সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬ ।। ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ১৪ মহর্‌রম ১৪৪৮


দিনশেষে আলেম-উলামাদের প্রাপ্তি কী?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: আওয়ার ইসলাম

|| মুফতি এনায়েতুল্লাহ || 

বাংলাদেশে প্রায় ৬০টির মতো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে। এর মধ্যে ইসলামি দল ১০টির বেশি। এই ১০টি দলের মধ্যে কমপক্ষে ৭-৮টি কওমি মাদরাসাভিত্তিক। এর বাইরে তাবলিগ জামাতসহ দেশের বৃহৎ ধর্মীয় জনগোষ্ঠী কওমি মাদরাসাকেন্দ্রিক। দেশের প্রায় সাড়ে তিন লাখ মসজিদের মিম্বর আলোকিত করে আছেন কওমি আলেমরা। ধর্মীয় বিভিন্ন ইস্যুতে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান রাখা কওমি মাদরাসাকেন্দ্রিক অরাজনৈতিক বৃহৎ সংগঠন হেফাজতে ইসলামের প্রভাব অনস্বীকার্য।

এক কথায় দেশের আপামর জনগণের মাঝে ধর্মের প্রকৃত আলো ও ইসলামের বাণী পৌঁছাতে কওমি মাদরাসার আলেমদের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। ভোটের সময়ও তারা বিশাল ভূমিকা রাখার সুযোগ পান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য কওমি মাদরাসাকেন্দ্রিক এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধিত্ব সরকারে নেই। শুধু সরকার নয় উল্লেখযোগ্যভাবে কোথাও নেই কওমি মাদরাসার আলেম-উলামাদের অংশীদারিত্ব।

১. সরকারে নেই আলেম-উলামাদের অংশীদারিত্ব। এমনকি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে গঠিত সরকারি কোনো কমিটিতেও তারা জায়গা পান না। 

২. এখনও কার্যকর হয়নি কওমি সনদের স্বীকৃতি। কবে হবে, কীভাবে হতে পারে- কেউ জানেন না। আদৌ হবে কি-না বলা মুশকিল।

৩. কওমি আলেমরা সরকারি সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

৪. মসজিদ-মাদারাসায় চাকরি বিধিমালা হয়নি। কমিটির ইচ্ছায় চাকরি হয়, চাকরি যায়। কমিটি নিয়েও থাকে দ্বন্দ্ব। কমিটি বদলালে ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিদের চাকরি থাকে না। মাদরাসার শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে। 

৫. মসজিদের ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিন-খাদেম ও মাদরাসার শিক্ষকদের নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নেই। ভাতা নেই, বোনাস নেই, পেনশন নেই, বাড়ি ভাড়া নেই, যাতায়াত ভাতা নেই, চিকিৎসা ভাতা নেই। পেশা হিসেবে সরকারি ফর্মের তথ্যে ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিন-খাদেম ও মাদরাসায় শিক্ষকতার কথা উল্লেখ নেই। আলেম-উলামা, ইমাম-খতিবদের নিগ্রহের বিচার নেই। তাদের বিপদের দিনে কেউ পাশে দাঁড়ায় না। বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুত করলে প্রতিকারের জন্য কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। আগেই বলেছি, তারা সরকারি কোনো সুবিধা পান না। কিন্তু কাজ করানোর ক্ষেত্রে, জনসভায় লোক দেখানোর নিমিত্তে তাদের অনেক কদর। ইসলামিক ফাউন্ডেশনে ইমাম প্রশিক্ষণের একটা ব্যবস্থা থাকলেও, তা খুব মানসম্মত নয়। আর মাদরাসায় প্রশিক্ষণ বলতে নূরানী প্রশিক্ষণ, তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক।

৬. ইমাম-মুয়াজ্জিনরা ও মাদরাসার শিক্ষকরা তাদের দায়িত্বের বাইরে কোনো কাজ করার সুযোগ পান না। বলা চলেও সুযোগ দেওয়া হয় না।

৭. হামলা-মামলার শিকার আলেমদের পাশে এলাকার মানুষ দাড়াঁয় না, কেউ সাহস জোগায় না। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নেই। কমিটির তোয়াজ করে চাকরি করতে হয়।

৮. রাজনৈতিক দলগুলো আলেম-উলামাদের শুধু ব্যবহার করতে চায়, কোনো দায়িত্ব নিতে চায় না। কোনো কাজের অংশীদার করতে চায় না।

৯. আলেম-উলামাদের কেউ এলাকাভিত্তিক কোনো সংগঠনে জড়ালে অন্য সংগঠনের দায়িত্বশীলরা তাকে শত্রুজ্ঞান করেন, ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন। পরস্পরে এই শত্রুজ্ঞানের প্রভাব রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতে দেখা যায়। এর ফলে সাধারণ মানুষ টিপ্পনি কেটে বলেন, দুই হুজুর একসাথে চলতে পারেন না। কথাটি তিক্ত হলেও কিছুটা ‘সইত্য’।

১০. আলেমদের শুধুমাত্র নিজে ভালো, নিজের দলের নেতা ভালো, নিজের সংগঠনের কর্মসূচিই একমাত্র সঠিক- এমন প্রান্তিক চিন্তার প্রভাবে জনগণের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে রেখেছে। রাজনীতির মারপ্যাচে এই চিন্তা দিন দিন আরও গতি পাচ্ছে। এর সুবিধা নিচ্ছে বিরোধীরা, দিন শেষে আলেমদের অর্জন শূন্য।

দুঃখিত, মন খারাপ করবেন না। এতসব নাই এর ভীড়ে প্রাপ্তির খাতায় অনেক কিছু যোগ হয়। যেমন-

১. সমাজের আলেম-উলামারা যেসব দায়িত্ব পালন করেন- সবটা করেন প্রকৃত অর্থে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। ফলে নানা কটূ কথা, টেনশন, নিরাপত্তাহীনভাবে কোনোরকম বেঁচে থাকেন। সেই সঙ্গে রয়েছে হাজারো সমস্যা।

২. দুর্নীতি-অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে কিছু বললে চাকরি নেই। এছাড়া কমিটির অনৈকিত কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বললে চরিত্র হনন ও হয়রানিতো আছেই।

৩. কোনো ঘটনায় আলেম-উলামাকে আসামী করা হলে, তারা কোনো আইনি সহায়তা পান না। উল্টো তাদের সামাজিকভাবে হয়রানি করা হয়।

এভাবে বলার মতো আরও অনেক অনেক বিষয় আছে, আপাতত আজ এতটুকুই থাক।

লেখক: সিনিয়র আলেম সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ