মিসরের ঐতিহ্যবাহী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক থিওলোজি ফ্যকাল্টির ইমাম জাহাবি রহ. হলরুমে রোববার (৮ মার্চ ২০২৬) মোতাবেক ১৮ রমজান ১৪৪৭ হিজরি অনুষ্ঠিত হয় উক্ত ফ্যাকাল্টির উলুমুল হাদিস বিভাগের বাংলাদেশি কৃতি গবেষক ড. মুহাম্মাদ মুশাররাফ হুসাইন বিন মুহাম্মাদ নূরুল হকের ডক্টরেট (PhD) থিসিস ডিসকাশন সেমিনার।
তাঁর গবেষণার শিরোনাম ছিল:
«شرح الإمام الزرقاني رحمه الله (ت: 1122هـ) على المواهب اللدنية للقسطلاني – دراسة وتحقيق: من: أول غزوة بني لحيان إلى: أخر غزوة خيبر»
‘ইমাম কাসতাল্লানি রচিত ‘আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়াহ’-এর ওপর ইমাম যুরকানি রহ. এর ব্যাখ্যাগ্রন্থের গাযওয়াতু বনি লিহয়ান থেকে নিয়ে গাযওয়াতু খাইবারের শেষ পর্যন্ত অংশের গবেষণামূলক বিশ্লেষণ ও নিরীক্ষা।’
সেমিনারের সুপারভাইজারগণ, উক্ত থিসিস ডিসকাশন সেমিনারে প্রধান পর্যালোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদগদ্ধ হাদিস গবেষক অধ্যাপক ড. সুবহি আব্দুল ফাত্তাহ রাবি এবং ড. মুহাম্মাদ নাসর আদ-দাসুকি আল-লাব্বান। থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক ড. আল-খুশুয়ি আল-খুশুয়ি মুহাম্মাদ আল-খুশুয়ি ও অধ্যাপক ড. ইমাদ আস-সাইয়্যিদ মুহাম্মাদ ইসমাইল আশ-শিরবিনি।
এছাড়াও উসুলুদ্দিন ফ্যাকলটির সম্মানিত ডিন অধ্যাপক ড. মাহমুদ মুহাম্মদ হুসাইনসহ বিভিন্ন অনুষদের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ এবং দেশী-বিদেশী বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে সেমিনারটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। গভীর গবেষণা, বিশ্লেষণী দক্ষতা ও উপস্থাপনার মানে পরীক্ষকবৃন্দ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং গবেষক *ড. মুহাম্মাদ মুশাররাফ হুসাইন*-কে মারতাবাতুশ শারাফিস সানিয়া বা জায়্যিদ জিদ্দ্যান (Very Good) গ্রেডে উত্তীর্ণ ঘোষণা করেন।
গবেষকের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত
তিনি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর এক ঐতিহ্যবাহী ও ইলমি সমৃদ্ধ পরিবারে ১৯৭৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বংশীয় পরিচয় বাংলাদেশের দ্বীনি শিক্ষার ইতিহাসের সাথে মিশে আছে; তিনি বাংলাদেশে ইসলামিধারার ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা আব্দুল হামিদ (রহ.)-এর প্রপৌত্র। পারিবারিকভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সেই জ্ঞানতৃষ্ণাকেই তিনি ধারণ করেছেন তাঁর দীর্ঘ শিক্ষাজীবন।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর জ্ঞানার্জনের বর্ণাঢ্য জীবন নিম্নে তুলে ধরা হলো:
দাওরায়ে হাদিস ও তাফসীর: ১৯৯৬ সালে হাটহাজারী মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদীস (তাকমিল) সম্পন্ন করেন এবং ১৯৯৭ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে তাফসীর ও উলুমুল কুরআনে উচ্চতর দক্ষতা (তাখাসসুস) অর্জন করেন।
ভারত সফর: ১৯৯৯ সালে ভারতের প্রখ্যাত দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা, লখকনৌ থেকে 'আল-আলিমিয়্যাহ' (স্নাতক) ডিগ্রি অর্জন করেন।
আল-আযহার ও উচ্চতর গবেষণা: বিশ্ববিখ্যাত আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক থিওলোজি অনুষদের উলুমুল হাদিস বিভাগ থেকে ২০১৩ সালে তিনি সাফল্যের সাথে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এই ধারাবাহিকতায় একই বিভাগ থেকে এবার তিনি পিএইচডি (ডক্টরেট) ডিগ্রি অর্জনের গৌরব অর্জন করেন। তার মাস্টার্স থিসিসের বিষয় ছিল "সুন্নাহর আলোকে 'শহীদ' ও 'শাহাদাত': একটি হাদীসভিত্তিক পর্যালোচনা।" (الشهيد والشهادة في السنة النبوية)।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি ইলমে দ্বীনের বহুমুখী খিদমতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। এসবের অন্যতম হলো:
অধ্যাপনা: বর্তমানে তিনি তাঁর শিকড়, হাটহাজারী মাদ্রাসার উলুমুল হাদিস, দাওয়াহ ও ইরশাদ বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।
বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব: ইতোপূর্বে তিনি চট্টগ্রামের বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসার কুরআন ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে এবং নানুপুর উবাইদিয়া মাদ্রাসার আরবি বিভাগে অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
কর্মজীবনের সূচনা: তিনি হাটহাজারীর নাসিরুল ইসলাম ফতেপুর মাদ্রাসা ও ফটিকছড়ির তালীমুদ্দীন মাদ্রাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের ভিত্তি স্থাপন করেন।
পারিবারিক জীবন: ব্যক্তিজীবনে তিনি বিবাহিত এবং এক কন্যা ও তিন পুত্র সন্তানের জনক। বিশাল একান্নবর্তী পরিবারের ৬ ভাই ও ৭ বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর পারিবারিক এই আবহ তাঁকে ধৈর্য ও একনিষ্ঠতার সাথে জ্ঞানসাধনায় সাহায্য করেছে।
সংগঠন ও নেতৃত্বে ভূমিকা: পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি মিশরে অবস্থানরত বাংলাদেশি ছাত্র সমাজের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
- তিনি আযহার ওয়েলফেয়ার সোসাইটি বাংলাদেশ, মিশর-এর প্রতিষ্ঠাতা ও শুরুর দিকের নেতৃবৃন্দের অন্যতম।
- এছাড়া মিশরে অবস্থিত বাংলাদেশি স্টুডেন্টদের সংগঠন “বাংলাদেশ স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন ইজিপ্ট”-এ ২০০৫–২০০৬ সেশনে প্রচার সম্পাদক এবং ২০০৭–২০০৮ সেশনে সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আযহার ওয়েলফেয়ার সোসাইটি বাংলাদেশ, মিশর-এর পক্ষ থেকে গবেষককে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়। এই সাফল্য বাংলাদেশের সকল ছাত্র-ছাত্রী এবং সোসাইটির জন্য গর্বের বিষয়। গবেষক ড. মুহাম্মাদ মুশাররাফ হুসাইন কৃতিত্বের মাধ্যমে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় এবং সমগ্র বাংলাদেশি শিক্ষাজগতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
কৃতিত্বপূর্ণ এই অর্জনে অভিভূত ড. মুহাম্মাদ শাররাফ হুসাইন বলেন, ‘জ্ঞান অর্জন নির্দিষ্ট কোনো বয়সের সীমায় আবদ্ধ নয়। সুদীর্ঘ চেষ্টা-সাধনার পর জীবনের সমাপ্তিমুখী সময়ে এই সাফল্য আল্লাহ তাআলার বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ। আযহার ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সকল দায়িত্বশীল ও শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।’
আইএইচ/