সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬ ।। ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ২২ জিলহজ ১৪৪৭

শিরোনাম :
বেতন ছাড়ের দাবিতে আমরণ অনশনে ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকরা আল্লামা গহরপুরীকে নিয়ে এমপি এম এ মালেকের কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের নিন্দা সড়ক প্রশস্তকরণে ভারতে মসজিদ ভাঙন, ব্যাপক পুলিশি নিরাপত্তা ‘যুবশক্তিকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে কাজ করছে ১১০ প্রতিষ্ঠান’  কবর খুঁড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে নিহত ২, আহত ৬ হজের সফর শেষে স্বাস্থ্য সচেতনতায় করণীয় এক দিনে হাম ও উপসর্গে ৮ শিশুর মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্র-মধ্যপ্রাচ্যসহ ইইউভুক্ত দেশগুলোতে খাদ্যপণ্য রফতানি হচ্ছে: বাণিজ্যমন্ত্রী যারা হিন্দু-মুসলিমদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করছে, তারা চরমভাবে ব্যর্থ হবে: ইন্দ্রেশ কুমার ২০২৭ সালের হজের রোডম্যাপ প্রকাশ

শোকে কাতর ২০২০: যে আলেমদের হারালাম আমরা! (দ্বিতীয় পর্ব)

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

২০২০ সালে যারা আমাদের ছেড়ে প্রভূর সান্নিধ্যে পাড়ি জমিয়েছেন তাদের সংক্ষিপ্ত জীবনীসহ ধারাবাহিক তালিকা উল্লেখ করবো আমরা। মোট ৩২ জন আলেমের জীবনী তিনটি পর্বে উল্লেখ করা হবে ইনশাআল্লাহ। ধারাবাহিক তিন পর্বের গতকাল ছিলো প্রথম পর্ব। আজ থাকছে দ্বিতীয় পর্ব। এ তালিকার সিরিয়াল জৈষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়। বছরের শেষ দিক (ডিসেম্বর-জানুয়ারি ২০২০) থেকে হিসেব করে সাজানো হয়েছে নিম্মের আয়োজন-মোস্তফা ওয়াদুদ, নিউজরুম এডিটর।।


২০২০। আমুল হুজুন। শোকের বছর। বাংলার শীর্ষ আলেমদের হারানোর বছর। দেশের জনগণের শোকে কাতরের বছর। এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ আলেম হারানোর বেদনায় মর্মাহত। কোটি জনতার হৃদয়ের মানুষগুলো বিদায় নিয়েছে এ বছর।

যারা মানুষকে ডাকতো হকের পথে। শোনাতো কুরআনের বাণী। পৌঁছাতো রাসূলের কথা। যাদের হৃদয়গ্রাহী আলোচনা শুনে দীনের পথ লাভ করতো এদেশের কোটি কোটি মানুষ। হেদায়াতের আলোয় আলোকিত হতো মানুষের চিত্ত-মন-হৃদয় ও অন্তর। কিন্তু এখন থেকে তারা আর কোনোদিন মানুষকে নামাজের জন্য ডাকবেন না। শোনাবেন না হেদায়াতের বাণী। তাদের দরদমাখা নসিহত আর আমাদের কর্ণকুহরে বেজে উঠবে না।

এ বছর দেশের যত আলেমরা বিদায় নিয়েছেন। বাংলাদেশ জন্মের পর এক বছরে এতো আলেম কখনোই বিদায় নেয়নি। বছরের প্রথম থেকেই শুরু হয় আলেমদের মৃত্যু মিছিল। কিন্তু শেষ অবধি এ মিছিলের সারি এতো লম্বা হবে! তা হয়তো বছর শুরুর প্রারম্ভে কেউই ভাবেনি। আমরা হিসেব করে দেখেছি সারাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রায় ৩২ জন বিখ্যাত আলেমেদীন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। পাড়ি দিয়েছেন আসল বাড়িতে। ‘মাউতুল আলিম মউতুল আলম’-একজন আলেমের মৃত্যু মানে একটি পৃথিবীর মৃত্যু। ২০২০ সালের ক্যালেন্ডারের লাল দাগ দেয়া তারিখগুলো আমাদেরকে আরবি বহুল শ্রুত এই প্রবাদ কথাটিই মনে করিয়ে দেয়।

১১. তোফাজ্জল হোসেন ভৈরবী রহ.
জনপ্রিয় বক্তা হাফেজ মাওলানা তোফাজ্জল হোসেন ভৈরবী ১১ জুন বিকাল সাড়ে ৩টায় ইন্তেকাল করেন। তিনি দীর্ঘদিন ভৈরব বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১২. মাওলানা আবদুল কুদ্দুস রহ.

১৩ জুন ইন্তেকাল করেছেন ঐতিহ্যবাহী টুমচর সিনিয়র মাদ্রাসার সাবেক উপাধ্যক্ষ ও লক্ষ্মীপুর চক বাজার জামে মসজিদের সাবেক খতিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুস রহ.। বাধ্যকজনিত কারণে সদর উপজেলার টুমচর গ্রামে তিনি তার নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। তিনি বিখ্যাত ওয়ায়েজ মাওলানা মুশতাকুন নবীর বাবা।

তিনি ১০ পুত্র, ৩ কন্যা ও নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, আত্মীয়স্বজন রেখে গেছেন। ঐতিহ্যবাহী টুমচর সিনিয়র মাদ্রাসা মাঠে মরহুমের জানাজার নামাজ শেষে লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

১৩. মাওলানা কেফায়েত উল্লাহ নূর রহ.

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুফতি নূরুল্লাহ রহ.-এর বড় ছেলে মাওলানা কেফায়েত উল্লাহ নূর ১০ জুন, বুধবার রাত ১০টা ৩০ মিনিটে ব্রাহ্মণবাড়িয়াস্থ ল্যাব এইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মাওলানা কেফায়েত উল্লাহ নূর নরসিংদী রায়পুরা পান্থশালা মাদরাসার মুহতামিম ছিলেন। নরসিংদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকায় অনেক দ্বীনি খেদমতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। তিনি সুবক্তা হিসেবে বেশ প্রসিদ্ধ।

১৪. মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ বাশার রহ.

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ বাশার ৮ জুন রাত ১১টায় স্ট্রোক করে মিরপুরস্থ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬২ বছর। তিনি স্ত্রী, ২ পুত্র ও ২ কন্যা রেখে গেছেন। মঙ্গলবার বাদ জোহর মরহুমের জন্মস্থান পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর থানার বড়ইঘনিয়া গ্রামে জানাজার নামাজ শেষে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

১৫. মাওলানা আনওয়ারুল হক চৌধুরী রহ.

বৃহত্তর সিলেটের সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রবীণ আলেম, বালাগঞ্জের হজরত শাহ সুলতান রহ. মাদরাসা এবং মহিলা মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা আনওয়ারুল হক চৌধুরী ১ জুন, সোমবার ভোর ৪টা ৫০মিনিটে সুলতানপুরস্থ নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। ওইদিনই দুপুরে সুলতানপুর মাদরাসা প্রাঙ্গণে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মাওলানা আনোয়ারুল হক চৌধুরী সিলেটে নারী শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। প্রচারবিমুখ, সুন্নতের অনুসারী প্রথিতযশা এই প্রবীণ আলেম আমৃত্যু ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে আপামর জনতার মাঝে দ্বীনের প্রচার-প্রসারে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন।

১৬. আল্লামা শাহ্ মুহাম্মদ ইদ্রিস রহ.

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার জামিয়া আরাবিয়া নাছিরুল উলুম নাজিরহাট বড় মাদরাসার মোহতামিম ও শাইখুল হাদিস আল্লামা শাহ মুহাম্মদ ইদ্রিস ২৭ মে, বুধবার দিবাগত রাত ১২টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। ৭৯ বছল বয়সী এই আলেম বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। বৃহস্পতিবার ফজরের নামাজের পর মাদরাসার মাঠে আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর ইমামতিতে মরহুমের জানাজার নামাজ সম্পন্ন হয়। জানাজা শেষে মাদরাসা সংলগ্ন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। ২০০৪ সালে আল্লামা শাহ শামসুদ্দিনের রহ.-এর ইন্তেকালের পর থেকে নাজিরহাট মাদরাসার মোহতামিমের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন আল্লামা শাহ্ মুহাম্মদ ইদ্রিস।

১৭. মুফতি ওবায়দুল মাতিন রহ.

ঠাকুরগাঁও গোয়ালপাড়া জামেয়া ইসলামিয়া ইবরাহিমীয়া দারুস সালাম কওমি মাদরাসার মুহতামিম ও শাইখুল হাদিস মাওলানা মুফতি ওবায়দুল মাতিন ৫২ বছর বয়সে ১২ মে ইন্তেকাল করলেন। এর আগে তিনি বাংলাহিলি আজিজিয়া মাদরাসায় প্রধান মুফতির দায়িত্ব পালন করেছেন। দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে তিনি দাওরায়ে হাদিস এবং ইফতা সম্পন্ন করেন। খুলনার খালিশপুরের একটি মাদরাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে ২ বসর দায়িত্ব পালন শেষে বাংলাহিলি আজিজিয়া আনোয়ারুল উলুম মাদরাসা, হাকিমপুর, দিনাজপুরে যোগ দেন। সেখানে তিনি মুহাদ্দিস ও মুফতি হিসেবে ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। এর পর যোগ দেন ঠাকুরগাঁও, গোয়ালপাড়া দারুসসালাম মাদরাসায়। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সেখানে কর্মরত ছিলেন।

১৮. আল্লামা শাহ মুহাম্মদ তৈয়ব রহ.

তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ৩য় বৃহত্তম কওমি মাদ্রাসা আল জামিয়াতুল আরবিয়াতুল ইসলামিয়া জিরির মুহতামিম ও কওমি মাদ্রাসার সর্ববৃহৎ শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহ-সভাপতি।

তিনি ১৯৪৩ সালে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার অন্তর্গত জিরি ইউনিয়নের এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মাওলানা আব্দুল জাব্বার দারুল উলুম হাটহাজারীর শিক্ষক ছিলেন। সাত বছর বয়সে তার পিতা মারা যান। পিতার মৃত্যুর পর চাচা শাহ আহমদ হাসান তার লালন পালন করেন। তার মায়ের নাম সালমা খাতুন।

২০২০ সালের রমজানে তিনি মসজিদে ইতেকাফ নিয়েছিলেন। ইতেকাফ শেষে অসুস্থতা বোধ করলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৪ মে দিবাগত রাতে হাসপাতালে সেজদারত অবস্থায় তিনি মৃৃৃৃত্যুবরণ করেন। পরদিন জুনায়েদ বাবুনগরীর ইমামতিতে জামিয়া জিরির মাঠে তার জানাযা সম্পন্ন হয়। তাকে মাকবারায়ে আহমদ হাসানে দাফন করা হয়।

১৯. মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামি রহ.

১ মার্চ, ১৯৩৬। নরসিংদী জেলার শিবপুর থানার অন্তর্গত পূর্ব সৈয়দ নগরে জন্মগ্রহণ করেন মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামি। বাবার নাম মো. সিদ্দিকুর রহমান এবং মাতার নাম মোসা. জোবেদা খাতুন।

মাওলানা নেজামি প্রথমে ইসলামী ঐক্যজোটের যুগ্ম মহাসচিব এবং পরবর্তীতে শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. যখন ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে অমায়িক সুন্দর চরিত্রের জন্য সর্বজনগ্রাহ্য হিসেবে তিনিও মহাসচিব নির্বাচিত হন। ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বরে মুজাহিদে মিল্লাত মুফতি আমিনি রহ. ইন্তেকালের পর ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ও নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি হিসেবে আমৃত্যু এ পদে দায়িত্ব পালন করেন।

বর্ণাঢ্য জীবনের শেষে ১৭ রমজান, ১১ মে, ২০২০ ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে ৬ টা ৩৫ মিনিটে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী, নেতা, কর্মী, ভক্তদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে মহান রাব্বুল আলামীনের ডাকে সাড়া দেন।

২০. আল্লামা আবদুল আলীম আল-হুসাইনী রহ.

১৮ মার্চ রাত ইন্তেকাল করেন নারায়ণগঞ্জ ঐতিহ্যবাহী হাজীপাড়া মাদরাসার শাইখুল হাদীস ও বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দীন আল্লামা আবদুল আলীম আল-হুসাইনী। তিনি তিনি ভারত উপমহাদেশের বিখ্যাত আলেম, ইংরেজ খেদাও আন্দোলনের অন্যতম সিপাহসালার, শাইখুল আরব ওয়াল আজম, সাইয়িদ হুসাইন আহমাদ মাদানী র. -এর দীর্ঘ আট বছর সান্নিধ্য পাওয়া একজন সুযোগ্য শাগরিদ ও হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা আহমাদ শফী দা.বা. -এর সহপাঠী ছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো প্রায় ১০৪ বছর।

দীর্ঘ ত্রিশ বছর যাবত দেশের বিভিন্ন মাদরাসায় বুখারী শরীফের দরস দিয়ে আসছিলেন। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ মারকাযুল উলূম আল ইসলামিয়া হাজীপাড়া মাদরাসায় তের বছর যাবত শাইখুল হাদীস হিসেবে বুখারী শরীফের দরস দিচ্ছিলেন। এদিন রাত আনুমানিক ১১ টার দিকে তিনি নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন।

এমডব্লিউ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ