সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪ ।। ১৯ ফাল্গুন ১৪৩০ ।। ২৩ শাবান ১৪৪৫


বেফাকের আমেলার বৈঠকে আল্লামা মাহমুদুল হাসানের বক্তব্য


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ফাইল ছবি

কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মজলিসে আমেলার বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। আজ (৯ সেপ্টেম্বর) শনিবার সকালে ১০ টায় রাজধানীর ভাঙ্গাপ্রেসস্থ বেফাকের কার্য়ালয়ে এ বৈঠক শুরু হয়ে জোহরের নামাজের পূর্বে শেষ হয়। 

বেফাক মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হকের পরিচালনায় বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন সংস্থাটির সভাপতি ও আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসান।

বৈঠকে সারাদেশ থেকে মজলিসে আমেলার সদস্যরা উপস্থিত হয়েছিলেন। সংস্থাটির মহাপরিচালক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী জানান, বৈঠকে  আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর মজলিসে শুরার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও বেফাকের গঠনন্ত্রের সংশোধনী, দুস্তুরুল মাদারিস বা কওমি মাদরাসা পরিচালনার নীতিমালার অনুমোদন পেয়েছে বেফাকের জরুরি এ বৈঠকে।

আল্লামা মাহমুদুল হাসানের ৪ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য পাঠ করার মাধ্যমে বৈঠকের আনু্ষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বেফাকের বিগত বছরের কার্যবিবরণী তুলে ধরে বলেন। বক্তব্যটি হুবুহু তুলে ধরা হলো-

মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে আমি আমার বক্তব্য শুরু করছি। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'য়ালার অশেষ মেহেরবানীতে দীর্ঘদিন পর আবারও দ্বীনি এক মহান দায়িত্ব পালনে আমরা একত্রিত হয়েছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কষ্ট স্বীকার করে তাশরীফ আনার জন্য আপনাদের জানাই আন্তরিক মুবারকবাদ। এই সময়ের মধ্যে যেসব উলামা আকাবির আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন আমরা তাদের মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে জান্নাতে উঁচু মাকাম দান করুন ।

সম্মানিত ওলামা হাযরাত, চতুর্মুখী ফেতনার যুগে আমাদের বড়রা দ্বীনি ইলমের হেফাজত ও উলামায়ে কেরামের মানসাবী দায়িত্ব পালনের জন্য দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুনিয়ার বুকে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তাদের সে ধারাকে অব্যাহত রাখার জন্য আমাদের মুরুব্বীগণ বেফাক প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে বেফাক তার পথচলা জারী রেখেছে। সময়ের ব্যবধানে বড়দের এই কঠিন জিম্মাদারী আমাদের উপর এসেছে। বেফাকের রীতি-ঐতিহ্য বজায় রেখে মুরুব্বীদের রেখে যাওয়া এই আমানত সবাই মিলে সংরক্ষণ করা এবং যুগের চ্যালেঞ্জ মুকাবালা করে এই কাজ এগিয়ে নেওয়া আজকের বড় দাবী।

সম্মানিত উপস্থিতি, ইজতেমায়ী কাজের সৌন্দর্য এই যে, এখানে যেকোন সিদ্ধান্ত পরস্পরে পরামর্শ করে নেওয়া হয়। দ্বীনি কাজে শুরায়ী নেযাম অপরিহার্য্য। পাশাপাশি তাকসীমে কার বা কর্ম বন্টন পদ্ধতির জন্য বেফাকে অনেকগুলো সাব-কমিটি নানা বিষয়ের প্রস্তাবনা ও সুপারিশ তৈরী করে মজলিসে খাস ও মজলিসে আমেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজ এবং বস্তুনিষ্ঠ করতে সাহায্য করে।

এতে কোন কাজে ব্যক্তি বা জিম্মাদারের যেমন সিদ্ধান্ত নিতে আসানী হয়, ঠিক তেমনই সিদ্ধান্ত সঠিক এবং বাস্তবসম্মত হয়। প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিগন তাই কোন কৃতিত্ব বা ব্যর্থতার জন্য কেবল বিশিষ্ট লোকেদের প্রশংসা বা নিন্দা করেন না। কারণ ইজতেমায়ী কাজ সবাই মিলে করে থাকেন। হাদীস শরীফেও বলা হয়েছে- যেব্যক্তি পরামর্শ করে কাজ করে সে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়না। অন্য হাদীসে আছে, “আদ-দ্বীনু আন-নাসিহা”- দ্বীন হচ্ছে খায়েরখাহীর নাম। আলহামদুলিল্লাহ, বেফাকেও আমাদের সহকর্মীগণ বড়দের এই খাইরখাহী ও শুরায়ী পদ্ধতি অবলম্বন করে একদিকে যেমন বরকত পাচ্ছি, অপরদিকে আল্লাহর ফযল ও করমে বেফাকের উন্নতি, অগ্রগতিও অব্যাহত রয়েছে।

মুহতারাম ওলামায়ে কেরাম, সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে পরীক্ষা একটি অনিয়মপূর্ণ বিষয় বলে মানুষের সামনে প্রমাণিত। আলহামদুলিল্লাহ, কওমী মাদরাসা অন্য অনেক বিষয়ের মতো পরীক্ষার স্বচ্ছতার দিক দিয়েও জাতির সামনে প্রশংসিত। বেফাক তাৎক্ষণিক প্রশ্নপত্র প্রেরণ বিষয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার করে জাতির সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অনিয়ম-এর পরিমান না থাকার পর্যায়ে নেমে এসেছে যা বর্তমান সময়ে খুবই দুর্লভ। বেফাকের এই উদ্ভাবনী চিন্তা সরকার ও অন্যান্য শিক্ষা কর্তৃপক্ষও বিস্ময়ের সাথে স্বীকার করেছেন। অনেকে অনুসরণের দিকেও এগুচ্ছেন।

এবছর থেকে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হওয়ায় আগামী দু'এক বৎসরের মধ্যে সারা দেশের কওমী মাদরাসার শিক্ষার্থি নিবন্ধন, অন্তর্ভুক্তি, গোটা পরীক্ষা ব্যবস্থাসহ বেফাকের সকল বিভাগ অনলাইনভিত্তিক সফটওয়্যারের আওতায় চলে আসবে, ইনশাআল্লাহ। বেফাকের তা'লীম-তারবিয়াত বিভাগ, প্রশিক্ষণ, পরিদর্শন ইত্যাদি আরো নিপুনভাবে এগিয়ে নিচ্ছে, আল্লাহ চাহেতো অল্পদিনের ব্যবধানে বেফাক বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ নিজস্ব ভবনে স্থায়ীরূপে চালু করতে যাচ্ছে।

সহদয় সহকর্মীবৃন্দ, আমাদের সময়ে বেফাকে আরো কিছু বিষয়ের উপর অধিক জোর দেওয়ার চেষ্টা করেছি। অনেক ক্ষেত্রে আলহামদুলিল্লাহ সুফলও দেখা গিয়েছে। যেমন-বেফাক কর্তৃক প্রকাশিত পাঠ্য বইগুলো নকল প্রতিরোধে কোম্পানী হতে ভিন্ন কালারের কাগজ বানিয়ে ছাপানো হয়েছে যার ফলে বিগত বৎসর প্রায় ১০০% নকল প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। ধারণা করা যায় যে, এতে বেফাক বহুলাংশে লাভবান হয়েছে। সকলের নিকট তা প্রশংসিত হয়েছে।

বেফাকের সম্পাদনা পরিষদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সকল বইয়ের বানান পরিবর্তনসহ সম্পাদনার কাজ সম্পন্ন করানো হয়েছে। সেই সাথে ১৪৪৪ হিজরির বই ছাপার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১লা রমযানের পূর্বেই ৮৭,৫৭,৪৩৯ কপি বই মুদ্রণ করা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের হাতে যথাসময়ে বই পৌঁছে দিতে বেফাক সক্ষম হয়েছে।

বর্তমানে বেফাকের বানান রীতি প্রস্তুতের মাধ্যমে সকল বইসমূহ আরো সহজ-সাবলিল ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সম্পাদনার কাজ চলমান রয়েছে। ১লা রমযানের আগেই বেফাকের সকল বিভাগের অর্থ ও হিসাব সংরক্ষণ নীতি ও উসূলের ভিত্তিতে ঢেলে সাজানোর ফলে বর্তমান সময়ের আর্থিক স্বচ্ছতা সকলের নিকট দৃষ্টান্ত হওয়ার মতো।

প্রতিদিন হিসাব মিলানো, মাসিক হিসাব সমাপনি, পূর্ব চাহিদা পাশ, মাসিক বাজেট পেশ এবং নির্দিষ্ট দিনের ভিতর বিগত একবছরের হিসাব অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটির সামনে পেশ করা, বিল ভাউচার সংরক্ষণের হিসাববিজ্ঞানসম্মত ও স্বীকৃত নীতি অনুসরণসহ সম্ভ্যাব্য সবধরণের অস্বচ্ছতা ও দুর্বলতা দূর করে আল্লাহর মেহেরবানীতে একটি সুন্দর ইমেজ তৈরী করা সম্ভব হয়েছে। ব্যাংক লেন- দেনে অধিকতর নিয়মতান্ত্রিকতাও বেফাককে স্বচ্ছতার নতুন মাত্রা দিয়েছে।

শ্রদ্ধাভাজন ওরাসাতুল আম্বিয়া, বিগত ২৯/০৫/১৪৪৪হিঃ তারিখে বেফাকের সর্বমোট ইলহাকভুক্ত মাদরাসা ছিল ১৯,৯৬১টি, বর্তমানে ইলহাকভুক্ত মাদরাসা সংখ্যা ২১,৮৪৯ টি মোট ১৮৮৮টি মাদরাসা বিগত আমেলার পর হতে আজ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত আমেলার সময় বেফাকের সাধারণ, পরীক্ষা ও প্রকাশনা তহবিলের উদ্বৃত্ত তহবিল ছিল ৬৮ কোটি ৬৬লক্ষ ৪০হাজার ৮১০টাকা।

এরপর যথারীতি বেফাকের স্বাভাবিক আয় এবং পরীক্ষা গ্রহণ, পুস্তক মুদ্রণ, পরিচালনা ব্যয় ইত্যাদি আঞ্জাম দেওয়ার পর উপরন্তু সামাদনগরস্থ ভবন নির্মাণ কাজে এবং বামৈলস্থ বেইজমেন্টসহ নয়তলা (বারতলার ফাউন্ডেশন ও অনুমোদন) বিশিষ্ট নতুন ভবন ক্ৰয় বাৰত প্ৰায় ১৭কোটি টাকা ব্যয় করার পরও বর্তমানে উক্ত তিন তহবিলেসর্বমোট ৫১কোটি ৭১লক্ষ ৬২ হাজার ৪৪৩ টাকা উদ্বৃত্ত রয়েছে। বর্তমান জায়গার প্লান পাশ করিয়ে বহুতল বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা সাবকমিটির মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নসহ বেফাকের সামগ্রিক কল্যান সাধনে আপনাদের সকলের সার্বিক সহযোগিতা একান্তভাবে কামনা করছি।

দেশের অর্থনৈতিক মন্দাভাব ও জিনিসপত্রের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি বিবেচনায় এ বছর শিক্ষার্থীদের সকল পর্যায়ের ফি কমানো হয়েছে। এতে বেফাকের সম্ভাব্য আয় প্রায় ২ কোটি টাকা কম হলেও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য এটি ছিল বেফাকের পক্ষ থেকে একটি সৌজন্যমূলক বিবেচনা। আল্লাহর রহমতে আমরা সবাই একমত হয়ে এই রেয়ায়েতটুকু করতে পেরেছি। অনগ্রসর এলাকায় মকতব-মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা এবং প্রয়োজনে ত্রাণ-সাহায্য প্রদান কার্যক্রম বাস্তবায়নের পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও নানাবিধ কল্যানকর কাজে বেফাকের পদচারণা থাকবে ইনশাআল্লাহ।

পরিশেষে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে উম্মাহর সার্বিক কল্যাণ কামনা করে আমার বক্তব্য শেষ করতে চাই। তিনি শেষ জামানায় উলামায়ে কেরাম ও ধর্মপ্রাণ জনগণকে সবধরণের ফিতনা থেকে মুক্ত রেখে নিরাপদ ও আ'ফিয়াতের জিন্দেগী এবং পরকালীন কামিয়াবী দান করুন, আমীন।

সুষ্ঠু ও সুন্দর সভা অনুষ্ঠানে সদরে বেফাক-এর পরামর্শ

আমি সর্বশেষ বিগত আমেলার মিটিং-এ আপনাদেরকে সভার শৃংখলা ও সুষ্ঠু ইস্তেজামের লক্ষ্যে কিছু পরামর্শ প্রদান করেছিলাম, যা আজ আবারও আপনাদের সামনে পুনরুল্লেখ করছি। যাতে করে আমাদের ইজতেমাইয়্যাত অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হয় এবং বেফাকের আগামী পথ চলায় অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়। আজকের সভায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সকলেই সবিশেষ গুরুত্বের সাথে পালন করলে সভার এন্তেজাম সুন্দর ও সুষ্ঠু হবে, ইনশাআল্লাহ।

(১) সভাপতির অনুমতি গ্রহণপূর্বক সুচিন্তিত মতামত প্রদান করা সুষ্ঠু মজলিস ইন্তেজামের প্রধান শর্ত। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে সকলেই অনুসরণ করবেন বলে আশা রাখি।

(২) শুধুমাত্র আলোচিত বিষয়ের উপর আলোচনা করা যাবে অন্য কোনো অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে আলোচনা করা হতে সদস্যগণ বিরত থাকবেন ।

(৩) দৃষ্টি আকর্ষণ জনিত কোন প্রশ্ন থাকলে দীনি ও ইলমি পরিবেশ বজায় রেখে বিনম্র ভাষায় দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেন ।

(৪) আপনাদের পরামর্শ ও দৃষ্টি আকর্ষণ নোট করা হবে, সম্ভব হলে মহাসচিব জবাব প্রদান করবেন, অন্যথায় পরবর্তীতে তা জেনে নিতে অনুরোধ রইল।

(৫)

দেশের সর্বোচ্চ উলামাগণের ভাষা, বক্তব্যের উপস্থাপন, শালীনতা রক্ষা, পরনিন্দায় লিপ্ত না হওয়া নিজেদের শান অনুযায়ী হওয়াই কাম্য।

(৬) কারো প্রতি কটাক্ষ করে বক্তব্য প্রদান, অন্যের মতামতকে খণ্ডন করা কিংবা পরনিন্দায় লিপ্ত হওয়া জাতির ইজতিমাইয়্যাতকে বিনষ্ট করে। কাজেই উলামায়ে কেরামের জন্য এগুলো অবশ্যই বর্জনীয়।

এমআর/


সম্পর্কিত খবর