|| ইবরাহীম খলিল ||
প্রস্তুতি ও সক্ষমতাবিহীন অবস্থায় হঠাৎ এমপি হওয়ার খেসারত দিচ্ছেন ইসলামি দলগুলোর অনেক সংসদ সদস্য। সময়, স্রোত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে দলগুলো কিছু আসনে বিজয়ী হলেও, দীর্ঘমেয়াদে সেই অবস্থান ধরে রাখা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। ইসলামি দলগুলো তা স্বীকার করুক বা না করুক, দলীয় পদমর্যাদা কিংবা সাংগঠনিক অবস্থান কখনোই স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, জনসম্পৃক্ততা এবং শক্তিশালী জনভিত্তির বিকল্প হতে পারে না।
স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী না হলে, জনগণের সমস্যা ও সংকট নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা না থাকলে তাদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। ফলে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের কারণে এমপি হওয়া সম্ভব হলেও, বাস্তব সংকটের সময় অভিজ্ঞতার ঘাটতি ও নেতৃত্বের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যশোরের একটি ঘটনা এ বাস্তবতারই ইঙ্গিত দেয়। সেখানে জামায়াতে ইসলামী জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে বিজয়ী হলেও, একজন এমপির কন্যাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া তুলনামূলক ছোট একটি ঘটনায় স্বয়ং ওই এমপিই স্থানীয় জনগণের হামলার শিকার হন। জনগণের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক ও পারস্পরিক আস্থা গড়ে ওঠার আগেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট হয়তো তাকে এমপি বানিয়ে দিয়েছিল। অথচ দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততা, মানুষের আস্থা অর্জন এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ভিত্তিতে নির্বাচিত হলে এমন পরিস্থিতি হয়তো সৃষ্টি হতো না, কিংবা হলেও তা মোকাবিলা করা অনেক সহজ হতো। ইসলামি দলগুলোর নেতৃত্বের জন্য এ ঘটনায় ভবিষ্যতের প্রস্তুতি, জনভিত্তি শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও সতর্কতা রয়েছে।
একজন এমপির রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা, প্রতিপক্ষের কৌশল সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা এবং প্রচলিত রাজনীতির দুষ্ট সংস্কৃতি সম্পর্কে বাস্তবসম্মত বোঝাপড়া থাকা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে তিনি নিজেও বারবার সংকটে পড়বেন, আর জনগণও তার কাছ থেকে প্রত্যাশিত বলিষ্ঠ ও কার্যকর নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হবে। স্বাভাবিকভাবেই তখন ইসলামি নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। কারণ, যিনি নিজেই রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ নন কিংবা পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষ নন, তিনি জনগণের নিরাপত্তা, স্বার্থ ও অধিকার কতটা কার্যকরভাবে রক্ষা করতে পারবেন,সেই প্রশ্ন উঠবেই।
এসবের পাশাপাশি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় একজন জনপ্রতিনিধির অর্থনৈতিক সক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা শুধু নাগরিক সেবা, আইন প্রণয়ন বা নীতিনির্ধারণে সীমাবদ্ধ নয়,ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা সংকটেও তারা জনপ্রতিনিধির সহযোগিতা প্রত্যাশা করে। এই বাস্তবতায় অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাব অনেক সময় একজন জনপ্রতিনিধিকে জনবিচ্ছিন্ন ও অসহায় করে তোলে, অথবা তাকে অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জনের প্রলোভনের মুখে ঠেলে দেয়। তাই প্রচলিত রাজনীতিতে ইসলামী দলগুলো যদি কার্যকর নেতৃত্ব দিতে চায়, তবে এসব বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের গভীর উপলব্ধি, যথাযথ প্রস্তুতি এবং বাস্তবমুখী পরিকল্পনা থাকা অপরিহার্য। অন্যথায়, অভিজ্ঞতা থেকে বলছি,পদে পদে তাদের হোঁচট খেতে হবে।
এছাড়া প্রচলিত পাওয়ার পলিটিক্সের বাস্তবতায়, যেখানে নীতি, আদর্শ বা জনকল্যাণের চেয়ে ক্ষমতা অর্জন ও প্রভাব বিস্তারই মুখ্য বিষয়, সেখানে আপনি যদি সেই কাঠামোর ভেতরে থেকেও সম্পূর্ণ দাওয়াহকেন্দ্রিক মনোভাব নিয়ে রাজনীতি পরিচালনা করতে চান, তবে প্রতিপক্ষ বারবার সেই দুর্বলতার সুযোগ নেবে। আপনি একজন আলেম, পীর বা ইমাম হিসেবে নিজ নিজ ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্মানিত হতে পারেন। কিন্তু ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বাস্তবতায় আপনার মূল্যায়ন হবে একজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে। এই বাস্তবতা মেনে নিতে কষ্ট হলে, রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন ও রাষ্ট্র পরিচালনার উদ্দেশ্যে পরিচালিত প্রচলিত রাজনীতি থেকে সরে আসাটাই অধিক যৌক্তিক। কারণ, আপনি তাদের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করবেন, আর তারা আপনাকে ছেড়ে দেবে, এমনটি কখনোই বাস্তবসম্মত নয়।
ইতিবাচক অর্থে ক্ষমতা চর্চা হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। আর নেতিবাচক অর্থে ক্ষমতা চর্চা হলো স্বজনপ্রীতি, দমন-পীড়ন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার। পার্থক্যটি এখানেই। এই সীমারেখায় সততা বজায় রাখতে পারলে ক্ষমতা চর্চা কোনো অপরাধ নয়, বরং প্রচলিত রাজনীতির অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে নিজের নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়ন করা। তাই প্রচলিত রাজনীতিতে ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টাকে অপরাধ হিসেবে দেখাটা শুধু বোকামিই নয়, মূর্খতাও বটে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে,অনেক ইসলামি দলের বৈশিষ্ট্যগত ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতার কারণে জনভিত্তিসম্পন্ন, অভিজ্ঞ, বাস্তবতাবোধসম্পন্ন এবং রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ব নেতৃত্ব গড়ে ওঠে না। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সাময়িক সাফল্য অর্জিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে সেই অবস্থান ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন হবে।
আমার বিশ্বাস, ইসলামি দলগুলোর মধ্যে এই বাস্তবতা উপলব্ধি করার সক্ষমতা অবশ্যই রয়েছে। তারপরও একজন ক্ষুদ্র রাজনৈতিক কর্মী ও সাবেক জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার স্বল্প অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে এই কথাগুলো তুলে ধরলাম।
লেখক: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাবেক নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর
আইও/