আবুল কাশেম অফিক
বালাগঞ্জ প্রতিনিধি>
শখের বসে প্রায় ৬ বছর আগে বাড়ির পাশে নিজের ফসলি কয়েক শতক জমিতে টমেটো সহ কিছু শীতকালীন সবজির চাষ শুরু করেন মাওলানা মুশাহিদ শিকদার। ওই বছর বিভিন্ন কারণে তেমন ভালো ফলন না হওয়ায় কিছুটা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন তবে হাল ছাড়েনি। এরপর থেকে ধারাবাহিক ভাবে সল্পপরিসরে টমেটোসহ বিভিন্ন জাতের সবজির চাষ করেন। এতে নিজের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের চাহিদা মিটিয়ে আশপাশের অসহায় অনেক পরিবারকেও দেয়ার চেষ্টা করছেন। গত দুই বছর থেকে বাণিজ্যিক ভাবে টমেটোসহ বিভিন্ন জাতের শাক-সবজি চাষ করে আসছেন।
চলিত বছর মালকিন পেপার (বিশেষ ধরনের পলিতিন) ব্যবহার করে প্রায় ৯০ শতাংশ জমিতে টমেটোসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করেছেন। এভাবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যাবহার করে টমেটো চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম গৌরীপুর ইউনিয়নের আজিজপুর গ্রামের মৃত জানু মিয়া শিকদারের ছেলে তরুণ আলেম মাওলানা মুশাহিদ শিকদার।
মুশাহিদ শিকদার সিলেটের ঐতিহ্যবাহী জামেয়া ইসলামীয়া কাজির বাজারে দাওরায়ে হাদিস (টাইটেল) পাশ করে সিলেট শহরতলীর বড়ই কান্দি দাখিল মাদরাসা থেকে দাখিল ও সিলেট সরকারি আলীয়া মাদরাসা থেকে আলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পাড়ি জমান তুরষ্কের ইস্তাম্বুলে। সেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউনিভার্সিটি থেকে হস্পিটাল ম্যানেজমেন্ট এর উপড় দুই বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করে দেশে আসেন। কিন্তু চাকুরী না পেয়ে বেকার না থেকে পাথর ব্যাবসা শুরু করেন। এই ব্যবসার পাশাপাশি অন্য কিছু খোঁজতে থাকেন। এর বছর খানেক পর এক আত্মীয়ের পরামর্শে সবজি চাষে জড়িয়ে আশাতীত সফলতা অর্জন করেন।
চলিত মৌসুমে তিনি তার শিকদার এগ্যারো খামারে অন্যান্য সবজির পাশাপাশি প্রায় ৯০ শতক জমিতে হাইব্রিড জাতের টমেটো লাগিয়েছেন, ফলনও হয়েছে বেশ ভালো। এতে তার খরচ হয় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। ইতিমধ্যে তিনি লক্ষাধিক টাকার টমেটো বিক্রি করেছেন। সব খরচ বাদে আনুমানিক ৫ থেকে লক্ষ টাকার মুনাফা আসবে বলে আশা করছেন।
ফার্মে কাজের ফাঁকে কথা হয় মুশাহিদ শিকদারের সাথে। সিলেট অঞ্চলে প্রবাসে যাওয়ার একটা হিড়িক আছে, আপনিতো তুরষ্কে ছিলেন, চাইলেও সেখানেই থেকে যেতেন বা অন্য কোন দেশে যেতে পারতেন?
তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত বেকার যুবক ভাইরেরা ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা খরচ করে প্রবাসে (মধ্যপ্রাচ্যে) যায় আমি বলবো আমার কাছ থেকে এসে ভিসা নিতে! অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের বহু শিক্ষিত- অল্পশিক্ষিত তরুণ মধ্যপ্রাচ্যের দেশে যান। এসব দেশে যেতে প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার মতো লাগে। যাওয়ার সময় তাদের প্রত্যাশা থাকে মাসে ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা বেতন। কিন্তু বাস্তবে সেখানে তারা পান ২৫-২৬ হাজার টাকার মতো। অনেক সময় তাদের থাকা–খাওয়াও মেলে না, ভীষণ কষ্টে দিন কাটে।
আমরা সবাই জানি, তরুণেরা তাঁদের নিজের বাবার জমি, দোকান বিক্রি,আত্মীয়স্বজন বা গ্রামের মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়ে অথবা টাকা ধারদেনা করে, অনেক সময় জীবনের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে বা বন্ধক রেখে বিদেশে যান। আর বিদেশ যান একটি স্বপ্ন নিয়ে, একটু সুখের আশায়। যখন ওখানে গিয়ে কোনো ভালো চাকরি বা কর্মসংস্থান হয় না, হলেও তা পর্যাপ্ত না, কীভাবে তাঁরা পরিবারের কাছে টাকা পাঠাবেন। সেই সঙ্গে আছে মহাজনের চড়া সুদের মাসিক কিস্তি। যা তাদের মস্তিকের ওপর বিশাল চাপ তৈরি করে। এরপর আছে আরও অনেক সমস্যা। এতো কিছুর পরেও পরিবারের প্রিয়জনদের পাশে না পাওয়ার নিদারুণ কষ্ট। একটু জেনেশুনে ওই টাকার অর্ধেক টাকা যদি পরিকল্পনা করে আমরা দেশেই চাষকাজে ব্যয় করতে পারি তাহলে প্রতি মাসে প্রায় লক্ষাধিক টাকার মতো ইনকাম আসবে ইনশাআল্লাহ। আসলে আমার দীর্ঘদিনের অবিজ্ঞতার আলোকেই বলার চেষ্টা করেছি। এছাড়াও তিনি সবজির পাশাপাশি মাছের খামার, লেবু বাগান সহ বৃহৎ আকারে গ্রীন হাউজ প্রকল্পের কাজ শুরু করেছেন।
সিলেটের যুবকদের প্রতি মুশাহিদ শিকদার অনুরোধ করে পরামর্শ দিয়েছেন, যে টাকা ব্যয় করে প্রবাসে যাওয়ার চিন্তা করছেন, সে টাকায় নিজের এলাকায় এ জাতীয় কিছু করার চিন্তা করুন অবশ্যই অল্প কয়েক মাস নিয়মিত পরিশ্রম করেলে ইনশাআল্লাহ সফল হবেন এবং নিজেদের পরিবার পরিজনকে নিয়ে সুখে শান্তিতে থাকতে পারেবেন।
মুশাহিদ শিকার একজন সফল ব্যবসায়ীর পাশাপাশি তরুণ সমাজ কর্মী, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিভাবক, শিক্ষকও বটে। তিনি ওসমানী নগর উপজেলার মুমিনপুর মহিলা মাদরাসার নায়েবে মুহতামিমের দায়িত্বও পালন করছেন। এছাড়াও আগামী স্থানীয় নির্বাচনে পশ্চিম গৌরীপুর ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যান প্রার্থীতার জন্য এলাকার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন।
-এএ