আওয়ার ইসলাম ডেস্ক: চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধের সঙ্গে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্য জড়িত তাদের তালিকা নতুন করে করছে পুলিশ সদর দপ্তর।
ওই তালিকা ধরে ঈদের পর শুদ্ধি অভিযান চালানোর কথা রয়েছে। পুলিশের সব ইউনিট প্রধান, কমিশনার, রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ও জেলার পুলিশ সুপারদের (এসপি) এ নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়েছে।
দায়িত্বে অবহেলা ও অপরাধে জড়িত থাকায় ঢাকা ও বরিশালে গত মঙ্গলবার ২৪ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। পুলিশের এমন অপরাধ নিয়েও দুই দিনের অপরাধ সম্মেলনে আলোচনা হয়েছে। গত তিন মাসে কয়েকটি জেলার অপরাধ কর্মকাণ্ড নিয়েও আলোচনা হয়।
বিশেষ করে নড়াইলে কলেজ অধ্যক্ষকে হেনস্তা ও সিলেটে পুলিশের অস্ত্র খোয়া যাওয়া নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজি কেন হচ্ছে তারও কৈফিয়ত চাওয়া হয় সভায়। যেসব জেলায় নানা ঘটনা ঘটেছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে বলে পুলিশের ওই সূত্রটি জানায়।
এদিকে অপরাধ সম্মেলনের শেষ দিনে গতকাল বুধবার পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। যেসব মামলা দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত হচ্ছে সেগুলো দ্রুত সমাধান করতে বলা হয়েছে। তদন্তের মান বাড়াতেও বলেছেন আইজিপি। এ ছাড়া মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুলিশকে সতর্ক থাকা, মামলার সাক্ষীদের আদালতে হাজির করার ব্যবস্থা, ঈদে যাতে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি না হয় সেই জন্য নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে।
মাজার-ঈদগাহ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নজরদারির আওতায় আনা এবং নদীপথে অভিযান চালালে আগ্নেয়াস্ত্র রশিসহ ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ এই কাজটি করছে না বলে সম্মেলনে আলোচনা হয়। ঈদুল আজহাকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা হয়।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, দুই দিনের অপরাধ সম্মেলনের শেষ দিন ছিল গতকাল। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস অডিটরিয়ামে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হয়ে দুপুরে শেষ হয়। এ সময় বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত আইজিপি ড. মইনুর রহমান চৌধুরী, ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম, এসবির প্রধান মনিরুল ইসলাম, সিআইডির প্রধান ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান, অতিরিক্ত আইজিপি এস এম রুহুল আমিন, অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম, নৌ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. শফিকুল ইসলাম, সারদা পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল আবু হাসান মোহম্মদ তারিক, এপিবিএনের অতিরিক্ত আইজিপি ড. হাসান উল হায়দার, অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মো. হারুন অর রশিদ, অতিরিক্ত আইজিপি মো. শাহাবুদ্দীন খান।
সবার শেষে বক্তব্য রাখেন আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কোরবানির পশুবাহী যানবাহন থামানো বা তল্লাশি করা যাবে না। পশুর হাটে পোশাকে ও সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন করতে হবে। ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে হবে। মহাসড়কে করিমন, নসিমন, ভটভটি ইত্যাদি যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। দূরবর্তী স্থানে মোটরসাইকেল চলাচলের ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা প্রতিপালন করতে হবে।
আইজিপি বলেন, কোরবানির পশু পরিবহনে রাস্তাঘাটে কোথাও কোনো ধরনের চাঁদাবাজি সহ্য করা হবে না।
সম্মেলনের প্রথম দিন মঙ্গলবার অতিরিক্ত আইজিপি এম খুরশীদ হোসেন স্বাগত বক্তব্য রাখেন। পরে ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) এ ওয়াই এম বেলালুর রহমান এপ্রিল-জুন ২০২২ কোয়ার্টারের খুন, ডাকাতি, দস্যুতা, চুরি, ছিনতাইসহ সামগ্রিক অপরাধচিত্র তুলে ধরেন। পরে পুলিশ কর্মকর্তারা অপরাধের গতিপ্রকৃতি নিয়ে তাদের মতামত ব্যক্ত করেন। সম্মেলনে জানানো হয়, চলতি বছরের এপ্রিল-জুনে জানুয়ারি-মার্চের তুলনায় ডাকাতি মামলা হ্রাস পেয়েছে। আবার চলতি বছরের এপ্রিল-জুনে খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা গত বছরের এ সময়ের তুলনায় কমেছে।
দ্বিতীয় দিনে পুলিশের সব ইউনিটের সঙ্গে সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর প্রেজেন্টেশন দেন টেলিকম অ্যান্ড ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের ডিআইজি এ কে এম শহীদুর রহমান। ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজি মোহম্মদ আলী মিয়া ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যক্রমের ওপর একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ডিআইজি ও পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে জানান, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন প্রধানমন্ত্রীর জনসভার মঞ্চের সামনে এক তরুণীর চলে যাওয়া নিয়ে শরীয়তপুরের এসপির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। তাছাড়া সিলেট, বগুড়া, জয়পুরহাটসহ কয়েকটি জেলার এসপির কাছে কিছু অপরাধ নিয়ে কৈফিয়ত জানতে চাওয়া হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) বলেছেন, যেসব পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্য চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধ করে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ঘুষ, হয়রানি, বিয়ের পর স্ত্রীকে ভরণ-পোষণ না দেওয়া ও যৌতুকের জন্য নির্যাতন, মামলা দায়েরের পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়া, জমি-জমা সংক্রান্ত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ আসছে সবচেয়ে বেশি। ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক ‘আইজিপি কমপ্লেইন সেল’ চালু করার পর এসব অভিযোগ আসে।
-এটি