শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬ ।। ২৬ চৈত্র ১৪৩২ ।। ২২ শাওয়াল ১৪৪৭


ইলম, ইখলাস ও ত্যাগের এক দীপ্ত জীবনগাথা

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| সলিমুদ্দীন মাহদী কাসেমী ||

জীবন কখনো শুধুই দিনগণনা নয়। কখনো তা হয়ে ওঠে এক দীপ্ত মানচিত্র। কিছু মানুষ পথ চলে। কিছু মানুষ পথ দেখায়। কেউ ইতিহাস পড়ে। কেউ ইতিহাস রচনা করে। মুফতি আবু তাহের কাসেমী নদভী (রহ.)—ছিলেন তেমনি এক জীবন।

নিঃশব্দে দীপ্ত। বিনয়ে উচ্চ। ত্যাগে উজ্জ্বল। তিনি ছিলেন ইলমের মিনার। আমলের আয়না। তাকওয়ার সুগন্ধ। একজন শিক্ষক, কিন্তু শুধু পাঠদাতা নন। একজন নেতা, কিন্তু শুধু প্রশাসক নন। একজন সাধক, যার অন্তর জেগে থাকত রাত্রির নীরব কান্নায়।

তাঁর জীবন—একটি ধারাবাহিক সাধনা। তাঁর পথচলা—একটি আমানতের হেফাজত। তাঁর উত্তরাধিকার—একটি জীবন্ত দিশা।

তিনি গতকাল সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬, ১০ই শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরী দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে ইন্তেকাল করেন, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। তিনি ৩ ছেলে, ১ মেয়ে এবং অসংখ্য ছাত্র-ভক্ত রেখে গেছেন। নিম্নে তার সংক্ষিপ্ত জীবন চরিত আলোচনা করা হলো।

আরও পড়ুন: মুহতামিমসহ পটিয়া মাদরাসার নতুন পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন যাঁরা

ব্যক্তিগত পরিচিতি

মুফতি আবু তাহের কাসেমী নদভী (রহ.) ১৯৬০ সালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার উত্তর নিচিন্তাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম নজির আহমদ ছিলেন দ্বীনদার ও সৎ চরিত্রের অধিকারী।

প্রাথমিক শিক্ষা

শৈশবেই পারিবারিক পরিবেশে তাঁর দ্বীনি শিক্ষার সূচনা হয়। ক্বারী হারুন সাহেবের নিকট কুরআন তিলাওয়াত ও প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে জামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুরে ভর্তি হন। এরপর চন্দ্রঘোনার কোরআনিয়া মাদ্রাসায় কয়েক বছর অধ্যয়ন করেন। পুনরায় নানুপুরে ফিরে চাহারুম পর্যন্ত শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

উচ্চতর শিক্ষা

উচ্চতর দ্বীনি জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে তিনি আল-জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ায় ভর্তি হন। ১৯৮০ সালে দাওরায়ে হাদীস এবং ১৯৮১ সালে ইফতা সম্পন্ন করেন। এরপর জ্ঞানপিপাসা তাঁকে নিয়ে যায় দারুল উলুম দেওবন্দে, যেখানে তিনি পুনরায় দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেন (১৯৮৪)। পরে নদওয়াতুল উলামা, লখনৌতে দুই বছর আরবি ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। এ যাত্রা তাঁর ইলমী গভীরতাকে নতুন মাত্রা দেয়।

শিক্ষকতা জীবন

১৯৮৫ সালে তিনি আল-জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ায় শিক্ষকতা শুরু করেন। শুরুটা ছিল কষ্টের। বেতন ছিল না, থাকার স্থায়ী ব্যবস্থা ছিল না। তবুও থেমে যাননি। নিঃশব্দে, নিরলসভাবে, ইখলাসের সাথে তিনি তাদরিস চালিয়ে যান। ধীরে ধীরে তাঁর তাকওয়া, ধৈর্য ও নিষ্ঠা সকলের আস্থা অর্জন করে। দীর্ঘ সময় তিনি হাদীস ও আরবি সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে অসংখ্য আলেম গড়ে তোলেন।

খতীবুল জামিয়া

১৯৮৮ সাল থেকে তিনি জামিয়ার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর খুতবা ছিল দলিলনির্ভর, গভীর ও প্রভাবশালী। কুরআন-হাদীসের আলোচনার সাথে রূহানিয়াতের এক অনন্য সমন্বয় এতে প্রতিফলিত হতো।

দারুল ইকামার নাজিম

১৯৯৭ সালে তাঁকে দারুল ইকামার নাজিম নিযুক্ত করা হয়। প্রায় ২৫ বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে ছাত্রদের আমল, আখলাক ও শৃঙ্খলায় এক আদর্শ পরিবেশ গড়ে ওঠে। জামিয়ার ছাত্রাবাস তাঁর নেতৃত্বে একটি অনুকরণীয় মডেলে পরিণত হয়।

প্রশাসনিক দায়িত্ব

২০১৯ সালে তিনি মুঈনে মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২২ সালে নায়েবে মুহতামিম নিযুক্ত হন। ২০২৪ সালে সংকটময় সময়ে তাঁকে মজলিশে এদারীর আহবায়ক করা হয়। অবশেষে একই বছর শুরার সর্বসম্মতিক্রমে তিনি জামিয়ার মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সংকটময় সময়ে নেতৃত্ব

তাঁর নেতৃত্বকাল ছিল চ্যালেঞ্জপূর্ণ। নানা ষড়যন্ত্র, হামলা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে তাঁকে পথ চলতে হয়েছে। তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি। ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করেছেন। এই সময় তাঁর সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ বিশেষভাবে স্মরণীয়।

আধ্যাত্মিক জীবন

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি তাসাউফের সাথে যুক্ত ছিলেন। মাওলানা আবরারুল হক হারদুয়ী (রহ.)-এর নিকট দীর্ঘদিন ইস্লাহ গ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে মুফতি আব্দুর রহমান (রহ.)-এর হাতে বাই‘আত গ্রহণ করেন।

তিনি নিজেও বহু মানুষের আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক ছিলেন। তাহাজ্জুদ, জিকির ও দোয়া তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

রচনাবলি

তিনি লেখালেখিতেও সক্রিয় ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ:

(১) দুরুসুল লুগাতুল আরবিয়া (১ম ও ২য় খণ্ড)

(২) আমার দেখা লন্ডন

(৩) কওমি মাদরাসা: কী ও কেন?

(৪) হাম কৌন হ্যায়? হামারি যিম্মাদারি কিয়া হ্যায়?

(৫) তাযকিরায়ে শাহ আলী আহমদ বোয়ালভী

(৬) নিদাউল মানাবির

(৭) তামরীনুল মিজান ওয়াল মুনশাইব

এই জীবনচিত্র সংক্ষেপ। কিন্তু অর্থে গভীর। তিনি ছিলেন না কেবল একটি নাম। তিনি ছিলেন এক ধারা। এক আমানত। এক আলোর রেখা।

তাঁর অনুপস্থিতি শূন্যতা। তাঁর উত্তরাধিকার পথনির্দেশ। আর তাঁর জীবন একটি নীরব দাওয়াত, ইলম ও ইখলাসের পথে।

আল্লাহ তাআলা মরহুমকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন, তাঁর কবরকে জান্নাতের বাগিচায় পরিণত করুন, তাঁর সকল খেদমতকে কবুল করুন। আল্লাহ তাঁকে আকাবিরদের সঙ্গ দান করুন এবং তাঁর রেখে যাওয়া দ্বীনি কাজকে কিয়ামত পর্যন্ত জারি রাখুন। শোকসন্তপ্ত পরিবার, ছাত্র-শিক্ষক ও ভক্তদেরকে সবরে জামিল দান করুন। আমীন।

লেখক: শিক্ষক  তত্ত্বাবধায়ক, তাফসির বিভাগ, আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ