রবিবার, ২৪ মে ২০২৬ ।। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ৭ জিলহজ ১৪৪৭


কুরবানির হাট: সচেতনতার বার্তা

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

আল আমীন বিন সাবের আলী-

কুরবানি মুমিন জীবনের একটি মৌলিক ইবাদত। উক্ত ইবাদতের মূল অনুষঙ্গ হচ্ছে শরিয়ত নির্ধারিত প্রাণী সমূহ। আর এর সহজ লভ্যতার জন্য হাট-বাজারের প্রয়োজন হয়। আমাদের দেশের নানা প্রান্তে প্রতি বছর কুরবানির ঈদ উপলক্ষে গরুর হাট বসানো হয়। সেটা বোঝার উপায় প্রাথমিকভাবে মাইকে "বিরাট গরু ছাগলের হাট" ঘোষণা। উক্ত এলানটির শুদ্ধ রূপ অনেকে বলে থাকেন এভাবে "গরু ছাগলের বিরাট হাট"। সে যাই হোক, এই হাট ইন্তেজামের সিস্টেম দেখে একটা হাদিসের কথা বারবার মনে আসে। হযরত রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'প্রকৃত মুসলমান তো ঐ ব্যক্তি যার হাত ও জবান থেকে অন্য মুসলমানগণ নিরাপদ থাকে।' (সহিহুল বুখারি, ১০)

উক্ত হাটগুলোর মাইক থেকে নারী-পুরুষের বিকট আওয়াজে ঘোষণা প্রদানসহ ক্ষণে ক্ষণে গান বাদ্য বাজানো থেকে শুরু করে ক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত হাসিল আদায়, জোরপূর্বক পশু আটক করে দরদাম করা, বিক্রেতাদের জিম্মি করা, খাওয়া-থাকা ইস্তেঞ্জা ও গোসলের যাবতীয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, জাল টাকা ছড়ানো এবং প্রতারণার মতো অনৈসলামিক ও অপরাধমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সয়লাব হয়ে থাকে। যা কোরবানির মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। একটি মৌলিক ইবাদতকে কেন্দ্র করে এ জাতীয় গুনাহের পরিবেশ সৃষ্টি করা মোটেই শরীয়ত সমর্থিত নয়। বরং এটি এক প্রকার অনধিকার চর্চারও নামান্তর। আল্লাহর পানাহ!

এ সকল কর্মকান্ডের এক কথায় শিরোনাম দেওয়া যায়, সেটা হচ্ছে, মানুষকে কষ্ট দেওয়া। হাদিসের ভাষ্য মোতাবেক এক মুসলমান অপর মুসলমানকে কষ্ট দেওয়ার কারণে প্রকৃত মুসলমানের কাতার থেকে বের হয়ে যায়। আমরা বর্তমানে অর্থ আর ক্ষমতার মোহে মানুষকে মানুষই মনে করছি না। একই সঙ্গে মানুষদেরও যেমন কষ্ট দিচ্ছি, কোরবানির হাটে আনা পশুগুলোকেও কষ্টের সম্মুখীন করছি। যে শ্রেণীকে যেই শ্রেণীর পাশে রাখলে তাদের মাঝে সংঘর্ষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেই বিষয়টাও সতর্ক নজরে না রাখায় তাদের একে অপরের প্রতি আক্রমণের কারণে স্বাভাবিক চলাচলকারীদের জন্য বিরাট ঝুঁকি তৈরি হয়। হাটের মাইকে ঘোষণা হয় অনেক সুযোগ-সুবিধার, কিন্তু বাস্তবতার সাথে তার মিল বড়ই দুঃসাধ্য। দেশ সমাজ ও নাগরিকদের প্রতি সহনশীলতার পরিচয় দিতে উপরোক্ত হাদিসসহ নিম্নোক্ত দু-একটি হাদিসও জানা থাকা দরকার। রাসুল সা. ইরশাদ করেন, 'পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ..।' (সহিহ মুসলিম, ২২৩) আরো ইরশাদ করেন, 'তোমরা তোমাদের আঙ্গিনাসমূহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখো এবং ইহুদিদের বিরোধিতা করো।' (আবু ইয়ালা, ৭৯০)

সরকারি বা ইজারার নির্ধারিত জায়গার গণ্ডি ছাড়িয়ে হাট বসানো হচ্ছে যত্রতত্র। জরুরী প্রয়োজনে যাতায়াত কিংবা নামাজের জন্য বের হলেও অতি সতর্কতা ব্যতীত স্বাভাবিক চলাচলের পরিস্থিতি ক্ষুন্ন করা হচ্ছে। এতে সাধারণ জনগণের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বাড়তি সময় যেমন খোয়ানো হচ্ছে, পাশাপাশি তাদের জামা-কাপড় ইত্যাদির পবিত্রতার বিষয়েও বৈরী পরিবেশ তৈরী হচ্ছে। উক্ত সার্বিক বিষয়ে হাট কর্তৃপক্ষসহ সকলেরই সু-দৃষ্টি প্রয়োজন। একদিকে একটি ইবাদতকে কেন্দ্র করে হাট বসানোর দ্বারা বহু মানুষের ব্যাপক ফায়দার বিষয়টি যেমন অস্বীকারের সুযোগ নেই, অপরদিকে তা অনেক মানুষের কষ্টেরও কারণ হচ্ছে –সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি। হাট, মাঠ, রাস্তা বা বাজার কিংবা এলাকার অলি-গলি সর্বত্রই কুরবানি নামক ইবাদতকে কেন্দ্র করে ইবাদতের আবহ তৈরি হোক, এটাই হচ্ছে স্বাভাবিক প্রত্যাশা। জিলহজের প্রথম দশকে অন্যতম ইবাদত তাকবিরে তাশরিক। এর গুরুত্ব প্রদানে আল্লাহর রাসুলের অনেক সাহাবী মানুষদেরকে শোনানোর উদ্দেশ্যে বাজারে গিয়ে তাকবির বলতেন। হাটের ক্রেতা বিক্রেতারা অবসর ও অলস সময়টাকে মোবাইল ও অনর্থক কথাবার্তায় ব্যয় না করে এই চাকরির পাঠে ব্যয় করতে পারি। বিশেষ করে উলামা তোলাবা যারা হাটে যান, তারা কমপক্ষে সাহাবায়ে কেরামের এই আমলটিকে জিন্দা করতে পারেন। হাটের মাইকেও গান না বাজিয়ে মধ্যম আওয়াজে থেমে থেমে তাকবির বাজালে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হবে। যার যার জায়গা থেকে হাট কর্তৃপক্ষের কাছেও এই দাওয়াত পেশ করা দরকার। তাহলে একটি হারিয়ে যাওয়া সুন্নাহ ও নেক আমলের ধারা চালুর জন্য চলমান সওয়াবের ভাগিদারও হতে পারব আমরা সকলে। আল্লাহ আমাদের সহিহ বুঝ দান করুক। আমিন!

লেখক: পরিদর্শক, বেফাকুল মাদারিসিলি আরাবিয়া, তরুণ লেখক

জেডএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ