শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬ ।। ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ ।। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :
কক্সবাজারের আবাসিক হোটেল থেকে পুলিশের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার  কুরআন-হাদিসের আলোকে জামাতের গুরুত্ব গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের ইস্যুতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে বিরোধীদলীয় নেতার চিঠি বাংলাদেশ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে: বিদ্যুৎমন্ত্রী  দাওয়াতি কার্যক্রম গতিশীল ও সুসংগঠিত করার ওপর গুরুত্বারোপ সিলেটে ৩ হত্যাকাণ্ডে নিহত স্বামী-স্ত্রীর দাফন সম্পন্ন হাফেজে কুরআনদের উৎসাহিত করতে মালদ্বীপ সরকারের নানা উদ্যোগ ১৫ আগস্ট কেন্দ্র করে ডিএমপির নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগামীকালের জাতীয় উলামা-মাশায়েখ সম্মেলন সফল করার আহ্বান জুলাই শহীদদের স্মরণে রংপুরে শায়খে চরমোনাইয়ের দোয়া ও ইসলাহি ইজতেমা

উগ্রবাদীদের টার্গেটে দারুল উলুম দেওবন্দ

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| শাহনওয়াজ বদর কাসেমী ||

ভারত শত শত বছর ধরে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার একটি কমনীয় ও ঊর্বর ভূমি। আর এই সৌন্দর্যই এ দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি ও পরিচয়। এর গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের ঐতিহ্যের কারণে বিশ্বজুড়ে ভারতকে সম্মানের চোখে দেখা হয়। দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম থেকে শুরু করে আধুনিক ভারতের গঠন ও উন্নয়ন পর্যন্ত বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণির মানুষ একত্রিত হয়ে এমন এক সমাজের ভিত্তি স্থাপন করেছিল যা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায়বিচার এবং সাংবিধানিক সমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশের কিছু অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও ধর্মীয় বিদ্বেষের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এই সুন্দর ঐতিহ্যকে অবশ্যই প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশে মুসলমানগণ, তাদের ধর্মীয় স্থানসমূহ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিবর্গকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। মতপার্থক্য এবং আইনি জবাবদিহিতা গণতান্ত্রিক সমাজের একটি অপরিহার্য অংশ, তবে কোনো ধর্মীয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বারবার গুজব, প্রমাণহীন অভিযোগ এবং উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে বিতর্কের মুখে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতাটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়।

সম্প্রতি এশিয়ার অন্যতম মহান ইসলামি বিদ্যাপীঠ ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’-কে কিছু হিন্দু উগ্রপন্থী সংগঠন আবারও বদনাম করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছে। একদিকে দারুল উলুমের রশীদ মসজিদ নিয়ে এই দাবি তোলা হয়েছিল যে, সেখানে শিবলিং রয়েছে, অন্যদিকে এই দাবিকে ভিত্তি করেই সাহারানপুর জেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপিও পেশ করা হয় এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। এই পুরো ঘটনাটি একটি মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—কোনো ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কেবল কিছু দাবি বা গুজবই কি এতটাই যথেষ্ট যে সেটিকে একটি নতুন বিতর্কের মধ্যে টেনে আনা হবে?

এই ধারার দ্বিতীয় ঘটনাটি আরও বেশি সংবেদনশীল প্রকৃতির ছিল। ‘হিন্দু রক্ষা দল’-এর পক্ষ থেকে হরিদ্বার থেকে গঙ্গা জল এনে দারুল উলুম দেওবন্দের প্রাঙ্গণে ঢালার ঘোষণা দেওয়া হয় এবং এ সংক্রান্ত ভিডিওগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরতে থাকে। এই ঘোষণা ও ভিডিওগুলোর মাধ্যমে এমন একটি আবহ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল যে, প্রয়োজনে আদালতের অনুমতি নিয়ে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। স্পষ্টতই, একটি বড় ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চত্বরে অন্য কোনো ধর্মের ধর্মীয় আচার পালনের ঘোষণা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়, যা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারত এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর আশঙ্কা তৈরি করতে পারত।

মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রশাসন এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হতে দেয়নি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পথেই আটকে দেয়। এটি অত্যন্ত স্বস্তির বিষয় যে, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি, তবে এই পুরো ঘটনায় একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—এ ধরনের উসকানিমূলক ঘোষণা ও ঘটনার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পূর্ববর্তী ও কার্যকর পদক্ষেপের মাপকাঠি কী হওয়া উচিত?

এখানে এটিও লক্ষণীয় যে, যদি কোনো ব্যক্তির কোনো ধর্মীয় স্থান বা ঐতিহাসিক দাবি সম্পর্কে কোনো অভিযোগ থাকে, তবে দেশে আদালত ও আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যমান রয়েছে। কারও জন্যই রাজপথে মিছিল বের করা, ধর্মীয় অনুভূতিতে উসকানি দেওয়া কিংবা অন্য কোনো ধর্মের প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নিজস্ব ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। ন্যায়বিচারের পথ আদালত ও সংবিধান হয়ে অতিক্রম করে, রাজপথের শক্তি দিয়ে নয়।

এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ যে, কেন বারবার কেবল দারুল উলুম দেওবন্দকেই বিতর্কের ঘূর্ণাবর্তে টেনে আনা হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস এবং এর বর্তমান মর্যাদাকে অনুধাবন করা অপরিহার্য।

১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম দেওবন্দ দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামি জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যের একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ১৮৫৭ সালের পর ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক দাসত্বের পাশাপাশি শিক্ষাগত ও সভ্যতামূলক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এমন এক পরিস্থিতিতে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষা এবং জ্ঞানগত আত্মনির্ভরশীলতাকে নিজেদের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বেছে নেন। একটি ক্ষুদ্র মক্তব থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা সময়ের পরিক্রমায় এমন এক আন্তর্জাতিক জ্ঞানভিত্তিক আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়, যার সঙ্গে হাজার হাজার উলামা, মুফতি, শিক্ষক, লেখক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব যুক্ত হন।

দারুল উলুমের অবদান কেবল পাঠদান ও শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই প্রতিষ্ঠান এবং এর বুজুর্গগণ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছেন। শায়খুল হিন্দ হজরত মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রহ., শায়খুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ. ও অন্যান্য উলামায়ে কেরাম ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে জোরালো সংগ্রাম করেছেন, কারাবাসের নির্মম যন্ত্রণা সহ্য করেছেন এবং স্বাধীনতার জন্য অসামান্য কুরবানি পেশ করেছেন। ভারতের ইতিহাস অধ্যয়নকারী যেকোনো নিরপেক্ষ ব্যক্তির জন্যই এই দিকটি এড়িয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

দারুল উলুম দেওবন্দের চিন্তাধারার সাথে মতপার্থক্য বা শিক্ষাগত সমালোচনা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়। যেকোনো প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মতপার্থক্য আর সেটিকে প্রতিনিয়ত সন্দেহজনক বা বিপজ্জনক বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। সমালোচনা হতে হবে তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষে, আর যেকোনো অভিযোগেরও তো প্রমাণের প্রয়োজন হয়।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুবাদে ২০০৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় পনেরো বছর দেওবন্দে বসবাস করার সুযোগ আমার হয়েছিল। এই দীর্ঘ সময়কাল কোনো শহরকে কেবল দূর থেকে দেখার নয়, বরং এর দৈনন্দিন জীবন, মানুষের মেজাজ ও সামাজিক সম্পর্কগুলোকে অত্যন্ত কাছ থেকে অনুধাবন করার জন্য যথেষ্ট।

আমি দেওবন্দকে খুব কাছ থেকে দেখেছি এবং পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে, দেওবন্দের আসল পরিচয় ঘৃণা নয়, শান্তি; অশান্তি নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং বিভাজন নয়, বরং একে অপরের সাথে মিলেমিশে বসবাসের শ্বাশত ঐতিহ্য।

এখানে কেবল মুসলমানরাই দারুল উলুম দেওবন্দের মর্যাদার অনুরাগী নন, বরং আমাদের স্বদেশী ভাইদের একটি বিশাল অংশও এই প্রতিষ্ঠানের উচ্চ জ্ঞানগত মর্যাদা ও ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করেন। স্থানীয় পর্যায়ে দারুল উলুমের ছাত্র ও শিক্ষকদের সাথে সাধারণ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এই স্পষ্ট সত্যেরই সাক্ষ্য দেয় যে, বাস্তব মাটির পরিস্থিতি সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম শোরগোল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

দারুল উলুমের সুখ-দুঃখে স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও কারোর অজানা নয়। শহরের দৈনন্দিন কাজকর্ম ও লেনদেনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের সাথে ব্যবসায়িক, সামাজিক ও মানবিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলে। এটাই দেওবন্দের আসল চিত্র, যা কিছু উসকানিমূলক মন্তব্য চাইলেও মুছে ফেলতে পারে না।

দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া রাজনীতির এমন এক ময়দানে পরিণত হয়েছে যেখানে কিছু মানুষ মাত্র কয়েক মিনিটের ভিডিও বা একটি উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে সস্তায় খ্যাতি অর্জন করতে চায়। অনেক সময় এমনটি মনে হয় যে, কোনো সমস্যার প্রকৃত সমাধান খোঁজার চেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কীভাবে এমন একটি মন্তব্য করা যায় যা সর্বাধিক ভাইরাল হবে এবং নিজেদের রাজনৈতিক প্রভুদের ও 'গোদি মিডিয়া'র নজর কাড়তে পারবে।

মূলত এই মানসিকতাকেই আজ কঠোর হাতে দমন করা প্রয়োজন। রাজনীতি ও সাংবাদিকতা যদি জনসেবার পরিবর্তে সস্তা প্রচার ও বিতর্কের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, তবে সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতা সবার আগে বিঘ্নিত হয়।

সবচেয়ে দুঃখজনক দিকটি হলো, যখন এই ধরনের কৃত্রিম বিতর্ক তৈরি করা হয়, তখন সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অনেক সময় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের দেখা মেলে না। এই পরিস্থিতি উগ্র ও উপদ্রবকারী উপাদানগুলোর সাহস ও ঔদ্ধত্য বাড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সরকার ও প্রশাসনের মূল দায়িত্ব হলো ধর্ম, জাতি ও রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের শাসন ও কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনেরই অধিকার নেই যে, তারা সমাজে ঘৃণা ছড়াবে, গুজব রটবে কিংবা সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করবে।

ভারতের সংবিধান দেশের প্রতিটি নাগরিককে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমতা এবং নিজেদের প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষণের মৌলিক অধিকার প্রদান করে। এই সাংবিধানিক গ্যারান্টিই দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মূল ভিত্তি। যদি কোনো ধর্মীয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সুপরিকল্পিতভাবে বিতর্কের বিষয়বস্তু বানানো হয় এবং তার বিরুদ্ধে উসকানি ছড়ানো হয়, তবে এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ নয়, বরং খোদ সংবিধানের মৌলিক নীতিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল।

দেশের প্রগতি, স্থায়িত্ব ও সমৃদ্ধি কেবল তখনই নিশ্চিত হতে পারে যখন আইনের সুশাসন এবং সকলের জন্য সমান ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। সাময়িক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সাময়িকভাবে হয়তো কাউকে রাজনৈতিক ফায়দা দিতে পারে, কিন্তু এর চূড়ান্ত মূল্য চোকাতে হয় গোটা সমাজকে। ঘৃণার এই বিষবাষ্প দেশের বিনিয়োগ, শিক্ষা, সামাজিক স্থায়িত্ব এবং জাতীয় সংহতি—সবকিছুকেই গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই সরকারগুলোর উচিত যেকোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উসকানিমুলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং অপরাধীদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।

এই পরিস্থিতিতে মুসলমানদের এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের দায়িত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেকোনো উসকানির মূল উদ্দেশ্যই হলো একটি প্রতিক্রিয়াশীল পরিবেশ তৈরি করা। যদি সাধারণ মানুষ আবেগের বশে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে শুরু করে, তবে এই হীন চক্রান্তকারীরা তাদের অসদুদ্দেশ্যে পুরোপুরি সফল হয়ে যাবে। তাই এটা অত্যন্ত জরুরি যে, যেকোনো ধরনের উসকানির জবাব দেওয়া উচিত পূর্ণ ধৈর্য, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং সম্পূর্ণ আইনানুগ উপায়ে। দারুল উলুম দেওবন্দের সমৃদ্ধ ইতিহাসও আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, যাবতীয় সংকট ও পরীক্ষার মোকাবিলা করতে হবে সুশিক্ষা, সুমহান চরিত্র ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে।

তরুণ প্রজন্মের উচিত তাদের পূর্বসূরিদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস অধ্যয়ন করা এবং এটি অনুধাবন করার চেষ্টা করা যে, দারুল উলুম দেওবন্দ ও তার মহান মুরুব্বিগণ এই দেশের জন্য কী অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের বহুমুখী কুরবানি, শিক্ষার প্রসার ও সমাজ সংস্কারে তাদের নিরলস প্রচেষ্টা আজও আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল মশাল। যখন দেশের যুবসমাজ নিজেদের সঠিক ইতিহাস এবং স্বীয় প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিবহাল থাকবে, তখন তারা কোনো ধরনের গুজব বা অপপ্রচারের ফাঁদে পা দেবে না।

বাস্তব সত্য হলো, ভারতের মূল শক্তি নিহিত রয়েছে এর ধর্মীয় সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সম্মিলিত সভ্যতার মাঝে। এই সেই শাশ্বত মূল্যবোধ যা ভারতকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে পরিণত করেছে। যদি এই মৌলিক মূল্যবোধগুলোকে দুর্বল করে দেওয়া হয়, তবে তার ক্ষতি কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি বা প্রতিষ্ঠানের হবে না, বরং গোটা দেশের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হবে।

দারুল উলূম দেওবন্দের বিরুদ্ধে সংঘটিত এই অবমাননাকর ও উসকানিমূলক অপচেষ্টা মূলত একটি মহান জ্ঞানীয় ঐতিহ্যকে কলঙ্কিত করার অপপ্রয়াস মাত্র। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, জ্ঞান, সুচরিত্র ও জনসেবার মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো নিছক গুজব ও অপপ্রচারের তুফানে কখনোই দুর্বল হয় না। আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হলো—সরকার, প্রশাসন, বুদ্ধিজীবী সমাজ, গণমাধ্যম এবং সকল ন্যায়কামী নাগরিক একসাথে মিলে সেই অপশক্তিগুলোর কোমর ভেঙে দেওয়া, যারা দেশের শান্তি ও ঐক্যের শত্রুতে পরিণত হয়েছে।

আজকের এই সংকটময় সময়ে আইন ও সংবিধানের সর্বোচ্চ প্রাধান্য নিশ্চিত করা, ঘৃণা ছড়াকারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যহীন কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং দেশের ঐতিহাসিক, শিক্ষাগত ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে রক্ষা করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। দারুল উলুম দেওবন্দ নিছক একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি জ্ঞান, মধ্যমপন্থা, জাতীয় সেবা এবং ভারতের যৌথ সংস্কৃতির একটি জীবন্ত প্রতীক। এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন মূলত এই দেশের উজ্জ্বল ঐতিহ্য, স্বাধীনতার মহান ইতিহাস এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতিই সম্মান জানানোরান্তর।

আমরা যদি ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা, বিভাজনের পরিবর্তে সংহতি এবং উসকানির পরিবর্তে প্রজ্ঞার পথ বেছে নিতে পারি, তবে নিঃসন্দেহে ভারত আরও অধিক শক্তিশালী, শান্তিপূর্ণ ও উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাবে। দারুল উলুম দেওবন্দের ইতিহাস আমাদের এই মহৎ শিক্ষাই দেয় এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই বার্তাটিই সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য।

[উর্দু থেকে লেখাটি অনুবাদ করেছেন: সাইমুম রিদা]

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ