বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ ।। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১০ জিলহজ ১৪৪৭


স্মৃতিচারণ: একজন আল্লামা আনোয়ার শাহ ও তিনটি ঘটনা

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

স্মৃতির মৃত্যু নেই। এই পার্থিব জীবনে মানুষ যে আমল বা স্মৃতি তৈরি করে, তা মৃত্যুর পরও বাকি থেকে যায়। ইহকালেও, পরকালেও। মৃত্যুর পরেও মানুষকে তার স্মৃতি বা আমল দিয়ে বিবেচনা করা হয়। তাই পরবর্তীদের জন্য আমরা কী স্মৃতি রেখে যাচ্ছি এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

খুব সম্প্রতি আল্লাহর কাছে চলে গেলেন আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। দেশে বিদেশের সর্বত্র তার অসংখ্য ছাত্র, শুভাকাঙ্খী এবং গুণগ্রাহী রয়েছেন।

এক জীবনে হজরত এমন অসংখ্য স্মৃতি রেখে গিয়েছেন, যেগুলো আমাদের জন্য হতে পারে পথের দিশা। হজরতকে খুব কাছ থেকে দেখা সৌভাগ্যবানরা জানালেন অম্লান সেইসব স্মৃতি নিয়ে। তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন ওমর আল ফারুক


ইসলাম প্রশ্নে আপোসহীনতা

হজুরের দীর্ঘদিনের সহবতপ্রাপ্ত খাদেম এবং জামেয়া এমদাদিয়া কিশোরগঞ্জের সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা শুয়ায়েব বিন আব্দুর রউফ বলেন, “আজ থেকে প্রায় তেইশ বছর আগের কথা। কুলিয়ারচরের এক প্রোগ্রামে আমি হজরতের সাথে ছিলাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন আল্লামা নুরউদ্দিন গহরপুরি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি।

সেই পোগ্রামে মেজবান আমাদের খুবই আদব- এহতেরামের সাথে রিসিভ করেন। পথে এক লোক মেজবানের হজরতকে জানায়, ‘হজুর, এই লোক তো সুদ খায়’! এই কথা শোনা মাত্র –আমার স্পষ্ট মনে আছে- হজরতের চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেলো। তিনি বিনা বাক্য ব্যয়ে সেখান থেকে চলে আসেন।

পরে আল্লামা নুরউদ্দিন গহরপুরি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি মেজবানের ব্যাপারে তথ্য নিয়ে জানতে পারলেন এটা আসলে গুজব ছিলো। এরপর আমরা সেখানে মেহমান হই।

হজুরের মৃত্যুর বেশ কিছু দিন পূর্বে আমাকে বলেন, “জীবনে আর যাই করো, পান খেয়ো না, ধরো এটা তোমাদের প্রতি আমার শেষ নসিহত!”

উস্তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ছাত্রদের প্রতি ভালোবাসা

আল্লামা আনোয়ার শাহ রহ. তার উস্তাদদের খুবই সম্মান করতেন। হুজুরের দীর্ঘদিনের ছাত্র এবং খাদেম কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা  আব্দুস সাত্তার বলেন, “হজুরের উস্তাদভক্তি ছিলো প্রবাদ প্রতীম। নসিহতের ক্ষেত্রে হজরতের উস্তাদদের নসিহতগুলোই বারবার খুব দরদের সাথে শোনাতনে আমাদের।

আল্লামা ইউসুফ বিন্নুরি রাহমাতুল্লাহি আলাইহির কথা হজুর খুবই বেশি বলতেন। হুজুর অধিকাংশ দরসই ইউসুফ বিন্নুরি রহ.-এর তাকরির করতেন। হুজুরের কাছে তার উস্তাদদের তাকরিরের খাতা সংরক্ষিত ছিলো।

এছাড়া ছাত্রদের প্রতি ভালোবাসার ব্যাপারে হুজুর আসলে তুলনাহীন। ছাত্র এবং মাদরাসাই ছিলো হুজুরের জান-প্রাণ। সবকিছুতেই তিনি আগে ছাত্রদের কল্যণ খুঁজতেন।

ছাত্রদের মঙ্গলের সব কিছুতে হুজুর বিনা-বাক্য ব্যয়ে রাজি হয়ে যেতেন। মাদরাসা এবং ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রিক যে কোন সমস্যা অনতিবিলম্বে সমাধান করার চেষ্টা করতেন।”

উপস্থিত বুদ্ধি

হুজুরের উপস্থিত বুদ্ধি ছিলো উল্লেখ করার মতো। যে কোন সমস্যাকে খুব সহজেই সমাধান করতে পারতেন তিনি। আপাত দৃষ্টিতে সমস্যা যতো কঠিনই মনে হোক না কেন। হুজুরের কাছে গেলে তিনি খুব সহজেই এর একটা বিহিত করে ফেলতেন।

হিফজ থেকে শুরু করে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত হুজুরের কাছে পড়া জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের ভারপ্রাপ্ত খতিব মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, “তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মিছিলে কিশোরগঞ্জের আরমান নামের অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্র পুলিশের গুলিতে শহিদ হলে উত্তাল হয়ে পড়ে পুরো কিশোরগঞ্জ।

জনগণ একপর্যায়ে থানা ঘেরাও করে ফেলে এবং তৎক্ষণাত ওই পুলিশ কর্মকর্তার শাস্তি দাবি করে। অবস্থা প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে হুজুর জনতাকে শান্ত হওয়ার কথা বলেন এবং আইন নিজের হাতে তুলে নিতে নিষেধ করেন।

কিন্তু জনগণ এতেও ক্ষ্যান্ত না হলে একপর্যায়ে হুজুর কুরআন তেলাওয়াত শুরু করে দেন। একাধারে পাঁচ থেকে সাত পৃষ্ঠা তেলাওয়াত করেন। হুজুরের তেলাওয়াত শুনে মানুষ নীরব হতে বাধ্য হয়। এভাবে যে কোন সমস্যা হজুর খুব সহজে সামাধান করতে পারতেন।”

আরএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ