বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ।। ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ ।। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪৮


রোজার জুমায় পুলিশি খুতবা না হলে কি চলত না?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

রোজা কত বরকত ও রহমতের, একজন মুসলমানের কাছে কত সৌভাগ্যের তা কজনই বা জানে। আরেকটা রমজান পাবে কিনা কেউ জোর দিয়ে বলতে পারে না। অথচ এবার মাহে রমজানের প্রথম জুমায় পুলিশের খুতবা শুনে ভীষণ মর্মাহত হয়েছি।

ঢাকায় থাকলে মোহাম্মদপুর কলেজ গেট মসজিদে নিয়মিত জুমার নামাজ আদায় করি। সেই স্বাধীনতার পর শুরু করেছি, বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর ১৬ বছর নির্বাসনে থাকায় যেতে পারিনি। আবার প্রায় ২৬-২৭ বছর হতে চলল একই মসজিদে নামাজ পড়ি। যিনি ইমামতি করেন বেশ জানাশোনা। স্বাধীনতার আগে থেকেই ছাত্র হিসেবে এখানেই ছিলেন। সাংবাদিক মোহাম্মদ মোদাব্বের, চিনু খাঁ এবং আমি মোহাম্মদপুর হানাদারদের ভাঙা মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল সব ধীরে ধীরে চলার উপযোগী করেছিলাম। তাই কলেজ গেট মসজিদের জন্য বেশ মায়া লাগে।

রমজানের প্রথম জুমায় আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার আশায় রোজা সম্পর্কে চমৎকার খুতবা শুনব তেমন আকুলতা নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি সাধারণত বারান্দায় নামাজ পড়ি। কবরে কোথায় এসি পাব, তাই ঘরে যাই না। সেদিনও বারান্দায়ই ছিলাম। অসংখ্য নামাজি তাদের বারান্দার সাথী হিসেবেই জানে। খুতবা শুনছিলাম ভালোই লাগছিল। হঠাৎ শুনি অন্য গলা। ভাবলাম রোজার প্রথম জুমা তাই কোনো বড়সড় আলেম এসেছেন। কয়েক মিনিট কিছুই বুঝলাম না। তারপর যখন শুনলাম মিরপুরে জঙ্গি দমন, দারুসসালামে হাইজ্যাকার ধরা, আরও কী কী, তখন বুঝলাম পুলিশের কেউ খুতবা দিচ্ছে। ক্ষোভে দেহমন নাড়া দিয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল তখনই বুরবক নির্বোধকে বের করে দিই। কিন্তু অনেক দূরে ছিলাম তাই পারিনি। পরে ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, রোজার পয়লা জুমায় পুলিশ দিয়ে খুতবা না দিলে হতো না? তিনি তাড়াহুড়া করে বললেন, ‘নামাজের সময় হয়ে গেছে। এ বিষয়ে পরে বলব। ’ পরে আর কী বলবেন। আগে ইমামতি করতেন সমাজের নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব যাদের তারা, এখন ইমামতি করেন বেতনভোগী কর্মচারীরা। তাই আগের ইমাম আর এখনকার ইমামের পার্থক্য লাখো-যোজন।

ইমামের কিছুই করার নেই। মসজিদ পরিচালনা পরিষদ হয়তো কিছু বলতে পারে। পুলিশের কাজ রাস্তাঘাটে, মসজিদে কেন? হ্যাঁ, মসজিদেও যদি কিছু করতে বা বলতে হয় সুন্দরভাবে অজু করে সময়মতো বলা দরকার। একজন মুসলমান রোজার জন্য, তারাবির জন্য, জুমার জন্য কত আকুল হয়ে থাকে। রোজার প্রথম জুমায় আল্লাহর দিদারের আশা না করে কোনো সরকারের দিদারের চেষ্টা কতখানি যুক্তিযুক্ত? জানি না, সারা দেশে সরকারি নির্দেশে অমনটা হয়েছে, না মোহাম্মদপুর পুলিশের অতিতত্পরতার ফল। তবে কাজটি প্রশংসিত হয়নি, বরং কাজটি খুুবই নিন্দনীয় হয়েছে। যা সরকার বা পুলিশ বাহিনীর করা উচিত নয়। আল্লাহর ঘর মসজিদ পুলিশের দখলে চলে গেলে আর থাকে কী? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারকে বিষয়টা গভীরভাবে ভেবে দেখতে বলছি।

১০ জুন আমার জন্য, কাদেরিয়া বাহিনীর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭১ সালের ১০ জুন সখীপুরের বহেরাতলীতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম শপথ করিয়েছিলাম। সব সময় আমার ভয় ছিল, আমি পারব তো! আমার মতো একজন নগণ্যের পথ ধরে মানুষ চলবে তো! কত নেতা-উপনেতা-পাতিনেতা কত বড় প্রতিশ্রুতি দিল, কত বক্তৃতা করল, কিন্তু যুদ্ধ শুরুর আগেই তারা আমাদের ফেলে পগারপার হয়ে গেল। হতাশা কাটতে বেশ সময় লেগেছিল। তারপর আল্লাহর নাম স্মরণ করে জয় বাংলার ধ্বনি তুলে আলী আলী বলে রাস্তায় নেমেছিলাম। সত্যিই বিশ্বস্ত ত্যাগী লোক পেতে খুব একটা সময় লাগেনি, কষ্ট হয়নি। অভিজ্ঞতা ছিল না, নিজের ওপর নিজেরই তেমন ভরসা ছিল না— এ রকম অবস্থায় ৩ এপ্রিল সাটিয়াচরা নাটিয়াপাড়া প্রতিরোধযুদ্ধে হেরে গিয়ে চর-বন-পাহাড় সীমান্ত কোথায় যাইনি। আবার গুটিকয় ইপিআর নিয়ে বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী এসেছিলেন। কালিহাতী একটা যুদ্ধ হয়েছিল। তবে সে যুদ্ধ তেমন জুতসই হয়নি। বরং হতাশাই বেড়েছিল বেশি। কাজের কাজ তেমন হয়নি। অনেক হানাদার মারা গিয়েছিল, আমাদেরও বেশ ক্ষতি হয়েছিল। দিশাহারা হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সবার সঙ্গে পালিয়েছিলাম।

কোথাও কোনো আলো ছিল না। যেদিকে তাকিয়েছি নিকষ অন্ধকার। হতাশা আর হতাশা। প্রাণ বাঁচাতে ছুটে চলা মানুষ দেখে পাগলপ্রায় অবস্থা। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। ঠিক এখনকার মতো একেবারে দিশাহারা। ওর মধ্যেই সিলেটের ছোট্ট ফারুককে নিয়ে রাত-দিন ছুটেছি। মানুষের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করেছি। সব জায়গায় উৎসাহ পেয়ে সাহসী হয়েছি। চরম ভয়াবহ হতাশার মধ্যে সহপাঠী কামার্তির সাইদুরকে চিঠি দিয়েছিলাম, কয়েকজন সবল স্বাস্থ্যের কর্মী নিয়ে মরিচাতে একত্র হতে। অন্যদিকে কস্তূরীপাড়ার মনিরুল ইসলাম এসেছিল গুপ্তধনের সন্ধান নিয়ে। সেটা ছিল ৪ মে। অনেক কষ্টে গলাসম পানি ঠেলে গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছিলাম। সেখানে ছিল একটা এলএমজি, ১৬-১৭টা গ্রেনেড, ৪টা রাইফেল, কয়েক হাজার গুলি। মরিচা যাওয়ার পথে কস্তূরীপাড়ায় পেয়েছিলাম এক অসম সাহসী যোদ্ধা ছোট্ট শামসুকে। মুক্তিযুদ্ধে কতজন কতভাবে আমার থেকে ছিটকে পড়েছে, কারও অসুখ হয়েছে। কিন্তু শামসুকে কেউ আমার গা-ছাড়া করতে পারেনি। সে যেন আল্লাহ-প্রদত্ত ছায়া।

৫ মে মরিচাতে শুরু হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা গঠন প্রক্রিয়া। এরপর সংগ্রামপুর অবাঙালিদের পাতার ক্যাম্প অভিযান। খবর ছিল এলএমজি, রাইফেল, পিস্তল আরও কত কী আছে। কিন্তু কোনো কিছুই পাওয়া যায়নি। খবর পর্যন্তই সার। সেখান থেকে উল্কার মতো ধেয়ে গিয়েছিলাম সখীপুর। রাত কাটিয়েছিলাম সখীপুর প্রাইমারি স্কুলে। তারপর আমরা সময়ের  চে৬য়ে দ্রুত ছুটেছি। আঙ্গারগারা পরশুরাম মেম্বারের বাড়িতে পিলখানা থেকে পালিয়ে আসা ইপিআরদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র এনে কাদেরনগরে সালাম ফকিরের হেফাজতে রেখে পরদিন শুরু করেছিলাম আনুষ্ঠানিক মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ। কত আর হবে, ১০-১২-১৫ দিনে হাজার তিনেকের মতো যোদ্ধা সংগ্রহ হয়েছিল। কিন্তু তারা যুদ্ধ জানে না, অস্ত্র চালাতে পারে না। দিনকে রাত করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের অস্ত্র ধরতে শিখিয়েছিলাম।

অস্ত্র ধরতে শেখা বা চালাতে শেখা আর যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর দিক থেকে অবিশ্রান্ত গুলি আসার সময় শত্রুর বুকে গুলি ছোড়া এক কথা নয়। তবু নির্বোধের মতো সাহস করে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। বুকে ভয় ছিল, যোদ্ধাদের সুপথে রাখতে পারব তো! কোনো অসুবিধা হবে না। বুকের দুরদুর দূর করতে পারছিলাম না। সব সময় একটা দুশ্চিন্তা কুরে কুরে খাচ্ছিল। কোনোভাবেই স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। মনে করেছিলাম আমাকে অস্বীকার বা না মানলেও একবার ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করে শপথ করলে সবাই তা অবশ্যই রক্ষা করবে। ঠ