জামীল আহমাদ।।
বিদায়ের পথে ইবাদতের বসন্তকাল মাহে রমজান। শেষ সময়গুলো খুবই মূল্যবান। বেশি ইবাদতে মশগুল থেকে পুরো বছরের পুঁজি সংগ্রহ রাখা মুমিনের কাজ।
রমজানের শেষ দশকের গুরুত্বপূণ একটি আমল হলো ইতিকাফ। ইতেকাফ হল কোথাও অবস্থানের জন্য নিজেকে সংযুক্ত করে রাখা। ইতেকাফের মূল উদ্দেশ্য দুনিয়ার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে আল্লাহর দুয়ারে পড়ে থাকা।
পবিত্র কোরআনে সূরা বাকারার ১২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন-‘আমি ইবরাহিম ও ইসমাঈলকে আদেশ দিয়েছিলাম যেন তারা আমার ঘরকে (কাবা) তাওয়াফকারীদের জন্য, ইতিকাফকারীদের জন্য ও (সর্বোপরি তার নামে) রুকু-সিজদাহকারীদের জন্য পবিত্র রাখে।
ইবনুল কাইয়্যুম রহ. বলেন, ইতিকাফের প্রাণ হল আত্মাকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত করে নেয়া। আগেকার দিনে প্রতিটি বড় মসজিদে চিল্লা কোঠা (সংযুক্ত ঘর) থাকত। বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত মসজিদগুলোয় তেমন ব্যবস্থা নেই। ইতেকাফের প্রয়োজনে রমজানে পর্দার আড়াল করা হয় মাত্র।
মসজিদে জামায়াতের সঙ্গে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়, এমন মসজিদে আল্লাহর ইবাদতের নিয়তে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলা হয়। প্রতিবছর রমজান মাসের শেষ দশকে নবীজি (সা.) নিয়মিতভাবে মসজিদে ইতিকাফ করতেন।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রমজানের শেষ দশক (মসজিদে) ইতিকাফ করতেন। নবীজি ইতিকাফের এত বেশি গুরুত্ব দিতেন যে, কখনো তা ছুটে গেলে ঈদের মাসে আদায় করতেন।
জাগতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগের জন্য পুরুষদের মসজিদে এবং নারীদের জন্য গৃহে অবস্থ্থান করাই ইতিকাফ।
ইতিকাফের শর্ত: মুসলমান হওয়া, পাগল না হওয়া, বালেগ হওয়া, নিয়ত করা, ফরজ গোসলসহ হায়েজ নেফাছ থেকে পবিত্র হওয়া, রোজা রাখা। মসজিদে ইতিকাফ করা। ইমাম আবু হানিফার মতে যে মসজিদে জামাত সহকারে নামাজ হয় না, সে মসজিদে ইতিকাফ বৈধ নয়।
প্রত্যেক ইতিকাফকারী রোজাদারের আল্লাহর ইবাদত, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, নামাজ-রোজা, জিকির-আজকার, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া-দরুদ, মোরাকাবা-মোশাহেদা ও তওবা-ইস্তেগফারে ব্যস্ত থাকা আবশ্যক। ইতেকাফ কয়েক প্রকার রয়েছে।
নফল ইতিকাফ: সুন্নত ও ওয়াজিব ইতিকাফ ছাড়া বাকি সব ইতিকাফ নফল। এই নফল ইতিকাফ যে কোনো সময় করা। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। অর্থাৎ কিছু সময়ের জন্য ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করাযতক্ষণ চায় করতে পারে। এমনকি যখনই মসজিদে প্রবেশ করবে নফল ইতিকাফের নিয়ত করা সুন্নত। রোজারও প্রয়োজন নেই।
উত্তম ইতিকাফ: ইতিকাফের সর্বোত্তম স্থান মসজিদুল হারাম, এরপর মসজিদে নববী, এরপর মসজিদে আকসা। এরপর জুম‘আ মসজিদ। যাদের সামর্থ্য আছে তারা যেনো মসজিদে হারামে ইতিকাফ আদায় করে। এটি সওয়াব ও জামাতের দিক থেকে সর্বোত্তম।
ওয়াজিব ইতিকাফ: আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা যেন তাদের মানৎ পূর্ণ করে।’ (সুরা হজ: ২৯) মান্নতের ইতিকাফ পূর্ণ করা ওয়াজিব। তাতে কোনো শর্ত থাকুক বা না থাকুক। যেমন- কেউ যদি বলে- ‘আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইতিকাফ করব, এ অবস্থাতেও ইতিকাফ করা ওয়াজিব বলে সাব্যস্ত হবে।
সুন্নত ইতিকাফ: রমজানের ২১ তারিখের রাত থেকে ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা পর্যন্ত সুন্নত ইতিকাফের সময়। কারণ রাসুল (সা.) প্রত্যেক বছর এই দিনগুলোতেই ইতিকাফ করতেন।
এ কারণে এটাকে সুন্নত ইতিকাফ বলা হয়। রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের ইতিকাফ সুন্নতে মোয়াক্কাদা আলাল কেফায়া। অর্থাৎ মহল্লার যে কোনো একজন ইতিকাফ করলে পুরো মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে ইতিকাফ আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু মহল্লার একজন ব্যক্তিও যদি ইতিকাফ না করে তবে মহল্লার সবার সুন্নত পরিত্যাগের গুনাহগার হবে। আল্লাহ তাআলা সবাইকে আমল করা তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: মুহাদ্দিস ও গবেষক
-এটি