মুফতি এনায়েত কবীর।।
কোনো কাপড় দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে তা ময়লা হয়ে যায়। তখন ময়লা এবং অপরিষ্কার কাপড়কে পরিষ্কার করতে হয়। অনুরূপভাবে একজন মানুষের পথচলায় বিভিন্ন পাপ পঙ্কিলতার কারণে দেহমন অপরিষ্কার ও কলুষিত হয়ে পড়ে। রমজানুল মোবারক মানুষের পাপের ময়লাকে ধুয়ে মুছে মুত্তাকী বা সংযমী ও সচেতন বানায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে যেন তোমরা মুত্তাকী বা সচেতন হতে পার। সূরা বাকারা ১৮৩।
কিন্তু কথা হলো, শুধু কি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পানাহার এবং স্ত্রী সঙ্গ থেকে বিরত থাকলেই রোজা হয়ে যায়? রোজাদারকে মুত্তাকী বানিয়ে দিবে?
এই সমাজে এমনটাই মনে করা হয়। ফলে রোজাদার ব্যক্তিও মিথ্যাচার গালিগালাজ গীবত ঝগড়াঝাঁটিসহ সব রকম পাপের কাজে জড়িয়ে পড়েন।
অথচ হাদিসে পাকে নবীজী বলেন, যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যাচারিতা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে নি তার পানাহার বর্জনের কোন গুরুত্ব আল্লাহর কাছে নেই। আল্লাহ তায়ালা তাঁর পানাহার ত্যাগ করার কোনই পরোয়া করেন না। সহিহ বুখারী হাদিস নং ১৯০৩।
তারাবি মানেই তাড়াতাড়ি। এমন একটা মানসিকতা অনেকেই পোষন করেন। সেজন্য কোন মসজিদে তাড়াতাড়ি তারাবি হয় সেটার খোঁজ লাগানো হয়। অথচ কোরআন বান্দার মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে। নবীজী বলেন, কোরআন এবং রোজা কেয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। অতঃপর তাদের সুপারিশ কবুল করা হবে। মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৬৫৮৯।
ইফতার কেনার ব্যস্ততায় অনেক রোজাদারের ছুটে যায় আসরের নামাজ। বাহারি ইফতার শেষ করতে করতে ছুটে মাগরিবের জামাত। আর সেহেরী খেয়ে একটু বিশ্রামের অজুহাতে ফজরের নামাজ মিস হয় অনেকেরই। হাদিসে পাকে নবীজী বলেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসে একটি নফল আদায় করল সে যেন অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করল। আর যে রমজান মাসে একটি ফরজ আদায় করল সে যেন অন্য মাসে ৭০ টি ফরজ আদায় করল। শোয়াবুল ঈমান ৩/৩০৫
সুতরাং খোঁড়া অজুহাতে ৭০টি ফরজ সমতুল্য ইবাদতে উদাসিনতা দেখানো একজন রোজাদারের জন্য কতটুকু যুক্তিসঙ্গত?
রমজান দোয়া কবুলের মাস। এই মাসে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। রোজাদারের দোয়া কবুল হওয়ার বিভিন্ন নিশ্চয়তার কথা হাদিসে এসেছে। নবীজী বলেন, তিন ব্যক্তির দোয়া ফেরত দেয়া হয়না এক রোজাদার ব্যক্তির ইফতারের সময়ের দোয়া। সহীহ ইবনে হিব্বান হাদিস ৩৪২৮
অথচ দোয়ার বিষয়টাকে আমরা মসজিদের ইমামের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। আচ্ছা, ইমাম সাহেব কি ইফতারের সময় প্রত্যেক রোজাদারের ঘরে ঘরে গিয়ে দোয়া করতে পারবেন? তা কি কখনো সম্ভব?
রোজার ক্লান্তি ও দুর্বলতা কারণে অনেকেই সামান্য বিষয়েই চটে যান। তুচ্ছ কারণে খুব রেগে যান। ফলে অন্যের গায়ে হাত তোলা বা বিভিন্ন জিনিস পাতি ভাঙচুরের মত ঘটনাও ঘটে। অথচ কেউ গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে চাইলেও তার সাথে ঝগড়া বা রাগারাগি করা রোজাদারের জন্য নিষেধ।
এক হাদীসে নবীজী বলেন, রোজা অবস্থায় তোমাদের কেউ যেন কোনো অশ্লীল কিংবা মন্দ কথা না বলে। কেউ যেন কোন প্রকার শোরগোল হট্টগোলে লিপ্ত না হয়। যদি অন্য কেউ তাকে গালিগালাজ বা বাজে আচরণ করে তবে সে যেন এর প্রতি উত্তর না দিয়ে শুধু এতটুকু জানিয়ে দেই যে আমি রোজাদার। সহি বুখারি হাদিস নং 1904
রমজান কোরআনের মাস। কোরআন তেলাওয়াতের ব্যাপারে আমাদের উদাসীনতা চরম পর্যায়ের। কুরআন কেন্দ্রিক নেকি হাসিলের বিষয়টা শুধু তারাবি পড়ার উপরই ছেড়ে দিয়েছি। অথচ রমজানের প্রত্যেক রাতে নবীজি হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে কোরআন শোনাতেন। সহিহ বুখারি হাদিস ১৯০২।
আল্লাহর ওলীগন এর জীবনী দেখুন। ইমাম আবু হানিফা রহ. রমজানে প্রতিদিন একবার এবং রাতে একবারে কুরআন খতম করতেন। তারাবির নামাজে পড়তেন এক খতম। এভাবে এক রমজানে ৬১ বার কোরআন খতম করতেন। ইসলাহী খুতুবাত, আল্লামা তকী উসমানি লিখিত।
লেখক: শিক্ষক, শেখ জনূরুদ্দীন রহ. দারুল কুরআন মাদরাসা।
-এটি