আওয়ার ইসলাম ডেস্ক
সন্তান প্রতিপালনে ইসলামের সুন্দর দিক নির্দেশনা রয়েছে। পানাহার ও শিক্ষার মধ্যে সিমাবদ্ধ নয়। সন্তানের শালীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নৈতিকতা গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ । এ কারণে সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই আদব-কায়দা, শালীনতা ও ব্যক্তিগত সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন করে তোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর অন্যতম দিক হলো—সন্তানের ঘুমের বিছানা আলাদা করে দেওয়া।
প্রশ্ন হলো, সন্তানের বয়স কত হলে তার বিছানা আলাদা করতে হবে? এ বিষয়ে হাদিস ও ফিকহের নির্দেশনা কী?
দশ বছর বয়সে বিছানা আলাদা করার নির্দেশ
আমর ইবনে শুআইব (রহ.) তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ، وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرٍ، وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ.
‘তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদের নামাজের নির্দেশ দাও। আর দশ বছর বয়সে নামাজের ব্যাপারে শাসন করো এবং তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৬৬৮৯)
এ হাদিসে দশ বছর বয়সে সন্তানদের বিছানা পৃথক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, সন্তানদের মধ্যে শালীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও পরস্পরের সীমারেখা সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা।
এখানে হাদিসে নামাজের ব্যাপারে শাসনের কথা থাকলেও তা শিশুকে ক্ষতিকর বা নিষ্ঠুরভাবে মারধর করার অনুমতি নয়। শিশুর বয়স ও পরিস্থিতি বিবেচনায় কোমলতা, শিক্ষা ও সংশোধনের নীতি অনুসরণ করতে হবে।
সাত বছর বয়সে বিছানা আলাদা করার বর্ণনা
এ বিষয়ে সাত বছর বয়সের কথাও একটি বর্ণনায় এসেছে। আবদুল মালিক ইবনে রাবি ইবনে সাবরা তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
إِذَا بَلَغَ أَوْلَادُكُمْ سَبْعَ سِنِينَ فَفَرِّقُوا بَيْنَ فُرُشِهِمْ.
‘তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।’ (সুনানে দারাকুতনি, হাদিস: ৮৮৬; আল-মুস্তাদরাক আলাস-সহিহাইন, হাদিস: ৭২১)
সাত বছর বয়সের এই বর্ণনাটি দশ বছর বয়সসংক্রান্ত বর্ণনার পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়। তবে বর্ণনাগুলোর সনদ ও গ্রহণযোগ্যতার মান এক নয়; তাই দুটিকে একই মাত্রার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন না করে সতর্কতার সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।
সন্তানের বয়স সাত বছর হলে তার ব্যক্তিগত বিছানার অভ্যাস গড়ে তোলা একটি ভালো সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। আর দশ বছর বয়সে বিছানা পৃথক করার বিষয়ে হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশ এসেছে।
একই বিছানায় ঘুমানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা
আবদুর রহমান ইবনে আবি সাঈদ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
لَا يَنْظُرِ الرَّجُلُ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ، وَلَا الْمَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ، وَلَا يُفْضِي الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ فِي الثَّوْبِ الْوَاحِدِ، وَلَا تُفْضِي الْمَرْأَةُ إِلَى الْمَرْأَةِ فِي الثَّوْبِ الْوَاحِدِ.
‘কোনো পুরুষ যেন অন্য পুরুষের সতরের দিকে দৃষ্টি না দেয় এবং কোনো নারী যেন অন্য নারীর সতরের দিকে দৃষ্টি না দেয়। কোনো পুরুষ যেন অন্য পুরুষের সঙ্গে একই কাপড়ের নিচে শরীর ঘেঁষে না শোয় এবং কোনো নারীও যেন অন্য নারীর সঙ্গে একই কাপড়ের নিচে শরীর ঘেঁষে না শোয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১১৬০১)
এ হাদিসে সতর রক্ষা এবং একই কাপড়ের নিচে ঘনিষ্ঠভাবে শয়ন করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্তানদের মধ্যেও শালীনতা ও ব্যক্তিগত সীমারেখা রক্ষার শিক্ষা দেওয়া জরুরি।
হানাফি ফিকহে বিছানা পৃথক করার বিধান
হানাফি ফিকহের গ্রন্থে দশ বছর বয়সে সন্তানদের বিছানা পৃথক করার বিষয়ে নির্দেশনা উল্লেখ করা হয়েছে। আদ-দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতার-এর আলোচনায় এসেছে—
وَإِذَا بَلَغَ الصَّبِيُّ أَوِ الصَّبِيَّةُ عَشْرَ سِنِينَ يَجِبُ التَّفْرِيقُ بَيْنَهُمَا وَبَيْنَ أَخِيهِ وَأُخْتِهِ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ فِي الْمَضْجَعِ، لِقَوْلِهِ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ: «وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرٍ».
‘ছেলে বা মেয়ে দশ বছর বয়সে পৌঁছালে ঘুমানোর বিছানায় তার সঙ্গে ভাই-বোন, মা ও বাবার বিছানা পৃথক করতে হবে। কেননা, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তারা দশ বছর বয়সে পৌঁছালে তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।’ (আদ-দুররুল মুখতার মা‘আ রদ্দিল মুহতার, ৩/৩৮২)
ফিকহি আলোচনায় বিছানা পৃথক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই সামর্থ্য থাকলে সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই আলাদা বিছানায় ঘুমানোর অভ্যাস করানো উত্তম। বিশেষত দশ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর এ নির্দেশকে গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা উচিত।
এখানে বিছানা আলাদা করার অর্থ সব ক্ষেত্রে আলাদা ঘরে ঘুমানো নয়; বরং প্রত্যেকের ঘুমানোর স্থান বা বিছানা পৃথক রাখা। পরিবারের বাসস্থানের সীমাবদ্ধতা থাকলেও একই বিছানায় ঘুমানোর পরিবর্তে পৃথক বিছানার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা উচিত।
মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের ঘুমানোর বিষয়টি
শিশু ছোট থাকলে তার নিরাপত্তা, পরিচর্যা ও প্রয়োজনের কারণে মা-বাবার কাছাকাছি ঘুমানোর প্রয়োজন হতে পারে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিজের বিছানায় ঘুমানোর অভ্যাস করানো উচিত।
সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে—উভয়ের ক্ষেত্রেই শালীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। বয়স অনুযায়ী পোশাক পরিবর্তন, ঘুমানোর স্থান এবং ব্যক্তিগত পরিসরের বিষয়ে তাকে সচেতন করতে হবে।
অভিভাবকদের করণীয়
সন্তানের বিছানা আলাদা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা যেতে পারে—
১. ছোটবেলা থেকেই সম্ভব হলে সন্তানের জন্য পৃথক বিছানার ব্যবস্থা করুন।
২. সাত বছর বয়স থেকে পৃথক বিছানায় ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করুন।
৩. দশ বছর বয়সে পৌঁছালে বিছানা পৃথক করার নির্দেশ বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করুন।
৪. সন্তানদের মধ্যে শালীনতা, সতর রক্ষা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার শিক্ষা দিন।
৫. সন্তানকে ভয় দেখিয়ে নয়, বরং ভালোবাসা ও যুক্তি দিয়ে নতুন অভ্যাসে অভ্যস্ত করুন।
ইসলাম সন্তান প্রতিপালনে শালীনতা, সতর রক্ষা ও ব্যক্তিগত সীমারেখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। হাদিসে দশ বছর বয়সে সন্তানদের বিছানা আলাদা করার নির্দেশ এসেছে। সাত বছর বয়সের একটি বর্ণনাও এ বিষয়ে উল্লেখ করা হয়, যদিও তার গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করে দলিল হিসেবে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
অতএব, অভিভাবকদের উচিত সামর্থ্য অনুযায়ী ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে পৃথক বিছানায় ঘুমানোর অভ্যাস করানো এবং দশ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগেই এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে শিশুর মধ্যে শালীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও ইসলামী আদবের চর্চা গড়ে তোলা সম্ভব।
এসএইচ/