হলো ইবাদতের বসন্ত, মাহে রমজান।
শীতের দীর্ঘ রাত্রি, কুয়াশা ভেজা সকাল আর রিক্ততার বিষণ্ণতা যেমন বসন্তে ধীরে ধীরে বিদায় নেয়, তেমনি গুনাহের ধূসরতা ও আত্মার ক্লান্তি রমজানের সিয়াম-সাধনায় মুছে যেতে শুরু করে। গাছের শাখায় শাখায় যেমন কুঁড়ি ফোটে, তেমনি মুমিনের হৃদয়ে জেগে ওঠে তাওবা, তাকওয়া ও ইখলাসের কুঁড়ি।
যে মাটিকে কিছুদিন আগেও ধূসর আর নিষ্প্রাণ মনে হতো, সেই মাটির বুকে এখন সবুজের নরম চাদর। ঝরা পাতার স্তূপের ভেতর থেকে উঁকি দেয় নতুন প্রাণ। পাতা ঝরার দিন শেষ হয়ে যায়, আর শুরু হয় রঙের উত্সব। শিমুল,পলাশের রক্তিম হাসি, কৃষ্ণচূড়ার আগুনরাঙা ডানা—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন সাজে নববধূর বেশে।
ঠিক তেমনি রমজান এলে মসজিদগুলো ভরে ওঠে নূরের আলোয়, কুরআনের তিলাওয়াতে মুখরিত হয় রাতের নির্জনতা, তারাবীর কিয়ামে নত হয় হাজারো কপাল। ধূসর হৃদয়ের ঠোঁটে ফুটে ওঠে প্রশান্তির হাসি।
ধূসর প্রকৃতির ঠোঁটে যেমন বসন্তে রঙিন হাসি ফোটে, তেমনি রমজানে মানুষের অন্তর পায় নতুন জীবন। প্রকৃতি যেমন ফিরে পায় প্রাণের উচ্ছ্বাস, তেমনি আত্মা ফিরে পায় আল্লাহর নৈকট্যের স্বাদ।
স্রষ্টার নিদর্শন ও বসন্তের দর্শন
প্রকৃতির এই নবায়ন কেবল কাব্যের বিষয় নয়; এটি আল্লাহ তায়ালার অপার কুদরতের নিদর্শন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন—
وَتَرَى الْأَرْضَ هَامِدَةً فَإِذَا أَنْزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ وَأَنْبَتَتْ مِنْ كُلِّ زَوْجٍ بَهِيجٍ (সূরা হাজ্জ)
অর্থাৎ, “তুমি পৃথিবীকে নিষ্প্রাণ দেখতে পাও। এরপর আমি যখন এর উপর পানি বর্ষণ করি, তখন তা সজীব হয়ে ওঠে, স্ফীত হয় এবং প্রত্যেক প্রকারের মনোরম উদ্ভিদ উৎপন্ন করে।”
এই আয়াত যেন বসন্তেরই ব্যাখ্যা। শুষ্ক মাটি যখন বৃষ্টির ছোঁয়ায় প্রাণ ফিরে পায়, তখন তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহর রহমত এলে নিস্তেজ হৃদয়ও জেগে ওঠে।
আর রমজান সেই রহমতের বৃষ্টি, যা আত্মার জমিনে বর্ষিত হয়।যেমন মাটি বৃষ্টিতে সজীব হয়, তেমনি হৃদয় সিয়ামে পরিশুদ্ধ হয়।যেমন কুঁড়ি ফুটে ফুল হয়, তেমনি তাওবা থেকে জন্ম নেয় তাকওয়া।বসন্ত আমাদের শেখায় ধৈর্য—অপেক্ষার পরেই আসে সৌন্দর্য।
রমজান শেখায়—সবরের পরেই আসে মাগফিরাত ও নাজাত।হতাশার রাত যত গভীরই হোক, আলোর সকাল অনিবার্য। তেমনি গুনাহের অন্ধকার যতই ঘন হোক, রমজানের নূর তা ভেদ করে হৃদয় আলোকিত করে দেয়।
হৃদয়ের বসন্ত অনুভবের অনন্ত রঙ
বসন্তের আসল সৌন্দর্য কেবল চোখে দেখা নয়; তা অনুভবের বিষয়। এটি এমন এক ঋতু, যা হৃদয়ের গভীরে দোলা দিয়ে যায়। ফাল্গুনের বাতাসে যে ভালোবাসার সুবাস মেশে, তা মানুষকে আরও মানবিক করে তোলে।
রমজানও তেমনি হৃদয়ের ভেতরে পরিবর্তনের সূচনা করে। ক্ষুধা আমাদের ধৈর্য শেখায়, ইফতার আমাদের কৃতজ্ঞতা শেখায়, দান-সদকা আমাদের মানবতা শেখায়। সম্পর্কের দূরত্ব কমে আসে, অভিমান গলে যায়, হৃদয়ে জন্ম নেয় মমতার নতুন কুঁড়ি।
যখন শিমুলের রক্তিম পাপড়ি ঝরে পড়ে পথের ধুলোয়, তখন মনে হয়—জীবনও যেন এমনই ক্ষণিক অথচ অপূর্ব। আর যখন রমজানের রাতে মসজিদে কুরআনের ধ্বনি ওঠে, তখন মনে হয়—এই জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও এর লক্ষ্য চিরন্তন।
বসন্ত শেখায় ঝরা পাতার ভয় না পেতে।রমজান শেখায় অতীতের গুনাহ ঝরিয়ে নতুন আমলের পথে হাঁটতে।ধূসর দিনগুলো পেরিয়ে প্রকৃতি যেমন নতুন জীবন ফিরে পায়, তেমনি রমজান মানুষকে দেয় আত্মার পুনর্জাগরণের সুযোগ।
লেখক: সিনিয়র মুফতি ও আরবি সাহিত্যিক (আদিব) দারুল হিদায়া আল-মাদানিয়া, মিরপুর–২, ঢাকা–১২১৬
আইএইচ/