মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ ।। ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ২৯ মহর্‌রম ১৪৪৮

শিরোনাম :
হজ ব্যবস্থাপনা ও হজ প্যাকেজ নিয়ে কিছু কথা ভুল সংশোধনের সুযোগ পাচ্ছেন নতুন ভোটাররা ব্যক্তিগত মন্তব্যের জন্য সংসদে দুঃখ প্রকাশ করলেন শিক্ষামন্ত্রী গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মৃত্যু ১, হাসপাতালে ৩২৯ মহানগর দক্ষিণের কাউন্সিল সফল করতে রামপুরা নেতাদের সঙ্গে জমিয়তের মতবিনিময় ‎হানাফি উসুল অমূল্য রত্ন ও ফকিহ সাহাবায়ে কেরামের উত্তরাধিকার কওমি মাদরাসায় কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ বিষয়ে যা বললেন শিক্ষামন্ত্রী এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান প্রশ্নে ত্রুটি: চার শিক্ষককে শোকজ বন্যা দুর্গতদের মাঝে ইসলামী আন্দোলনের ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত বিকেএম কেন্দুয়া উপজেলা শাখার ৪১ সদস্যের নতুন কমিটি গঠন

‘তোয়ারা বাঙালি, হে দেশে ছলি যা’

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

সাইফুল ইসলাম রিয়াদ
সহসম্পাদক, আওয়ার ইসলাম

দুপুর বারোটা। সূর্য ঠিক মাথার উপর। সাথে মুষলধারায় বৃষ্টি । কাপড়- চোপড় ভিজে শরীরে ল্যাপ্টে আছে। ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ লাগছিল। তবু ছুটছি মানবতার দরদে। রক্তের টানে। ধর্মের টানে।

উখিয়ার কুতুপালং বাজারে নেমে হাঁটতে শুরু করলাম ডি ব্লকের দিকে। এটা স্থানীয়দের রাখা নাম। ব্লকগুলো এ থেকে জেড পর্যন্ত। এটা বালুখালীর বিভিন্ন লোকেশন স্পট।

কাদায় স্যাঁতসেঁতে পথ মাড়িয়ে চলছি আমরা চারজন। দু'জন বাঙালি আর দু'জন আরাকানি। সেখানে যেতে অনেকটা বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়।

ভয় আর শংকায় পেরিয়েছি খানিকটা পথ। এ পথে 'ছবি তোলা নিষিদ্ধ।' এখানে পুরনোদের আবাস। নতুনরা ঢুকছে আত্মীয়তার খাতিরে। নয়তো বা এখানে নতুনদের জায়গা নেই। একেবারেই ঘন বসতি। হাঁটার জন্য চার ফুট রাস্তা ছাড়া আর কোনো পথ বাকি নেই। সাড়ে তিন মাইল পথ বেয়ে পৌঁছলাম ডি ব্লকে। এখানে স্থানীয় বাসিন্দা নেই। সবাই রোহিঙ্গা শরণার্থী।

আমরা এসে পৌঁছলাম পাহাড়ের শেষ সীমায়। এখানে এসে সাক্ষাৎ হল এক রোহিঙ্গা আলেমের সাথে। তিনি এসেছেন চারদিন হল। চেহারায় আতংক বিরাজ করলেও আমাদের জন্য হাসিটা সৌজন্য উপহার দিতে ভুল করেন নি। তেরপালে বাঁধা ঘরটা শক্তপোক্ত মনে হলেও জবুথবু হয়ে পড়ে আছে। এর বাম পাশটা মাটিতে আছড়ে পড়েছে।

সালাম মোসাফাহা করতেই প্লাস্টিকের চেয়ার এগিয়ে দিলেন আমাদের দিকে। বসলাম। গল্পে গল্পে জানতে চাইলাম- ফেলে আসা অতীতটা কেমন ছিল ওনার।

কষ্টের দিনগুলি এভাবে মন্থন করছিলেন- এই যে ঘরটা দেখছেন এখানে আমার মা-বাবা রয়েছেন। ওনারা এসেছেন ছ'মাস আগে। সাথে আমার বউ-বাচ্চারাও এসেছে। কিন্তু আমি আসিনি।

ছিকংছড়ি, ফকিরাবাজার জামে মসজিদে ইমামতি করতাম। আকিয়াব জেলার অই এলাকা কিছুটা নিরাপদ ছিল। আমাদের গ্রামে জ্বালাও পোড়াও চলছিল। তাই মা বাবাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। মুসল্লিদের মায়া এবং মসজিদ বিরান হবার ভয়ে পালাইনি। থেকেছি। এখানে সাবাহি মক্তবে শিশুদের কুরআন পড়াতাম। ভালো লাগত।

একদিন মিলিটারি বাহিনী মসজিদে এসে তল্লাশি শুরু করে। তখন আমি মসজিদের ইমাম কক্ষে বসা। ওদের আসা টের পেয়ে দরজা লাগিয়ে চুপসে থাকি। কিন্তু এতেও রেহাই পাইনি। আমাকে মসজিদের আঙিনায় টেনে নিয়ে বেধড়ক মারপিট করে। পেটানোর সময় বার বার বলছিল, ‘তোয়ারা বাঙালি, হে দেশে ছলি যা।’

প্রাণের ভয়ে আর থাকতে পারি নি আমার প্রিয় কর্মস্থলে। মসজিদ মাদরাসা ফেলে ছুটলাম এ দেশের গন্তব্যে। বাঁচার আশায়। পরিবারের মায়ায়। বৃদ্ধ বাবা-মা আর বউ-সন্তানের মুখটি দেখব বলে পাগলের মত ছুটে আসি এ দেশে। প্রায় তিনদিন লাগে আসতে। পাহাড়ের আড়ালে বনের গহিনে লুকিয়ে থেকে কাটিয়েছি দুর্বিষহ অই দিনগুলি। অবশেষে আমার এই ছোট ভায়ের (ভাইকে দেখিয়ে) চেষ্টায় মা বাবার কাছে ফিরে আসলাম।

আপনার আর কোন স্মৃতি আছে? জানতে চাইলাম।

আমার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া একটা স্মৃতি আছে, কখনো বিস্মৃত হব না। তিনি বললেন।

জানতে চাইলাম, কী সেটা?

তিনি এভাবেই বললেন, তবে পুরোটাই চাটগাঁইয়া ভাষায়- শেষ যেদিন বাংলাদেশের সীমানায় পৌঁছাব, সেদিন এক কঠিন মুহূর্তের সাক্ষাৎ পেলাম। বেয়ে বেয়ে এক পাহাড়ের চূড়ায় উঠলাম। দেখি ক'জন লোক গাছের ডাল ও পাতা কুড়াচ্ছে। বললাম কি করছেন আপনারা। গাছের আড়ালে রাখা একটি লাশ দেখিয়ে বলল- ঐ যে গলা কাটা লাশ দেখা যায়, উনি আমাদের বাবা। দাফন দেবার জায়গা নেই।

তারপর যেটা হল তা আরো বিমর্ষ-ব্যথাতুর। পাশ থেকে গুলির শব্দ শুনতে পেয়ে ভয় পেয়ে গেলাম আমরা। জান বাঁচানোই এখন দায়। পাতা ও ডাল দিয়ে লাশ ঢেকে নিলাম। জানাযা পড়ার সুযোগ পাইনি। কোনরকম 'আল্লাহু আকবার' বলেই পালালাম। এই দীর্ঘ পথ হেঁটে সোজা শাহপরীর দ্বীপে।

এতক্ষণে পাশের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি কানে এসে বাজল। যেতে হবে বলে আমরা উঠে দাঁড়ালাম।

রোহিঙ্গা যুবকরা কোথায়? এক আলেমের সাক্ষাৎকার


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ