সন্ধ্যা নেমেছে। উঠোনে হালকা বাতাস বইছে। নাতি-নাতনিরা গোল হয়ে বসেছে দাদার চারপাশে। দাদা মৃদু হেসে বললেন, আচ্ছা বলো তো, শুধু শক্তি থাকলেই কি সব যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায়?
সবাই একসঙ্গে বলল, না দাদা!
দাদা মাথা নেড়ে বললেন, একদম ঠিক। আজ আমি তোমাদের এমন এক যুদ্ধের গল্প শোনাব, যেখানে তলোয়ারের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ছিল বুদ্ধি, ঐক্য আর আল্লাহর ওপর ভরসা। এই যুদ্ধের নাম— খন্দকের যুদ্ধ।
উহুদের যুদ্ধের পর মক্কার কুরাইশরা ভাবল, মুসলমানদের এখনই থামাতে না পারলে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে যাবে। এজন্য তারা এবার একা যুদ্ধ করতে এল না। আরবের বিভিন্ন গোত্রকে সঙ্গে নিয়ে তৈরি করল এক বিশাল বাহিনী। প্রায় দশ হাজার সৈন্য, অসংখ্য ঘোড়া আর অস্ত্র নিয়ে তারা মদিনার দিকে রওনা হলো।
মদিনায় খবর পৌঁছাতেই সবাই বুঝতে পারল— এবারের বিপদ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শে বসলেন। কারণ, ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ কাজ একা সিদ্ধান্ত নিয়ে নয়, পরামর্শ করেই করা হয়।
পরামর্শের এক পর্যায়ে পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারিসি (রা.) বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের দেশে শত্রুকে ঠেকানোর জন্য শহরের সামনে গভীর পরিখা খনন করা হয়।' সাহাবিরা অবাক হয়ে গেলেন। আরব দেশে এমন যুদ্ধকৌশল আগে কেউ দেখেনি।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সঙ্গে সঙ্গে এই সুন্দর পরামর্শ গ্রহণ করলেন। তারপর শুরু হলো বিশাল কাজ— খন্দক খনন।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় কী জানো? রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেও কোদাল হাতে কাজ করলেন। তিনি শুধু নির্দেশ দেননি; সাহাবিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাটি কেটেছেন। ক্ষুধা ছিল, শীত ছিল, শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। তবুও কারও মুখে অভিযোগ ছিল না। সবাই একে অপরকে সাহস দিচ্ছিল।
দাদা একটু থেমে বললেন, এই দৃশ্যই তো সত্যিকারের নেতৃত্বের শিক্ষা। নেতা সবার আগে নিজেই কাজে নেমে পড়েন।
কয়েকদিন পর বিশাল বাহিনী মদিনার কাছে এসে পৌঁছাল। কিন্তু সামনে যা দেখল, তা দেখে তারা হতবাক! মদিনার চারদিকে গভীর খন্দক। তাদের ঘোড়া লাফিয়ে পার হতে পারছে না। বারবার চেষ্টা করেও তারা ব্যর্থ হলো। যে বাহিনী ভেবেছিল খুব সহজেই শহরে ঢুকে পড়বে, তারা এখন খন্দকের ওপারে দাঁড়িয়ে অসহায় হয়ে গেল।
দিনের পর দিন অবরোধ চলতে লাগল। মদিনার ভেতরে খাদ্যের সংকট দেখা দিল। শীতল বাতাস বইছিল। চারদিকে অনিশ্চয়তা। মুনাফিকরা নানা ভয়ের কথা ছড়াতে লাগল। কিন্তু সত্যিকারের মুমিনরা বললেন, "আল্লাহ ও তাঁর রাসুল আমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা অবশ্যই সত্য।"
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবিদের সাহস দিচ্ছিলেন, আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলেন এবং সবাইকে ধৈর্য ধরতে বলছিলেন।
এক রাতে হঠাৎ আবহাওয়া বদলে গেল। প্রবল ঝড়ো হাওয়া শুরু হলো। এমন বাতাস বইতে লাগল যে, শত্রুদের তাঁবু উপড়ে যেতে লাগল। রান্নার আগুন নিভে গেল। জিনিসপত্র ছড়িয়ে পড়ল। সৈন্যদের মনে ভয় ঢুকে গেল। তাদের নিজেদের মধ্যেও মতবিরোধ শুরু হল। তখন তারা বুঝল— আর এই অবরোধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। অবশেষে যুদ্ধ না করেই তারা মদিনা ছেড়ে ফিরে গেল।
দাদা বললেন, দেখেছো? আল্লাহ যখন সাহায্য করেন, তখন অনেক সময় যুদ্ধ না করেও বিজয় আসে। এই ঘটনার কথা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন—
"হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের ওপর আক্রমণ করেছিল। তখন আমি তাদের বিরুদ্ধে প্রবল বাতাস এবং এমন বাহিনী পাঠিয়েছিলাম, যা তোমরা দেখতে পাওনি।" (সূরা আল-আহযাব: আয়াত ৯)
দাদা নাতি-নাতনিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, এই যুদ্ধ আমাদের শেখায়, শুধু শক্তিশালী হলেই জয় আসে না। সঠিক পরিকল্পনা, ভালো পরামর্শ, একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল— এসবই প্রকৃত বিজয়ের চাবিকাঠি।
খন্দকের যুদ্ধের পর কুরাইশদের শক্তি অনেকটাই ভেঙে পড়ল। আর মুসলমানদের অবস্থান আগের চেয়ে আরও দৃঢ় হয়ে গেল।
দাদা মুচকি হেসে বললেন, আচ্ছা, আজকের গল্প থেকে তোমরা কী শিখলে?
নাতি-নাতনিরা একসঙ্গে উত্তর দিল, দাদা, বড় সমস্যা এলে ভয় পাওয়া নয়; আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সবাই মিলে বুদ্ধি করে কাজ করতে হয়।
দাদা খুশি হয়ে বললেন, মাশাআল্লাহ! এটাই আজকের গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। তাহলে আগামীকাল গল্প শোনার জন্য প্রস্তুত থেক কিন্তু। নাতি-নাতনিরা বলল, ইনশাআল্লাহ।
গল্পে গল্পে প্রিয় নবীজি (পর্ব: ২১)
লেখক: আকিদুল ইসলাম সাদী
চলবে....
আইও/