আওয়ার ইসলাম: যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী শামিমা নূর পাপিয়ার আয়-ব্যয়, অভিজাত হোটেলে বিপুল পরিমাণ টাকার বিল পরিশোধসহ তার অবৈধ আয়ের উৎসের সন্ধানে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
তার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের করা মামলাটির ফাইল এত দিন র্যাবের হাতে থাকলেও এখন তা সিআইডির হাতে এসেছে। সিআইডিও মামলাটির প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে।
সিআইডির সূত্র জানায়, পাপিয়ার মানিলন্ডারিংয়ের ফাইলে তার আয়-ব্যয়, অভিজাত হোটেলে বিপুল পরিমাণ টাকা পরিশোধ, গাড়ি, বাড়ি ও ফ্লাটের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়াও ঢাকার ফার্মগেটে থাকা দু’টি ফ্লাটের কথাও রয়েছে। এসব নিয়ে র্যাব পাপিয়া ও তার স্বামী সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। কিন্তু তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।
সুমন র্যাবকে জানিয়েছে, তিনি ওই ফ্লাটে ভাড়ায় থাকেন। তার পক্ষেও কোনো তথ্য দিতে পারেনি সুমন। এ দিকে সুমন ও পাপিয়া দম্পতির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসতে শুরু করেছে।
সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম টিমের এক সদস্য জানান, র্যাব সম্প্রতি তাদেরকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে পাপিয়ার নাম ও ঠিকানা উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মানিলন্ডারিংয়ের মামলা তদন্ত করার জন্য বলেছে। তারা প্রাথমিক কাজও শুরু করেছেন। শিগগির সব কিছু বেরিয়ে আসবে বলে তারা প্রত্যাশা করছেন।
জেলার একজন রাজনৈতিক নেতা হয়ে রাজধানীতে বিলাসী জীবনযাপনের রহস্য উদঘাটনে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দারা। তারা তার আত্মীয়স্বজন, জমিজমা, বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ির খোঁজখবর নিচ্ছেন। তার সাথে কার কার সখ্যতা ও কারা কারা তার পার্টিতে যেতেন তাও খোঁজ নেয়া হচ্ছে। পাপিয়াকে আটকের পর থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। মুখ খুলতে শুরু করেছে এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা।
পাপিয়া নরসিংদী যুব মহিলা লীগের পদ বাগিয়ে নিয়ে নানা অপকর্ম করতেন। মাদক, নারীদের দিয়ে দেহব্যবসাসহ তার বিরুদ্ধে বিদেশে টাকা পাচারের অভিযোগ এনেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব ব্যবসা করে পাপিয়া টাকার পাহাড় গড়েন। যার প্রমাণও পেয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, পাপিয়া কয়েক বছরও আগেও সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। তারা কাপড়-চোপড় অতি সাধারণ ছিল। কয়েক বছর থেকে তিনি উচ্চাভিলাষী জীবনযাপন করছেন। রাজধানীর ফার্মগেটে তার একটি ফ্লাটের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও নরসিংদী শহরে নামে-বেনামে তিনি অনেক জমি কিনেছেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্নজনকে চাকরি দেয়ার নাম করে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাপিয়ার অঢেল টাকার উৎস খোঁজা হচ্ছে। যদিও ইতোমধ্যে তার অবৈধভাবে টাকা আয়ের তথ্য তারা জেনেছেন। এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে অন্যের জমি দখল, নারীদের দেহব্যবসায় বাধ্য করার পর গোপনে ভিডিও ধারণ, পরে জিম্মি করে টাকা আদায়সহ নানা অভিযোগ রয়েছে।
নরসিংদীর বিভিন্ন কলেজপড়ুয়া ছাত্রীদের দিয়ে তিনি গুলশানে হোটেল ভাড়া নিয়ে দেহব্যবসা চালাতেন। তাদের প্রত্যেকে মাসিক ভিত্তিতে বেতনও দিতেন। অভিজাত হোটেলে রুম ভাড়া নেয়া, অতি উচ্চাভিলাষী জীবনযাপন, অল্প দিনে ধনী হওয়া, নতুন বাড়ি করা, জমি কেনা এসব বিষয় গোয়েন্দাদের নজরে আসার পর থেকে তদন্ত শুরু হয়। গত তিন মাস থেকে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে।
র্যাব জানিয়েছে, গত তিন মাসে পাপিয়া গুলশানের একটি অভিজাত হোটেল ভাড়া পরিশোধ করেছেন প্রায় ৯০ লাখ টাকা। তার নামে অভিজাত হোটেলের রুম বরাদ্দ থাকত। তিনি মদ, ইয়াবা ও নারীদের নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিদের মনোরঞ্জন করাতেন।
সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম টিমের একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, র্যাব থেকে পাপিয়ার মানি লন্ডারিংয়ের ফাইল তাদের কাছে এসেছে। তারা প্রাথমিকভাবে কাজ শুরুও করেছেন।
এদিকে বিদেশে অর্থ পাচারসহ কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে শামিমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সম্প্রতি দুদকের কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক শাহীন আরা মমতাজকে অনুসন্ধান কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দুদক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এর আগে এ বিষয়ে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত জানান, পাপিয়ার সম্পদ, তার উৎস, মতা, বিদেশে অর্থপাচার সব কিছুই অনুসন্ধানের আওতায় আছে। পাপিয়ার আশেপাশে যারা ছিল তাদের দিকেও গোয়েন্দা নজর রাখা হচ্ছে। তার সহযোগীরাও আইনের আওতায় আসবে।
সূত্র জানায়, যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী শামিমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, জাল টাকার ব্যবসা ও বিভিন্ন অনৈতিক কার্যকলাপের মাধ্যমে কোটি টাকার সম্পদ পাচার এবং কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের এ অনুসন্ধান।
-এএ