মুজাহিদুল ইসলাম
আলেম ও সাংবাদিক
ইরানে চলমান বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর ধারণা করা হচ্ছিলো দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ প্রকাশ।কিন্তু শুক্রবারের বিক্ষোভের মাধ্যমে এটা সরকার বিরোধী সহিংস বিক্ষোভের রূপ নেয়।
ইরানের রাস্তায় এ বিক্ষোভ দীর্ঘদিন চলবে এমনই মনে করছেন বিশ্লেষকগণ। কারণ, ২০ হতে ৩০ বছর বয়সী যুবকদের অংশগ্রহণ এই বিক্ষোভে চোখে পড়ার মতো। এমনকি অনেকে তাদের ছোট ছোট সন্তান নিয়ে পুলিশের সাথে বিক্ষোভে জড়িয়ে পড়ছে।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনীকে সরে যাওয়ার আহবানও রাজপথ হতে জানানো হচ্ছে। এ দাবির সাথে ইরানের জনগণ পরিচিত নয়। এ বিক্ষোভের পেছনে মোটা দাগে কিছু কারণ স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসেছে। তাহলো,
১. জাতীয় বাজেটে সরকারের ঘনিষ্ঠ ও ধর্মীয় বেশকিছু কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহিহীনভাবে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেয়া। ইরানি যুবকদের একথা ভাবছে, যখন আমরা চরম অর্থনৈতিক সংকটে, তখন আমাদের দেয়া করে একটি বিশেষ গোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করছে। কোনো জবাবদিহি ছাড়াই। যেটি ইরানি রাস্তার স্লোগানে বোঝা যাচ্ছে ‘সিরিয়া ছাড়ো, আমাদের নিয়ে ভাবো’।
২. ২০০০ সালে খামেনি বিরোধী বিক্ষোভ। যা ব্যর্থতা ও পুঞ্জিভূত ক্ষোভের মাধ্যমে শেষ হয়, তার ক্ষত এখনও ইরানি জনগণের মাঝে রয়েছে। যদিও বহুমাত্রিক নির্যাতনের মাধ্যমে তাদেরকে এ পথ থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। তবুও তা তাদেরকে বিরত রাখতে পারেনি।
সরকার ইরানি জনগণের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়ন, বাকস্বাধীনতা, সমতা এবং বর্ণবাদের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ভাবা তো দূরের কথা উল্টো তাদের উপর দমননীতি অনুসরণ করছে। ইরানের সরকার জনগণের হতাশা ও ক্ষোভের মূল কারণ খতিয়ে দেখারও প্রয়োজন অনুভব করেনি।
৩. মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের উচ্চহার ইরানি যুবকদের আশা-আকাঙ্ক্ষা শেষ করে দিয়েছে। মধ্যবিত্তদেরকে প্রান্তিক শ্রেণীতে পরিণত করেছে।
৪. পাশ্চাত্যের সাথে উদারপন্থী রুহানির করা পারমানবিক সমঝোতা চুক্তি ইরানিদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু প্রবৃদ্ধি হার নিম্নগামী যা তাদের হতাশ করেছে।
৫. কোন কোন বিশ্লেষক ধারণা করেন, উদারপন্থী রুহানিকে বেকায়দায় ফেলতে কঠোরপন্থীরা এটা উস্কে দিয়েছে। কিন্তু এখন এটা কট্টোরপন্থীদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে যা দাঁড়ায় তা হলো, ইরানের জনগণ চায় সরকার তাদের উন্নয়নে মনোযোগ দিক। কিন্তু ইরান সরকার বরাবরই আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে ব্যস্ত। এটাই সংঘাতের বড় কারণ।
সর্বশেষ হয়তো ইরান সরকার এটা এক সময় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেবে। কিন্তু ইরানের সকল নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ না হলে সমাজের বন্ধন ধীরে ধীরে শীতল হয়ে আসবে। যা তাদের তথা ইরানিদের পাশাপাশি আঞ্চলিক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।