এপ্রিল ও মে মাসের পেট্রোল-অকটেনের সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে। আপাতত আমদানি করা সম্ভব না-হলেও আগামী দুই মাস সরবরাহে সমস্যা হবে না বলে জানিয়েছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র (যুগ্মসচিব) মনির হোসেন চেীধুরী।
তিনি বলেন, জনগণ আতঙ্কিত হয়ে বেশি করে তেল নিচ্ছে এতেই সমস্যাটা বেড়ে যাচ্ছে। পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কোন কারণ নেই। আগামী ২ মাসের সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জ্বালানি তেল সরবরাহে কিছু নিয়ম ফলো করা হচ্ছে। আগের বছরের একইমাসে যে পাম্প যতটুকু তেল নিয়েছে কিছুটা বাড়িয়ে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। সে কারণে সরবরাহ কম হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে আমাদের কাছে খবর আসছে কেউ কেউ তেল নিয়ে বাড়িতে মুজত করছেন। এক পাম্প থেকে তেল নিয়ে অন্য পাম্পে গিয়ে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন এতে লাইন লম্বা দেখা যাচ্ছে।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারীর জন্য অপরিশোধিত তেল আমদানির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই ১ লাখ টনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, মালয়েশিয়া থেকে আসবে। এছাড়া সৌদি আরব বিকল্প রুট দিয়ে ১ লাখ টন পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ওই জাহাজটি ১৮ এপ্রিল রওয়ানা দেওয়ার কথা। যে কারণে ইআরএল নিয়ে কোন সংকটের সম্ভাবনা দেখছি না।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, সরকারের আন্তরিকতায় কোন ঘাটতি নেই। তবে ভোক্তাদের আন্তরিকতার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। অতীতে কখনও এতো গাড়ি পাম্পে দেখা যায়নি। আল্লাহ জানেন কোথা থেকে এতো গাড়ি আসছে।
মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, গতবছরের সঙ্গে মিল করলে জ্বালানি তেল সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তেল আনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। রেশনিং করার পর থেকে মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে তা এখনও দূর হয়নি। যে কারণে মানুষের তেল বেশি কেনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ একাধিক পাম্প থেকে তেল নিয়ে মজুদও করছেন বলে তথ্য আসছে। একগাড়ি তেল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
একাধিক পাম্প মালিকের সঙ্গে কথা বলে গত বছরের সঙ্গে মিল রেখে সরবরাহের তথ্য পাওয়া গেছে। তারা বলছেন, আগে যারা ২ লিটার তেল নিতেন তারাও এখন ট্যাংকি ভর্তি করে তেল নিচ্ছেন। ট্যাংকি একটু খালি হতেই ফের দাঁড়াচ্ছেন লাইনে।
মঙ্গলবারও রাজধানীসহ দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘসারি দেখা গেছে। বিশেষ করে অকটেন নিয়েই হাহাকার বেশি। কোন কোন পাম্পে লাইন কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তেল পেতেই কয়েক ঘণ্টা সময় চলে যাচ্ছে। সুজন মিয়া নামের একজন ড্রাইভার বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, সোমবার পরিবাগে মেঘনা মডেল পাম্পে অকটেন পেতে ৬ ঘণ্টার মতো সময় লেগেছে। অন্যান্য পাম্পের অবস্থাও কমবেশি একই, পাম্পগুলোতে তেল পৌঁছার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফুরিয়ে যাচ্ছে। যে কারণে দিনের বড় একটি সময় থাকছে বন্ধ।
ইরান যুদ্ধের কারণে আতঙ্কিত লোকজন বেশি তেল কেনা শুরু করলে গত ৬ মার্চ ২০২৬ রেশনিং করা হয়। ১৫ মার্চ ২০২৬ রেশনিং তুলে নেওয়া হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দেখা যাচ্ছে না। খোদ রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী তেল পেলেও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। সরকার বাধ্য হয়ে পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগসহ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। শুধুমাত্র কোস্টগার্ডের অভিযানে এপ্রিল মাসের প্রথম ৪ দিনে ৭১ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তারপরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সুত্র জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চে ডিপো থেকে দৈনিক ডিজেল উত্তোলনের হার ছিল ১২ হাজার ২২৭ টন। সেখানে চলতি বছর ১৪ হাজার টন সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। পেট্রোল-অকটেন যথাক্রমে সরবরাহ দেওয়া হয় ১১০০ ও ১২০০ টন। এবার তার চেয়ে সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়েও সংকট কাটছে না।
বিপিসির আমদানি করা তেল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির মাধ্যমে বিতরণ করে। তিন কোম্পানি ২ হাজার ৩০৭টি ফিলিং স্টেশনসহ প্যাক পয়েন্ট ডিলারের মাধ্যমে তেল সরবরাহ করে থাকে।দেশের তেল মজুতের বেশির ভাগ ট্যাংকারও এই তিন কোম্পানির আওতায়। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী ৬০ দিনের মজুতের সক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করার দায়িত্ব ওই তিন বিতরণ কোম্পানির। কিন্তু তারা এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করেনি। যে কারণে দেশ বড় বিপাকে পড়েছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
২০২০ সালে ৬০ দিনের তেলের ধারণ সক্ষমতা তৈরি করার সিদ্ধান্ত হলেও এখন আছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মতো। ইরান যুদ্ধের সংকটে নতুন করে সক্ষমতা বৃদ্ধির আলাপ শুরু হয়েছে। এবার অবশ্য ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৯০ দিনের লক্ষ্যমাত্রার আলাপ তুলেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
জেডএম/