|| আদনান মাসউদ ||
হুজুরের মুনাজাতে প্রথম শরিক হই ২০০৫ এর এক সোনালী সকালে। ফরিদাবাদ মাদরাসার পুরনো সেই মসজিদের বারান্দায়।
সেদিন ছিল ইফতেতাহি মজলিস। উস্তাযে মুহতারাম মুনাজাতে হাত তোললেন। আমার মনে হলো– গোটা মসজিদজুড়ে মুষলধারে কান্নার বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
আহা!
কী দরদমাখা মুনাজাত!
সে কী আকুতিভরা ভাষা!!
চোখের পানিতে যেন ধুয়ে মুছে যাচ্ছিল অব্যক্ত সব ব্যাথা-বেদনা-যন্ত্রণা!!!
দুই.
দীর্ঘদিন পর্যন্ত হুজুর পূর্ণাঙ্গ বুখারী-১ এবং তিরমিযী-১ এর দরস দিয়েছেন।
নাশতার পরপর ৮টার দিকে দরসে প্রবেশ করতেন, প্রায় ১১টার কাছাকাছি সময়ে দরস থেকে বের হতেন।
সহজবোধ্য আরবিতে এক গতিতে তাকরির করে যেতেন। সর্বস্তরের মুস্তাওয়ার তালিবুল ইলমরা গ্রহণ করতে পারে, এমন সুবিন্যস্ত দরস হুজুরের অনন্য বৈশিষ্ট্য।
প্রতিটি কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার লাগাতার দরস, কিন্তু হুজুরের অনবদ্য উপস্থাপনে সময় কীভাবে পার হয়ে যেত, আমরা যেন টেরই পেতাম না।
তিন.
তাকওয়া-তাহারাত, ইনাবাহ ইলাল্লাহ... উস্তাযে মুহতারামের কত আওসাফ...
কিন্তু আমার চোখে এখনো ভাসে সহিহ বুখারিতে যেদিন مرض النبي ﷺ ووفاته এর আলোচনা আসলো, নবীজির অন্তিম অসুস্থতার কষ্টের অংশটুকু পড়া শুরু করতেই হুজুর গুমরে কেঁদে উঠলেন।
একেক লাইন পড়ছিলেন আর কান্নায় কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছিল। পুরো দরসগাহে কান্নার রোল পড়ে গেল। হুজুর কাঁদতে কাঁদতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন।
বুকের ভেতরে কি যে ঝড় তৈরি হয়েছিল সেই মুহূর্তে!
উস্তাযে মুহতারামের সাথে ভেজা চোখের অশ্রুতে আমরাও যেন পৌঁছে গিয়েছিলাম আম্মাজান আয়েশার কামরায়, সাড়ে ১৪০০ বছর আগের সেই বেদনাবিধূর লগ্নে।
আমরা যারা হাদিসের দরসে বসি, পড়ি কিংবা পড়াই–এই আবেগটুকু আমাদের কাছে অমূল্য। তাবৎ পৃথিবীর সমগ্র সম্পদ এর কাছে নগণ্য।
আমাদের সৌভাগ্য–উস্তায হিসেবে এমন অসাধারণ কিছু ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য পেয়েছি, যারা হাদীসের আলফায-মায়ানীর পাশাপাশি আবেগ এবং ভালোবাসার এই সিলসিলাও আমাদের মাঝে সঞ্চারিত করার চেষ্টা করেছেন।
আল্লাহ তাআলা উস্তাযে মুহতারামকে সিহহাত ও আফিয়াতের সাথে দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন।
লেখক: মাদরাসা শিক্ষক ও খতিব
