|| মুফতি সিদ্দিকুর রহমান ||
চন্দ্রবর্ষের চাকা ঘুরে ঈদুল আজহার হাতছানি নিয়ে পশ্চিম দিগন্তে উদিত হয়েছে জিলহজের চাঁদ। এ মাসের দশম তারিখ মুসলমানদের জন্য বিশেষ এক আনন্দের দিন। ইসলাম এ দিনকে মুসলমানদের আনন্দ হিসেবে ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ উপহার দিয়েছে। ঈদের সে আনন্দ পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশী আর স্বজনদের সাথে ভাগাভাগি করতে শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরছে মানুষেরা।
ঈদ উপলক্ষে সকলের বাড়ি ভরতি থাকবে মানুষে। রাত-দিন কাটবে আনন্দে। ঈদের রাত পোহালেই মায়ের হাতে রান্না হবে সেমাই, ফিন্নি আর বিরিয়ানি-পোলাও। এ আনন্দে পরিবারের সব সদস্যই শরিক হবে। শরিক হবে না শুধু সেই ছেলেটি, যে পড়ালেখা করে কওমি মাদরাসায়। তার বাড়ি ফেরা হবে না ঈদের আগে। কোরবানির ঈদানন্দ তার কপালে জুটবে না। যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর কোরবানির ঈদে তাদের বাড়ি ফেরা হয় না। ছাত্রজীবন পেরিয়ে শিক্ষকজীবনেও একই নিয়তি। মাদরাসায় তাদের অনেক কাজ। সকাল হতে না হতেই ছুরি হাতে ছুটতে হয় কোরবানির চামড়া সংগ্রহের কাজে।
অন্য ছেলেরা যে ভোরে ঈদের নামাজ পড়ে বন্ধু-বান্ধব আর স্বজনদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে, সে ভোরে কওমির ছেলেরা গরুর মালিকের পিছু পিছু ছুটবে। কুরবানির মালিকপক্ষ সেদিন ঈদের নতুন জামা-কাপড় পরে থাকবে পরিপাটি। অন্যদিকে কওমিয়ানরা কাঁধে বহন করা কাঁচা চামড়ার রক্তে হবে মাখামাখি। রক্তে ভিজে একাকার হবে হাত-পা আর জামা-কাপড়সহ পুরো শরীর।
গরু একটি। সেখানে ছুরি হাতে উপস্থিত হবে কয়েক ডজন মৌলভী। শুরু হবে এক নীরব প্রতিযোগিতা। গরুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহের প্রতিযোগিতা। কার আগে কে করবে কোরবানি। চারদিক থেকে জবাই করার আবদার আসতে থাকবে। শুরু হবে টানটান ও বিব্রতকর এক পরিস্থিতি। গরু কিংবা ছাগলের একটি চামড়া সংগ্রহের জন্য রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অসহায়ের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এ ছাড়া মালিকপক্ষ থেকেও অনেক সময় ভাগ্যে জোটে কটু কথা, অমানবিক ও নির্দয় আচরণ। একটি চামড়ার দায়ে সবকিছু মুখ বুজে সয়ে নিতে হয়।
যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এ কাজের ধারাবাহিকতা। আর কওমিয়ানরাও এ কাজকে নিজেদের চরম নিয়তি, কেউ বা আবার সৌভাগ্য হিসেবেই মেনে নিয়েছে। সব জাতিরই বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে আর তাদের বৈশিষ্ট্য হলো শরিয়ত প্রদত্ত ঈদের মতো আনন্দঘন দিনে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ফেরা, দাঁড়িয়ে থাকা।
এ দেশে দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি তা কারো অজানা নয়। সব কিছুর মূল্য দিনের পর দিন ক্রমাগত বৃদ্ধি পেল আর চামড়ামূল্য শুধু ধীরে ধীরে নিচের দিকে গেল। তিন থেকে চার হাজার দরের চামড়া এখন চারশ’ থেকে পাঁচশতে এসে ঠেকেছে। নামমাত্র মূল্যে তা বিক্রি হচ্ছে। ট্যানারির মালিক ও সরকারপক্ষ যেন খুব ভালো করেই জানে হুজুরদেরকে এ কাজে সামান্য মূল্যে খাটানো সম্ভব। তাই তারা এক সময়ের চড়া মূল্যের চামড়াকে ধীরে ধীরে কৌশলে মূল্যহীন করে সাধারণ চামড়া ব্যাপারীদেরকে সরিয়ে এ কাজ হুজুরদের কাঁধে সঁপে দিয়ে আজীবন কৌশলী বাণিজ্য করার ফাঁদ পাতে। আর সে ফাঁদে পড়ে বছরের পর বছর হুজুররা কাজ করে চলছেন। তাঁরা স্বল্প মূল্যে চামড়া সংগ্রহ করে চামড়া শিল্পকে অভাবনীয় লাভবান করে যাচ্ছেন।
চামড়ামূল্যের বেহাল দশা দেখে সম্প্রতি দেশের "কিছু মাদরাসা মূল্য বৃদ্ধি পেলে চামড়া কালেকশনের বিষয়টি পুনর্বিবেচিত রেখে এ বছর চামড়া সংগ্রহ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে" এমন সংবাদ প্রচার হওয়ার পর সরকারপক্ষ নড়চড়ে বসেছে। সরকারপক্ষ লাভ-লোকসানের টানাপোড়েনের অঙ্ক কষে কয়েক দফা আলেমদের সাথে বৈঠক করেছে এবং তাঁদেরকে বিভিন্নভাবে উৎসাহ ও উদ্দীপনা দানের মাধ্যমে চামড়া সংগ্রহ কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
দেশের চলমান এ পরিস্থিতিতে মাদ্রাসাকর্তৃক চামড়া কালেকশনের বিষয়টি গণমাধ্যমে আলোচিত ও প্রচারিত হচ্ছে। চলছে আলোচনা, সমালোচনা। ভিন্নজন ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করছেন। অনেকেই চামড়া কালেকশনের ব্যাপারে আমাদের আকাবিরদের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল, তা পেশ করেছেন। বিশেষ করে ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন, সর্বজন শ্রদ্ধেয়, অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, বাংলার খ্যাতনামা হযরত আতাউল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর এবং পাকিস্তানের মশহুর ও প্রসিদ্ধ ফকীহ ইউসুফ বান্নূরী রহ. সহ আরও অনেক আলেম-উলামা মাদরাসা ছাত্রদের দ্বারা প্রচলিত চামড়া কালেকশনের পক্ষে ছিলেন না। তাঁরা বিষয়টির বিপক্ষে ছিলেন; কারণ মাদরাসার ছাত্রদের—যারা ইলমে নববীর ওয়ারিস—এ কাজে তাদের বেইজ্জতি হয়। ঈদের আনন্দ থেকে তারা বঞ্চিত হয়। তাই তারা প্রচলিত চামড়া কালেকশন বন্ধ করে ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
সবকিছু বিবেচনা করে সম্প্রতি কিছু মাদরাসা কর্তৃপক্ষ চামড়া কালেকশন না করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সবাই তাদের পথে হেঁটে এমন বেইজ্জতির কাজ থেকে ফিরে আসাই হবে সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত।
আবার কেউ কেউ ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের অনেকেই বলছেন, কওমি মাদরাসাগুলো চামড়া সংগ্রহের কাজ থেকে সরে আসলে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। দূরত্ব তৈরি হতে পারে জনসাধারণ ও মাদরাসার সম্পর্কের মাঝে। তারা যে শঙ্কা বোধ করছেন মূলত তার কোনো সারবত্তা নেই; বরং, বাস্তবতা ভিন্ন চিত্রের কথা বলে। কেননা, জনসাধারণের প্রত্যহ জীবনে এমন অনেক ইবাদত, কাজকর্ম ও আচার-অনুষ্ঠান রয়েছে যেখানে মাদরাসার ছাত্রদের ব্যাপক উপস্থিতি বা অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয় না। সে হিসেবে কুরবানি ঈদে শুধু কুরবানির পশুর জবাই করা এবং চামড়া নিয়ে আসার জন্য ব্যাপকহারে তারা অংশগ্রহণ না করলে জনমনে বিরূপ প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে না ইনশাআল্লাহ। জনসাধারণকে তাদের কাজ ও দায়িত্ব—যেমন নিজ হাতে কুরবানি করা মুস্তাহাব, চামড়া বা চামড়ার মূল্য মাদরাসার গরিব-অসহায় ছাত্ররা পাওয়ার অধিক হকদার এবং সে চামড়া বা চামড়ার মূল্য তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া মালিকপক্ষের দায়িত্ব—বুঝিয়ে নিজেরা সরে আসাই উত্তম হবে। এতে মাদরাসা পড়ুয়া ছাত্ররাও ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারবে। কুরবানিদাতারাও নিজ কাজ ও দায়িত্বে যত্নবান হবেন।
দেশের অনেক মাদরাসা আগে থেকেই আকাবিরদের পথ ও মতের অনুসরণ ও অনুকরণে চামড়া কালেকশনের কাজ থেকে বিরত থেকেছে। সম্প্রতি চামড়ার চরম মূল্য হ্রাসের কারণে আরও অনেক মাদরাসা কর্তৃপক্ষ চামড়া সংগ্রহে না যাওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁদের সে সিদ্ধান্ত আকাবিরদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তিত হয়ে স্থায়ী ও ব্যাপক হোক।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ
আইও/