|| মুস্তাকিম আল মুনতাজ তালুকদার ||
আত্মশুদ্ধি, ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষার প্রচার এবং সমাজ সংস্কারের মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯৪৪ সালে শায়খুল ইসলাম আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী (রহ.)-এর হাতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ১৯৫৪ সালে চায়ের রাজধানীখ্যাত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বরুণা এলাকা থেকে সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত একটি দ্বীনি সংগঠনের কার্যক্রম সময়ের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে, ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে।
শায়খে বর্ণভী (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর সংগঠনের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরি আল্লামা শায়খ খলিলুর রহমান বর্ণভী (রহ.)। তাঁর হাত ধরে সংগঠনটি আরও বিস্তৃত হতে থাকে। পরবর্তীতে আল্লাহর প্রিয় এ বান্দাও পাড়ি জমান না ফেরার দেশে।
ফেদায়ে ইসলাম আল্লামা শায়খ খলিলুর রহমান বর্ণভী (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর সংগঠনের হাল ধরেন শায়খে বর্ণভী (রহ.)-এর আরেক সুযোগ্য উত্তরসূরি, বর্তমান আমির আল্লামা রশিদুর রহমান ফারুক বর্ণভী, পীর সাহেব বরুণা। তাঁর নেতৃত্বে সংগঠনটি আজ জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে।
বরুণা মাদরাসার ময়দানে ইসলাহী জোড় থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় পর্যায়ে আজিমুশ্বান ইসলাহী ইজতেমা—এভাবেই বিস্তৃত হয়েছে সংগঠনটির দাওয়াতি কার্যক্রম। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হলো আরেকটি আজিমুশ্বান ইসলাহী ইজতেমা। মুসল্লিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও অভূতপূর্ব উপস্থিতিতে এ আয়োজন রাজধানীর বুকে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
সিলেটকেন্দ্রিক, প্রচারবিমুখ আল্লাহওয়ালার আহ্বানে ইজতেমায় অংশগ্রহণ করতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পীর সাহেব বরুণার ভক্ত মুরিদানরা বাস-ট্রেন ভর্তি করে শুক্রবার ফজরের আগেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পৌঁছান। শেষ রাতে তাহাজ্জুদ, জিকির-আজকার ও রোনাজারির আমলে শরিক হতে মুসল্লিদের স্বতঃস্ফূর্ত ঢল নামে। রাজধানীর বুকে এমন বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম—নিঃসন্দেহে এক অভাবনীয় দৃশ্য। একে তাঁর দাওয়াতের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের নিদর্শন-ই মনে করি।

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সেই জনস্রোত রূপ নেয় বিশাল জনসমুদ্রে। সাদা টুপি-পাঞ্জাবিতে সজ্জিত মুসল্লিদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণাতীতকালের বৃহৎ জুমার জামাত।
শুক্রবার ফজরের আগের রাতের মোনাজাত এবং সন্ধ্যায় আমিরে আঞ্জুমানের হৃদয়স্পর্শী বয়ান ও আখেরি মোনাজাত—দুই পর্বেই সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন আধ্যাত্মিক পরিবেশ। আল্লাহর দরবারে হাত তুলে লাখো মুসল্লি কান্নায় ভেঙে পড়েন। কারও চোখে অশ্রু, কারও কণ্ঠে আকুতি; পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মুখরিত হয়ে ওঠে আল্লাহর জিকির ও মোনাজাতে।
বরুণা মাদরাসার ময়দান থেকে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান—দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা কেবল একটি সংগঠনের বিস্তৃতির গল্প নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, দ্বীনি চেতনা ও ইসলাহী দাওয়াতের প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসারও এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রচারবিমুখ এক আল্লাহওয়ালার আহ্বানে লাখো মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এমন এক ঐতিহাসিক আজিমুশ্বান ইসলাহী ইজতেমায় সরাসরি উপস্থিত থাকতে পারাও নিঃসন্দেহে পরম সৌভাগ্যের বিষয়। সময়ের এই স্মরণীয় মুহূর্তের একজন ক্ষুদ্র অংশীদার হতে পেরে মহান আল্লাহর দরবারে অশেষ শুকরিয়া। ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে রইলাম, অন্তর্ভুক্ত হলাম ইতিহাসের দলিলে। আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ!
লেখক: তরুণ আলেম ও লেখক
আইও/