রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ।। ২ কার্তিক ১৪৩৩ ।। ৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :
মুফতি নাসরুল্লাহ বদরের এতিম সন্তানদের পাশে আস-সুন্নাহ, দিলো বড় অনুদান সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাব অনুমোদন দিল মন্ত্রিসভা  ঢাকাই মসলিনের গবেষণায় সর্বোচ্চ সহায়তা দেবে সরকার: প্রতিমন্ত্রী পাঠ্যবইয়ে প্রাণীর ছবি থাকলে শরিয়তের বিধান কী? সাভারে মহিলা মাদরাসায় হামলা, আতঙ্কে ছাত্রী-অভিভাবক কুমিল্লার বটগ্রাম মাদরাসার নতুন মুহতামিম মাওলানা জামালুদ্দীন জমি নিয়ে বিরোধে মসজিদের ইমামকে কুপিয়ে জখম শরীয়তপুর যুব জমিয়তের সভাপতি এনামুল, সম্পাদক তাজুল জুলাই সনদ উপেক্ষা করলে সংবিধান পুনর্লিখনের আন্দোলন: আমিরে মজলিস ইন্ডিয়া ইসলামিক একাডেমি দেওবন্দের প্রথম অফলাইন কেন্দ্র হচ্ছে তেলেঙ্গানায়

পাঠ্যবইয়ে প্রাণীর ছবি থাকলে শরিয়তের বিধান কী?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: আওয়ার ইসলাম

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক 

পাঠ্যবই, খাতা, পণ্য বা বিভিন্ন ব্যবহারিক সামগ্রীর গায়ে মানুষের কিংবা অন্য প্রাণীর ছবি থাকা অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় এসব বই টেবিলে রাখা থাকে কিংবা প্রয়োজনীয় পণ্য ঘরে সংরক্ষণ করা হয়। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এসব জিনিসে প্রাণীর ছবি থাকা এবং তা ঘরে দৃশ্যমান অবস্থায় রাখার শরয়ি বিধান কী? এ ক্ষেত্রে ছবির কারণে সংশ্লিষ্ট জিনিস ব্যবহার করা নাজায়েজ হয়ে যাবে কি না?

ইসলামি শরিয়তে প্রাণীর ছবি তৈরি ও প্রদর্শনের ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। তবে কোনো জিনিসে ছবি থাকা, ছবি তৈরি করা এবং ছবি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে কোনো জিনিস রাখা—এগুলো এক বিষয় নয়। প্রয়োজনীয় পাঠ্যবইয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে ছবি থাকা এবং ছবি সাজিয়ে প্রদর্শনের মধ্যে ফিকহি পার্থক্য রয়েছে।

ঘরে প্রাণীর ছবি রাখা সম্পর্কে হাদিস

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيهِ تَمَاثِيلُ أَوْ تَصَاوِيرُ

‘যে ঘরে প্রতিকৃতি বা ছবি রয়েছে, সে ঘরে ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১১২)

অন্য একটি বর্ণনায় হজরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে,

نَهَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَنِ الصُّورَةِ فِي الْبَيْتِ، وَنَهَى عَنْ أَنْ يُصْنَعَ ذَلِكَ

‘রাসূলে কারীম (সা.) ঘরে ছবি রাখতে এবং ছবি তৈরি করতে নিষেধ করেছেন।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৭৪৯)

এসব হাদিসের ভিত্তিতে ফকিহগণ প্রাণীর ছবি তৈরি ও তা সম্মানজনকভাবে প্রদর্শনের বিষয়ে কঠোর বিধান উল্লেখ করেছেন। তবে ছবির ধরন, আকার, অবস্থান এবং তা রাখার উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে কিছু ক্ষেত্রে বিধানের পার্থক্য রয়েছে।

পাঠ্যবইয়ে ছবি থাকলে কী করণীয়?

বর্তমান সময়ে অনেক পাঠ্যবইয়ের প্রচ্ছদে কিংবা ভেতরের পাতায় মানুষের ও বিভিন্ন প্রাণীর ছবি থাকে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রয়োজনে এসব বই ব্যবহার করতে হয়। সব সময় ছবিমুক্ত বিকল্প বই পাওয়া যায় না।

এ বিষয়ে দারুল ইফতা জামিয়া বনুরিয়া আলমিয়ার একটি ফতোয়ায় বলা হয়েছে, যেসব বই শিক্ষা ও পরীক্ষার প্রয়োজনে প্রয়োজনীয়, সেগুলোতে প্রাণীর ছবি থাকলে প্রয়োজনের কারণে এমন বই কেনাবেচার অবকাশ রয়েছে। কারণ, এসব ক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য বই কেনা বা ব্যবহার করা; ছবিটি নয়। তবে ছবিযুক্ত জিনিস এড়িয়ে চলা সম্ভব হলে সেটিই অধিক সতর্কতার দাবি রাখে।

ফতোয়াটিতে আরও বলা হয়েছে, কোনো জিনিসে ছবি গৌণভাবে যুক্ত থাকলে এবং সেটি কেনাবেচার মূল উদ্দেশ্য না হলে তার বিধান ছবিকে স্বতন্ত্রভাবে উদ্দেশ্য করে তৈরি বা বিক্রি করার মতো নয়।

ছোট ছবির বিধান

ব্যবহারিক কোনো জিনিসে প্রাণীর ছবি খুব ছোট হলে এবং দূর থেকে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে বোঝা না গেলে, এমন ছবি থাকার কারণে সংশ্লিষ্ট জিনিসের ব্যবহার সব ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। একইভাবে প্রয়োজনীয় পাঠ্যবইয়ের প্রচ্ছদে ছোট ছবি থাকলে এবং বইটি ছবি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে না রেখে পড়াশোনার জন্য ব্যবহার করা হলে, বিষয়টি ছবি সাজিয়ে প্রদর্শনের মতো নয়।

তবে ছোট ছবি থাকার কারণে ছবিটি তৈরি করার বিধানও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায় না। ছবি তৈরির হুকুম এবং ছবিযুক্ত কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার বা কেনাবেচার হুকুম পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।

ফিকহি মূলনীতি কী বলে?

ফিকহের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হলো,

يُغْتَفَرُ فِي التَّوَابِعِ مَا لَا يُغْتَفَرُ فِي غَيْرِهَا

‘যে বিষয়টি স্বতন্ত্রভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনুসারী বা গৌণ বিষয় হিসেবে তা ক্ষমাযোগ্য হতে পারে।’

এ মূলনীতির আলোকে ফকিহগণ কিছু ক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য ও গৌণভাবে যুক্ত বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তাই ছবিযুক্ত পাঠ্যবইয়ের ক্ষেত্রে দেখতে হবে, বইটি কি ছবির কারণে কেনা হচ্ছে, নাকি শিক্ষার প্রয়োজনেই কেনা হচ্ছে এবং ছবিটি কেবল অনুষঙ্গ হিসেবে রয়েছে?

ইবনে আবিদিন রহ.-এর রদ্দুল মুহতারসহ হানাফি ফিকহের বিভিন্ন গ্রন্থে প্রাণীর ছবি তৈরি এবং ছবিযুক্ত জিনিসের বিধান নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো জিনিসের হুকুম নির্ধারণে ছবির ধরন, স্পষ্টতা, আকার ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য বিবেচনা করা জরুরি।

তাহলে পাঠ্যবই টেবিলে রাখা যাবে?

পাঠ্যবইয়ের প্রচ্ছদে ছোট প্রাণীর ছবি রয়েছে—শুধু এ কারণে বইটি টেবিলে রাখা বা পড়াশোনার প্রয়োজনে ব্যবহার করাকে ছবি প্রদর্শনের সমতুল্য বলা যাবে না। বিশেষত বইটি যখন শিক্ষার প্রয়োজনে রাখা হয়েছে, ছবিটি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য নয় এবং ছবিমুক্ত বিকল্প পাওয়া যাচ্ছে না, তখন প্রয়োজনের বিবেচনায় বইটি ব্যবহার করার অবকাশ রয়েছে।

তবে সম্ভব হলে ছবিমুক্ত বই বেছে নেওয়া, বইয়ের প্রচ্ছদ এমনভাবে রাখা যাতে ছবিটি প্রদর্শিত না হয় এবং অপ্রয়োজনে ছবিযুক্ত জিনিস সাজিয়ে না রাখা উত্তম। ছবিযুক্ত কোনো জিনিসের ব্যবহার নিয়ে বিশেষ পরিস্থিতিতে সংশয় দেখা দিলে নির্দিষ্ট ছবির ধরন ও ব্যবহারের বিবরণ দিয়ে নির্ভরযোগ্য মুফতির পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

সারকথা, প্রাণীর ছবি তৈরি ও তা প্রদর্শনের ব্যাপারে শরিয়তে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে শিক্ষার প্রয়োজনীয় বইয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে থাকা ছবি এবং ছবি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে রাখা ছবির বিধান এক নয়। প্রয়োজনীয় পাঠ্যবইয়ে ছবি থাকার কারণে বইটির ব্যবহার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাজায়েজ হয়ে যায় না। আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক অবগত।

এসএইচ/ 


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ