বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬ ।। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১১ জিলহজ ১৪৪৭


রবীন্দ্রনাথ কেন তিন কন্যাকে বাল্যবিয়ে দিয়েছিলেন?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

তারেকুল ইসলাম
রাজনৈতিক কলাম লেখক

গত বছর নিজের বাল্যবিয়ে ঠেকিয়ে দেওয়ার পুরস্কারস্বরূপ বাংলাদেশের মেয়ে শারমিনকে যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ (আইডব্লিউসি) ২০১৭’ অ্যাওয়ার্ড দিয়েছিল।

অথচ “যুক্তরাষ্ট্রে বাল্যবিয়ের সংখ্যা বেশি কেন?” শীর্ষক বিবিসি’র রিপোর্ট বলছে: “যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্যে এখনও বাল্য বিয়ে বৈধ। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি অঙ্গরাজ্যে বাল্য বিয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বয়সসীমাও নির্ধারণ করা নেই।” (২৬ অক্টো. ২০১৭)

এছাড়া বিখ্যাত ব্রিটিশ পত্রিকা ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার রিপোর্টে জানা যায়, ‘আনচেইন্ড অ্যাট লাস্ট’ নামের একটা গ্রুপের তথ্য মোতাবেক ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় অন্তত দুই-লাখ-৭-হাজার-চারশ’ শিশুর বাল্য বিয়ে হয়েছে। (৮ জুলাই, ২০১৭)

পাশ্চাত্যের ভণ্ডামির জ্বলন্ত প্রমাণ এটা। নিজেদের ব্যর্থতা ও অন্ধকার চেপে রাখতেই তারা নানা ধরনের পুরস্কার, প্রচারণা ও আয়োজন করে থাকে। শারমিনকে দেওয়া আমেরিকার পুরস্কারটাও তারই ধারাবাহিকতার অংশ। আর আমাদেরও এমন গোলামি মানসিকতা যে, না জেনেশুনে সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পুরস্কার সানন্দচিত্তে গ্রহণ করে ধন্য হই! কী বোকা আমরা! আফসোস!

যাই হোক, শারমিনকে ‘সাহসী নারী’ হিসেবে পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছিল। অথচ এই পুরস্কার পাওয়ার বয়সও তো তার হয়নি। বিয়ের জন্য যদি বয়স ফ্যাক্টর হয়ে থাকে, তাহলে এই পুরস্কার পাওয়ার বয়সটুকুও কিন্তু শারমিনের হয়নি!

কারণ পুরস্কারের নাম ‘উইম্যান অব কারেজ’ অর্থাৎ সাহসী নারী। এখানে ‘নারী’ শব্দটা খেয়াল করুন। একটা মেয়ে যখন নারী হয়ে ওঠে, তখন সে বিয়ে করারও উপযুক্ত হয়ে ওঠে নিঃসন্দেহে। কিন্তু শারমিন তো এখনো নারী হয়ে ওঠে নি। সে এখনো বালিকা। তাই, এখনো নারী হয়ে ওঠেনি বলেই তো তাকে তথাকথিত আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা বিয়ের উপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করছে না। এমনটা নয় কি?

সুতরাং, বালিকা শারমিনকে ‘সাহসী নারী’র পুরস্কার দেওয়াটা শুধু ভুলই না, স্ববিরোধীও। যুক্তির খাতিরে বলছি, পুরস্কারের নাম যদি হতো ‘সাহসী বালিকা’। তবুও নাহয় মানা যেতো।

এনিওয়ে, আইন করে বাল্যবিয়ে নিষিদ্ধ করার মানে প্রকারান্তরে বাল্যপ্রেম, বাল্য ডেটিং, বাল্য যৌনাচার, বাল্য লীলাখেলার পথ সুগম ও অবাধ করে দেওয়ার নামান্তর।

তাছাড়া, আজ তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের ফলে যোগাযোগব্যবস্থা হাতের নাগালে। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে একে অপরের কাছাকাছি আসা অত্যন্ত সহজ হয়ে পড়েছে। যোগাযোগের মাধ্যমগুলো একদম সুলভ হয়ে গেছে। ফলে অতি অল্প বয়সেই ছেলেমেয়েরা ইঁচড়ে পাকা হয়ে উঠছে।

আজকের দিনে বাল্য ও কিশোর বয়সেই ছেলেমেয়েদের অবাধ প্রেম, গর্হিত অবাধ মেলামেশা ও ডেটিং প্রকাশ্যে চলছে বিভিন্ন পার্কে, রেস্টুরেন্টে এবং দর্শনীয় স্পটগুলোতে।

এবরশন ও ভ্রূণহত্যা তো চলছেই। আর বয়োঃসন্ধিকালের সময়টা ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্য যিনা-ব্যভিচারের দিকে ঝোঁকার সবচে উত্তপ্ত সময়। তাই, যুগের এসব ফেনোমেনা আইন প্রণেতাদের বিবেচনায় আনা জরুরি।

কোনো মেয়ে ১৫, ১৬ বা ১৭ বছর বয়সে বিয়ে করতে চাইলে কিংবা তার অভিভাবক চাইলে যেমন সেই অধিকার বজায় থাকা উচিত, তেমনি এই বয়সে কোনো মেয়ে বিয়ে না করতে চাইলে জোর করে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়াও উচিত নয়। তবে এটা সত্য যে, তথাকথিত বয়ফ্রেন্ড না থাকলে বিয়েতে ‘না’ বলা মেয়েদের সংখ্যা একদমই নগণ্য।

সর্বোপরি, বিয়ে দেওয়ার আগে একটা মেয়েকে অবশ্যই মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তাকে বিয়ের ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া জরুরি।

আমাদের দেশে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে তথাকথিত সেকুলার প্রগতিশীলরা সবসময় সরব থাকেন। আবার এদের সিংহভাগই প্রচণ্ড রবীন্দ্রভক্ত বা রবীন্দ্রপূজারী। বস্তুতপক্ষে, এরা সবাই রবীন্দ্রচিন্তার শত্রু!

কেননা রবীন্দ্রনাথ নিজেও বাল্যবিবাহ করেছিলেন। রবীন্দ্রপূজারী সেকুলাররা বলবেন, ঐটুকুন বয়সে রবীন্দ্রনাথ পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন। তার কী দোষ?

মানলাম, তার কোনো দোষ নাই; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ পরিণত জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন বয়সে এসে তার তিন মেয়েকেই বাল্যবিবাহ দিয়েছিলেন। এখন দোষটা কার?

যদিও আমি রবীন্দ্রনাথকে দোষ দিবো না, কারণ তিনি আজকালকার তথাকথিত নারীবাদী সেকুলার প্রগতিশীলদের মতো আহাম্মক ছিলেন না।

রবিঠাকুর তার প্রথম কন্যা ‘বেলা’কে ১৪ বছর বয়সে, দ্বিতীয় কন্যা ‘রানী’কে ১১ বছর বয়সে এবং সর্বকনিষ্ঠ কন্যা ‘মীরা’কে ১৩ বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছিলেন। সুতরাং বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে রবীন্দ্রচিন্তার বিরুদ্ধে কথা বলা।

কবিবন্ধু প্রিয়নাথ সেনকে লেখা এক চিঠিতে রবিবাবু তার বড় কন্যাকে এত অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার বিষয়ে লিখেছিলেন: “নদী যেমন চলতে চলতে এক সময় সাগরে গিয়ে পড়েই, সেই রকম ‘বেলা’ যথাসময়ে তার স্বামীকূলে গিয়ে উপনীত হবে।”

(চিঠির রেফারেন্স: মোবাশ্বের আলী, রবীন্দ্রনাথ অন্তরঙ্গ আলোকে, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা-২০০৮ পৃঃ ৮৬, via আজাদ এহতেশাম)

গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ যদি আজকে আমাদের আধুনিক প্রগতিশীলদের আদর্শিক দেবতা হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের উচিত বাল্যবিয়ে সমর্থন করে রবিঠাকুরের প্রতি তাদের পূজা ও ভক্তির ষোলআনা পূর্ণ করা। আর যাই হোক, প্রগতি ও আধুনিকতার গোঁড়ামি দিয়ে শুদ্ধ রবীন্দ্রচর্চা তারা করতে পারবে না।

অন্যদেশে তৎপর আমেরিকা কেন নিজ দেশে বাল্যবিয়ে বন্ধ করছে না?


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ