|| ইমরান ওবাইদ ||
আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে আনা হাফেজদের রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা দেওয়ায় প্রশংসা পেয়েছিল সরকার। গত বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশ্বজয়ী হাফেজদের সংবর্ধনা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে তাদের হাতে বিভিন্ন উপহারের পাশাপাশি ইসরায়েলি লেখক ও ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়াহ হারারির লেখা ‘নেক্সাস’ বই তুলে দেওয়া হয়।
এরপরই বইটি উপহার হিসেবে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি ও সমালোচনা শুরু হয়। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টিসহ কয়েকটি ইসলামী সংগঠন এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, বিশ্বজয়ী হাফেজদের সম্মাননা অনুষ্ঠানে ইসলামি আকিদা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তারা যে লেখকের চিন্তাধারাকে মনে করেন, তাঁর বই উপহার হিসেবে দেওয়া অনভিপ্রেত।
‘নেক্সাস’ ইউভাল নোয়াহ হারারির ২০২৪ সালে প্রকাশিত বই। বইটির পূর্ণ নাম Nexus: A Brief History of Information Networks from the Stone Age to AI। এতে প্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ পর্যন্ত তথ্য, তথ্যের নেটওয়ার্ক এবং সেগুলোর মাধ্যমে মানবসমাজ ও সভ্যতার বিকাশ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
হারারি ইতিহাস, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রবাহ ও ভবিষ্যৎ সমাজ নিয়ে লেখালেখির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। তার বিভিন্ন বই ও চিন্তাধারা নিয়ে একদিকে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে, অন্যদিকে ধর্ম, ঈশ্বর, মানবসমাজ ও সভ্যতার ব্যাখ্যা নিয়ে ধর্মীয় মহলে সমালোচনাও রয়েছে।
ইসলামি সংগঠনগুলোর আপত্তির মূল জায়গাটিও এখানেই। তাদের বক্তব্য, একজন কুরআনের হাফেজের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননা অনুষ্ঠানে এমন বই বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও অনুষ্ঠানের প্রকৃতি বিবেচনা করা উচিত ছিল।
বিষয়টি নিয়ে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে প্রতিবাদ জানান হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমান।
তারা বলেন, বিশ্বজয়ী হাফেজদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে এমন একটি অনুষ্ঠানে ইউভাল নোয়াহ হারারির ‘নেক্সাস’ বই উপহার দেওয়া দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। তাদের দাবি, হারারির চিন্তাধারার বিভিন্ন দিক ইসলামি আকিদা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিবৃতিতে হাফেজদের জন্য বইটি কীভাবে নির্বাচন করা হলো, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে হাফেজদের কাছ থেকে বইটি প্রত্যাহার করে সেখানে উপযুক্ত ইসলামি ও ঐতিহ্যবাহী গ্রন্থ দেওয়ার দাবি জানায় হেফাজত।
‘নেক্সাস’ উপহার দেওয়ার ঘটনায় সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও। শনিবার বাদ জোহর দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে আমেলার বৈঠকে নেতারা এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের বক্তব্য, বিশ্বজয়ী হাফেজদের পুরস্কার হিসেবে ‘নেক্সাস’ বই দেওয়ার ঘটনায় সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দলটির নেতারা এ ঘটনাকে সরকারের বিভিন্ন সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন এবং এর ব্যাখ্যা দাবি করেন।
একই দিন ‘নেক্সাস’ উপহার দেওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ জানায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ। শনিবার বাদ মাগরিব জমিয়তের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেতারা বলেন, পবিত্র কোরআনের হাফেজদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এমন একটি ধর্মীয় মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য সমালোচিত একজন লেখকের বই উপহার দেওয়া দুঃখজনক। তাদের মতে, এতে অনুষ্ঠানের ধর্মীয় আবহ ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ ঘটনায় উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টিও। শনিবার দলটির ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সুবহানী ও মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, কোরআনের হাফেজরা শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাওয়া ব্যক্তি নন; তারা কোরআন মুখস্থকারী এবং বাংলাদেশের ধর্মীয় ঐতিহ্যেরও প্রতিনিধিত্ব করেন।
তাদের প্রশ্ন, হাফেজদের রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনার মতো একটি অনুষ্ঠানে ‘নেক্সাস’ কেন উপহার হিসেবে নির্বাচন করা হলো। তাদের মতে, এ ধরনের অনুষ্ঠানে কোরআনের অনুবাদ, তাফসির, হাদিস, সিরাত কিংবা ইসলামি জ্ঞান ও নৈতিকতা বিষয়ক গ্রন্থ দেওয়ার সুযোগ ছিল।
নেজামে ইসলাম পার্টির নেতারা বইটি নির্বাচনের প্রক্রিয়া ও এর পেছনে কার পরামর্শ ছিল, তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন।
মূলত দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই ইসলামি দলগুলোর আপত্তি। প্রথমত, কুরআনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হাফেজদের রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনার মতো একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে কোন ধরনের বই নির্বাচন করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ইউভাল নোয়াহ হারারির ধর্ম, ঈশ্বর ও মানবসভ্যতা নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য ও চিন্তাধারা ধর্মীয় মহলে যেভাবে সমালোচিত হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে হাফেজদের জন্য তার বই নির্বাচন করা কতটা উপযুক্ত ছিল—এ প্রশ্ন।
আইও/