রবিবার, ২১ জুন ২০২৬ ।। ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ৬ মহর্‌রম ১৪৪৮

শিরোনাম :
ইরাকে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু, ২৬ দিন পর দেশে ফিরলো দুই প্রবাসীর লাশ লেবাননে হামলা বন্ধ করতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিলেন নেতানিয়াহু মাদারীপুরে ট্রেনের ধাক্কায় বৃদ্ধার মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে সুইজারল্যান্ডে যাচ্ছে ইরানের প্রতিনিধি দল ইসলামপন্থিদের শক্তিশালী মিডিয়া কাঠামো গড়ে তুলতে হবে: আমিরে মজলিস ৪০ দিন জামাতে নামাজ পড়ে সাইকেল পুরস্কার পেল ৯ কিশোর বাবাকে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ’ বলাটা সঠিক হয়নি: জামায়াত এমপি খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ কমিটির পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত শাহজালালের (রহ.) মাজারে দানব্যবস্থায় স্বচ্ছতার উদ্যোগ, প্রশংসায় ভাসছে প্রশাসন শাহজালালের (রহ.) মাজারে দানবাক্সের নিরাপত্তায় এবার বসল সিসি টিভি

কর্মবিমুখতা থেকে ভিক্ষাবৃত্তি: সমাজের নীরব অভিশাপ

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ রাহমানী ||

আজকাল আমাদের মসজিদ, ধর্মীয় স্থান এবং ধর্মীয় সভাগুলোর একটি পরিচিত দৃশ্য হলো ভিক্ষুকদের উপচেপড়া ভিড় এবং তাদের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সুর ও ছন্দে বারংবার সাহায্য চাওয়ার শব্দ। এদের মধ্যে কেউ কেউ এতো বেশি পীড়াপীড়ি ও কাকুতি-মিনতি করে যে, তাদের উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আবার কারো কারো ধৃষ্টতাও দেখার মতো; যদি আপনি তাদের ভিক্ষা না দেন বা আশানুরূপ পরিমাণ না দেন, তবে তাদের রাগান্বিত চাহনির শিকার হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। কিছু এমনও আছে, যারা আপনাকে দুই-চার কথা শোনাতে দ্বিধাবোধ করে না। তারা এমনভাবে ভিক্ষা চায় যেন আপনি তাদের কাছে ঋণী। ধর্মীয় স্থানের পাশাপাশি পর্যটন কেন্দ্র, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড এবং ট্রাফিক সিগন্যাল—যেখানে গাড়ি থামে—সেগুলো এই গোষ্ঠীর প্রিয় স্থান। তাই এখানে তাদের সরব উপস্থিতি কেবল স্থায়ীই নয়, বরং তারা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অত্যন্ত অবিচলতার সাথে তাদের 'রণক্ষেত্রে' অটল থাকে। পুলিশের মার, ধমক বা সাধারণ মানুষের তিরস্কারও তাদের বিচলিত করে না; এ দিক থেকে অটল থাকার ক্ষেত্রে তারা এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

এই ভিক্ষুকরাও নানা ধরনের; কেউ সুস্থ-সবল, কেউ সত্যিই রোগী, আবার অধিকাংশই কৃত্রিম রোগী। সাধারণত রোগী ও প্রতিবন্ধীদের বেকার মনে করা হয়, কিন্তু এই পেশায় তারা অত্যন্ত কার্যকর ও লাভজনক। এ কারণেই অনেক সুস্থ ভিক্ষুক অন্ধ ও প্রতিবন্ধীদের সাহায্য নেয় এবং একে অপরের সহযোগিতায় পাথর-হৃদয় মানুষের মন গলাতে সফল হয়। তাদের মধ্যে শিশু, যুবক, বৃদ্ধ, পুরুষ ও নারী সবাই অন্তর্ভুক্ত। এমন চক্রও ধরা পড়েছে যারা গ্রাম ও দূরবর্তী অঞ্চল থেকে শিশুদের অপহরণ করে নিয়ে আসে এবং তাদের প্রতিবন্ধী বানিয়ে ভিক্ষা করায়। সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথে ভিক্ষাবৃত্তিতে আধুনিক মাধ্যমের ব্যবহারও শুরু হয়েছে; অনেক ভিক্ষুক এখন ইন্টারনেটের সাহায্য নিয়ে বিশ্বব্যাপী তাদের প্রচার ও প্রসার বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

মনে হয়, ভিক্ষুকদের এই গোষ্ঠী এটাকে একটি সহজ ও আরামদায়ক জীবিকা মনে করে। কয়েক মাস আগে সংবাদপত্রে খবর এসেছিল যে, হায়দ্রাবাদে ভিক্ষুকদের মাসিক গড় আয় তিন থেকে চার হাজার টাকা, আর রমজান ও ঈদের মতো বিশেষ দিনগুলোতে তা বহুগুণ বেড়ে যায়। এর ফলে তারা এ পেশা ছাড়তে মোটেও আগ্রহী নয়। আপনি যদি তাদের কাজ করার পরামর্শ দেন, তবে তারা এমন মুখ ভঙ্গি করবে যেন আপনি তাদের অপমান করেছেন। সংক্ষেপে, তারা নিজেদের পেশায় সন্তুষ্ট এবং এতে তাদের কোনো লজ্জা বা ঘৃণা নেই। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এদের মধ্যে মুসলিম ভাইদের একটি বড় সংখ্যা রয়েছে। অথচ যে উম্মতকে সর্বাগ্রে 'গিনা' (আত্মনির্ভরশীলতা) এবং 'ইস্তিগনা' (পরমুখাপেক্ষী না হওয়া) শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, তারাই আজ এই নৈতিক ব্যাধিতে সবচেয়ে এগিয়ে।

ইসলামের পূর্বে কিছু ধর্মে ধর্মীয় ব্যক্তিদের জন্য জীবিকা অর্জনের অনুমতি ছিল না। তাদের জীবন কাটত মানুষের সামনে হাত পেতে এবং মানুষের দেওয়া মানত বা হাদিয়ার ওপর নির্ভর করে। হিন্দুদের মধ্যে ব্রাহ্মণদের অধিকারে এটি অন্তর্ভুক্ত ছিল যে, মানুষ তাদের দান করবে। বৌদ্ধদের মধ্যে ধর্মীয় নেতাদের জন্য জীবিকা অর্জন নিষিদ্ধ ছিল, তারা মানুষের দেওয়া ভিক্ষার ওপরই জীবন অতিবাহিত করত। খ্রিস্টধর্মে যখন বৈরাগ্যবাদ ও দুনিয়া ত্যাগের দর্শন জনপ্রিয়তা পায়, তখন কেবল ধর্মীয় নেতা নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক শ্রেণির মানুষ এটাকে জরুরি মনে করতে থাকে যে তারা কাজ করা ছেড়ে দেবে এবং মানুষের দেওয়া দান-দক্ষিণায় জীবন যাপন করবে। কিন্তু ইসলাম প্রথম দিন থেকেই জীবিকা অর্জনকে (হাতে কাজ করে খাওয়া) জরুরি ঘোষণা করেছে। কুরআন বলেছে, আল্লাহর ইবাদত শেষে রুজি-রোজগারের সন্ধানে জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং মালকে 'ফজলে এলাহি' (আল্লাহর অনুগ্রহ) হিসেবে অভিহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ সা. নিজে ব্যবসা করেছেন, খোলাফায়ে রাশেদীন ও বড় বড় সাহাবি ব্যবসা করেছেন, হজরত আলী রা. ও অনেক সাহাবী কঠোর পরিশ্রম করে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়েছেন এবং রুজি তালাশের পথকে উৎসাহিত করেছেন।

ইসলাম অবশ্যই তাওয়াক্কুলের (আল্লাহর ওপর ভরসা) শিক্ষা দিয়েছে, কিন্তু মানুষ কর্মবিমুখতাকে যে তাওয়াক্কুলের নাম দিয়েছিল, ইসলাম তার সংস্কার করেছে। ইসলাম শিখিয়েছে, তাওয়াক্কুল মানে এই নয় যে, দুনিয়াবি সব মাধ্যম ত্যাগ করে ঘরে বসে থাকা; বরং তাওয়াক্কুল হলো উপায়-উপকরণ অবলম্বন করার পর ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া। তাই জীবিকা অর্জন তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। ভিক্ষাবৃত্তি তখনই জন্ম নেয় যখন মানুষ পরিশ্রম করতে ভয় পায় বা অলসতা করে। এর প্রতিকারের জন্য রাসুলুল্লাহ সা. একদিকে জীবিকা অর্জনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে ভিক্ষাবৃত্তির মূলোৎপাটন করতে চেয়েছেন, অন্যদিকে ভিক্ষার কঠোর নিন্দা ও নিষেধ করেছেন।

এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে এসে ভিক্ষা চাইল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: তোমার কাছে কি কিছু আছে? সে বলল: কেবল একটি চাটাই ও একটি পেয়ালা আছে। নবীজি সা. সেগুলো আনালেন এবং বিক্রির ব্যবস্থা করলেন। এক দিরহামে কুড়ালের মাথা কিনে সেটিকে লাঠিতে লাগিয়ে ওই ব্যক্তিকে দিয়ে বললেন: এটি দিয়ে কাঠ কেটে নিয়ে আসো এবং বিক্রি করো, এক মাস পর্যন্ত যেন তোমাকে আর ভিক্ষা করতে না দেখি। সেই ব্যক্তি নির্দেশ পালন করল এবং এক মাস পর এল, ততদিনে সে বেশ কিছু টাকা আয় করে ফেলেছে। রাসুলুল্লাহ সা. বললেন: তোমরা নিজেদের পিঠে কাঠের বোঝা বহন করে এনে বিক্রি করা, মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে উত্তম, যদিও মানুষ তোমাদের ইচ্ছা করলে দেবে আর না করলে দেবে না। (বুখারি)

হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, দুই ব্যক্তি নবীর দরবারে এসে কিছু চাইল। তিনি পরামর্শ দিলেন: জঙ্গলে যাও, কাঠ কাটো এবং বিক্রি করো। তারা তাই করল। প্রথমে কাঠ বিক্রি করে খাবার কিনল, তারপর সোনা কিনল, তারপর বাহনের জন্য গাধা কিনল। তারা বলল, আল্লাহর রাসুল সা.-এর নির্দেশে আল্লাহ আমাদের বরকত দিয়েছেন। (মাজমাউয যাওয়াইদ)

রাসুলুল্লাহ সা. সাহাবিদের ভিক্ষা করতে এতোটাই নিষেধ করেছিলেন যে, তারা ছোটখাটো জিনিসের জন্যও কারও কাছে হাত পাততেন না। হজরত আবু বকর রা.-এর অবস্থা ছিল যে, তার উটনীর লাগাম নিচে পড়ে গেলেও তিনি নিজে নিচে নেমে তা উঠাতেন, কারো কাছে চাওয়ার কথা ভাবতেন না। হজরত আবু যার গিফারী রা. ও হজরত সাওবান রা.-এর কাছে রাসুল সা. অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, তারা কারো কাছে কিছু চাইবেন না, এমনকি তাদের কোনো কাপড় নিচে পড়ে গেলেও অন্যের কাছে তা চেয়ে নেবেন না। হজরত আলী রা. থেকে বর্ণিত, নবী করিম সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি অভাবমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও ভিক্ষা করে, সে নিজের জন্য জাহান্নামের অঙ্গার জমা করছে। জিজ্ঞাসা করা হলো, অভাবমুক্ত কে? তিনি বললেন: যার কাছে এক রাতের খাবার মওজুদ আছে। (মাজমাউয যাওয়াইদ)

ভিক্ষাবৃত্তি অভাবের ফল নয়, বরং এর আসল কারণ হলো অলসতা, গাফিলতি এবং বিনামূল্যে খাওয়ার অভ্যাস। এর মূল কারণ হলো মানুষ লজ্জা ও গায়রত বা আত্মমর্যাদার চাদর ছিঁড়ে ফেলেছে। যদি মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মসম্মান থাকে, তবে সে কখনোই অন্যের সামনে হাত পাততে পারে না। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে নিজেকে পবিত্র ও আত্মমর্যাদাশীল রাখতে চায়, আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখেন; আর যে পরমুখাপেক্ষী না হতে চায়, আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত করে দেন। (মুসনাদে আহমাদ)। এই আত্মসম্মানবোধ অটুট রাখার জন্যই ইসলাম যাকাতের সামাজিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে, যাতে মানুষ বাইতুল মাল থেকে সাহায্য নেয় এবং কারও কাছে অপদস্থ না হতে হয়। যখন মানুষ একে অপরের কাছে ভিক্ষা করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, প্রথমে জিহ্বা খুলতে সংকোচ হয়, কিন্তু পরে তা অভ্যাসে পরিণত হয়; তখন না চোখে থাকে লজ্জা, না মুখে থাকে দ্বিধা।

কোনো জাতির জন্য এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক যে, তাদের শিশু, যুবক-যুবতী অলসতা ও বিবেকহীনতার শিকার হয়, অথচ তারাই জাতির সম্পদ। ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় পদক্ষেপই প্রয়োজন। ইতিবাচক পদক্ষেপ হলো, এমন শিশুদের শিক্ষায় নিয়োজিত করা। সরকারি ও বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে বিনামূল্যে শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা আছে, তাদের সেখানে পাঠানো। যে নারী ও পুরুষ কাজ করার যোগ্য, তাদের কাজে লাগানো। আজকাল শ্রমিকের চাহিদা অনেক বেশি। যারা প্রকৃতই শারীরিক প্রতিবন্ধী, তাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা বা সরকারি কল্যাণমূলক সংস্থায় তাদের পৌঁছে দেওয়া।

ইতিবাচক পদক্ষেপ হলো, ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করা। মসজিদ ও দরগাহের দায়িত্বশীলরা তাদের সেখানে বসতে বা ভিক্ষা করতে নিষেধ করবেন। ধর্মীয় সভা, জুমা ও ঈদের দিনগুলোতে তাদের ভিক্ষা করতে নিষেধ করা উচিত এবং তাদের কোনো কিছু না দেওয়া। যদি তারা ভিক্ষা চায়, তবে তাদের কাজ করার উৎসাহ দেওয়া উচিত। এভাবে ভিক্ষাবৃত্তি নিরুৎসাহিত হবে এবং তারা সম্মানের সাথে কামাই করতে শিখবে। অনেকে জুমা ইত্যাদি দিনে খুচরা টাকা নিয়ে আসেন এবং প্রতিটি ভিক্ষুককে এক-দুই টাকা দিতে থাকেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি নেক কাজ মনে হলেও পরোক্ষভাবে এটি নিজের জাতির একটি গোষ্ঠীকে ভিক্ষাবৃত্তিতে অভ্যস্ত করে তোলা। তাই জাতির স্বার্থেই এসব থেকে বিরত থাকা জরুরি।

রাসুলুল্লাহ সা.-এর আদর্শ আমাদের সামনে বিদ্যমান যে, তিনি একদিকে ভিক্ষুকদের ভিক্ষা দিতে নিষেধ করেছেন, অন্যদিকে তাদের পরিশ্রম করে নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর কৌশল শিখিয়েছেন। যদি আমরা আমাদের জাতিকে এই অভিশাপ থেকে বাঁচাতে চাই, তবে আমাদের তাদের মধ্যে এই মেজাজ তৈরি করতে হবে যে, তারা ঘাম ঝরিয়ে উপার্জন করবে এবং অর্ধেক পেটে খাবে, কিন্তু অন্যের সামনে হাত পেতে অসম্মানের পথ বেছে নেবে না।

লেখক: ভারতের বিখ্যাত আলেম; সভাপতি, অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড

[উর্দু থেকে লেখাটি অনুবাদ করেছেন: সাইমুম রিদা]

আইও


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ