কুড়িগ্রামের রাজারহাটে উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টিতে তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। পানি বাড়ার সঙ্গে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনও দেখা দিয়েছে। এতে অন্তত ৯ গ্রামের হাজারো মানুষ নতুন করে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
গত দুই দিনে কাউনিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বেড়েছে ৬৮ সেন্টিমিটার।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় পানি ২৯ দশমিক ২০ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল, যা বিপৎসীমার মাত্র ১১ সেন্টিমিটার নিচে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমা ২৯ দশমিক ৩১ মিটার। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ওই পয়েন্টে নদীর পানির উচ্চতা ছিল ২৮ দশমিক ৫২ মিটার। রাতভর ভারি বৃষ্টির পর ২৫ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ৮৬ মিটারে। এরপর রোববার বিকাল ৩টায় আরও ৩৪ সেন্টিমিটার বেড়ে পানির উচ্চতা ২৯ দশমিক ২০ মিটারে পৌঁছায়।
পাউবো জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রামে ২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উজানের ঢলের পাশাপাশি বৃষ্টিপাতের কারণে নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। জেলার অন্যান্য নদ-নদীতেও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিস্তার পানি বাড়তে থাকায় রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের পলাশপুর, ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের বুড়িরহাট, গতিয়াশাম ও চর গতিয়াশাম এবং বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চতুরা, তৈয়ব খাঁ, চর তৈয়ব খাঁ, রামহরি ও চর বিদ্যানন্দ গ্রামের মানুষ নদীভাঙনের শঙ্কায় রয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টিতে পলাশপুর, তৈয়ব খাঁ ও চর বিদ্যানন্দ এলাকার কিছু অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকা এবং নদীর পানি বাড়তে থাকায় এ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন তারা।
চর বিদ্যানন্দ এলাকার বাসিন্দা মাইদুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরেই আমার এলাকায় প্রায় ২৫টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের শিকার হয়েছেন ওমর আলী, রহিম বাদশা, সোনা মিয়া, ফখরুল ইসলাম, কমল উদ্দিন, হাজির উদ্দিন, মতিন মিয়া, আব্দুল জলিল, মেহের আলী, আব্দুস সালাম, গনি মুন্সী, শরিফুল ইসলাম, মোস্তফা কামাল ও জোসনাসহ অনেকে।
তিনি বলেন, নদীভাঙনে এসব পরিবার প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি পরিবার চর বিদ্যানন্দ ছেড়ে তৈয়ব খাঁ এলাকায় এসে নদীর তীরে নতুন করে বসতি গড়েছে। কিন্তু তিস্তায় পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে তারাও আবার ভাঙনের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।
মেদনী এলাকার বাসিন্দা সুলতান আলী বলেন, এ বছর টাই কুফা হামার জন্য। চরোত বাদাম গাড়ছিনোং। পানি বাড়িয়া সব বাদাম তলে গেলো। মোক ধ্বংস করি গেইল এই নদী। এবার ফির এই পানি বাড়ছে। কি যে হইবে আল্লাহ জানে।
বুড়িরহাট এলাকার ইউপি সদস্য মামুন বলেন, কয়দিন আগোত বুড়িরহাটের বাঁধটা ভাঙ্গি নিয়্যা গেইল। এখন ফির পানি বাড়তেছে। মানুষ বাঁচপে কেমন করি। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে নদীভাঙন থেকে মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিস্তার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের তীব্রতাও বাড়ছে। পানি আরও বাড়লে নদীভাঙনের পাশাপাশি লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বসতবাড়ির পাশাপাশি আবাদি জমি, ফসল ও স্থানীয় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
তবে পানি বাড়ার পর রাজারহাটে নতুন করে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, উজানের ঢল ও ভারি বৃষ্টির কারণে গত কয়েক দিনে জেলার সব নদ-নদীর পানি বেড়েছে। এখন পর্যন্ত রাজারহাটে নতুন করে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, এ বছরের বরাদ্দ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে আরও জিও ব্যাগের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। এখনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিস্তার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি চলে আসায় নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে নতুন নতুন এলাকায় ভাঙন দেখা দিতে পারে। এতে চলতি বছরের ভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলোর পাশাপাশি নদীতীরবর্তী আরও বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
এসএইচ/