শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬ ।। ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ ।। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮


জমজম কূপের উৎসধারা

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: এ আই

আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগের কথা। মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও খলিল, হজরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ছিলেন তাওহীদের মহান দাঈ। আল্লাহর আদেশের সামনে তাঁর নিজের ইচ্ছা, অনুভূতি কিংবা পার্থিব সম্পর্কের কোনো মূল্য ছিল না। আল্লাহ তা’আলা তাঁর এই অতুলনীয় আনুগত্য ও ভালোবাসার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে খলিলুল্লাহ—‘আল্লাহর বন্ধু’—উপাধিতে ভূষিত করেন। 

হজরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) প্রথমে হজরত সারাহ (আলাইহাস সালাম)-কে বিবাহ করেন। দীর্ঘদিন তাঁদের কোনো সন্তান না-হওয়ায় সারাহ (আলাইহাস সালাম)-এর পরামর্শে তিনি হজরত হাজেরা (আলাইহাস সালাম)-কে বিবাহ করেন। পরে মহান আল্লাহর অসীম কুদরতে তাঁদের বার্ধক্যে দুই পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেন। সারাহ (আলাইহাস সালাম)-এর গর্ভে জন্ম নেন হজরত ইসহাক (আলাইহিস সালাম) এবং হাজেরা (আলাইহাস সালাম)-এর গর্ভে জন্ম নেন হজরত ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)। সে সময় তাঁদের আবাস ছিল কেনআন অঞ্চলে, যা বর্তমান ফিলিস্তিনের অন্তর্ভুক্ত।

অতঃপর মহান আল্লাহ হজরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করলেন। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হলো—স্ত্রী হাজেরা (আলাইহাস সালাম) ও দুগ্ধপোষ্য শিশু ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে এমন এক জনমানবশূন্য উপত্যকায় রেখে আসতে হবে, যেখানে নেই কোনো জনবসতি, নেই কৃষিজমি, নেই পানির উৎস।

আল্লাহর আদেশের সামনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না-করে তিনি স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে সঙ্গে নিয়ে বর্তমান মক্কা মুকাররমার সেই নির্জন, অনুর্বর উপত্যকায় পৌঁছে দিলেন। সঙ্গে ছিল সামান্য কিছু খেজুর ও অল্প একটু পানি। এরপর আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে তিনি ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন।

বিদায়ের মুহূর্তে হজরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর দরবারে যে হৃদয়স্পর্শী দু’আ করেছিলেন, তা পবিত্র কুরআনে সংরক্ষিত রয়েছে—

"হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার কিছু সন্তানকে তোমার সম্মানিত ঘরের নিকট এক অনাবাদী উপত্যকায় বসবাস করিয়েছি, যাতে তারা সালাত কায়েম করে। অতএব, মানুষের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে দাও এবং তাদের ফল-ফলাদি দ্বারা রিজিক দান করো, যাতে তারা তোমার শোকর আদায় করতে পারে।"(সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৩৭)

কিছুদিন পর সঙ্গে থাকা খাদ্য ও পানি সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেল। তীব্র পিপাসায় কাতর হয়ে উঠলেন মা ও শিশু। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় শিশু ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) ছটফট করতে লাগলেন। সন্তানের এই অসহায় অবস্থা দেখে হজরত হাজেরা (আলাইহাস সালাম) স্থির থাকতে পারলেন না।

তিনি পানির সন্ধানে নিকটবর্তী সাফা পাহাড়ে ওঠলেন। চারদিকে তাকালেন, কিন্তু কোথাও পানির কোনো চিহ্ন নেই। দূরে মারওয়া পাহাড়ের দিকে মরীচিকার ঝিলিক দেখে তিনি দ্রুত সেখানে ছুটে গেলেন। কিন্তু কাছে গিয়ে বুঝলেন, সেটি কেবল মরুভূমির মরীচিকা।

তিনি আবার সাফায় ফিরে এলেন। এভাবে একবার নয়, দু'বার নয়—মোট সাতবার সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে ছুটে চললেন। আজ হজ ও উমরাহর সাঈ এই স্মরণীয় ঘটনারই অনুসরণ।

অবশেষে তাঁর ধৈর্য, তাওয়াক্কুল ও আকুল প্রার্থনা মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হলো।

হজরত হাজেরা (আলাইহাস সালাম) হঠাৎ একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন। চারদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না-পেয়ে বললেন,

"আপনার আওয়াজ আমি শুনেছি। যদি সাহায্য করার জন্য এসে থাকেন, তবে আমাকে সাহায্য করুন।"

অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতাকূলের সরদার হযরত জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) আগমন করলেন।

সহিহ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি আল্লাহর নির্দেশে ভূমিতে আঘাত করলেন। অন্য কিছু বর্ণনায় এসেছে, শিশু ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর পায়ের গোড়ালির নিকট থেকেই আল্লাহর কুদরতে পানির উৎস প্রকাশিত হয়। উভয় বর্ণনার সারমর্ম একটিই—এটি ছিল মহান আল্লাহর এক অলৌকিক নিদর্শন এবং তাঁর অসীম রহমতের প্রকাশ।

মুহূর্তের মধ্যেই শুষ্ক ভূমি বিদীর্ণ হয়ে সেখান থেকে স্বচ্ছ, সুমিষ্ট পানির ধারা প্রবাহিত হতে শুরু করল।

হজরত জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) হজরত হাজেরা (আলাইহাস সালাম)-কে বললেন,

"ভয় করবেন না। এই পানি থেকে আপনি পান করুন এবং আপনার সন্তানকেও পান করান। আল্লাহ আপনাদের ধ্বংস করবেন না। এখানে আল্লাহর একটি ঘর নির্মিত হবে। এই শিশুই একদিন তাঁর পিতার সঙ্গে সেই ঘর পুনর্নির্মাণ করবে। অচিরেই এ স্থান জনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠবে।"

আল্লাহর এই অশেষ অনুগ্রহে হযরত হাজেরা (আলাইহাস সালাম) আনন্দে আপ্লুত হয়ে প্রথমে শিশু ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে পানি পান করালেন, তারপর নিজেও পান করলেন।

পানি যাতে চারদিকে ছড়িয়ে না-পড়ে, সে জন্য তিনি দ্রুত চারপাশে বালু ও পাথর দিয়ে ছোট্ট বাঁধের মতো তৈরি করতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন—

"জম, জম" অর্থাৎ, "থামো, থামো।"

এ থেকেই এ কূপের নাম হয় জমজম।

সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, যদি সেদিন হজরত হাজেরা (আলাইহাস সালাম) পানির চারদিকে বাঁধ না-দিতেন, তবে জমজম একটি প্রবাহমান নদীতে পরিণত হতো।

এরপর ধীরে ধীরে জুরহুম গোত্র সেখানে বসতি স্থাপন করে। বহু বছর পরে হজরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) মহান আল্লাহর নির্দেশে পবিত্র কাবা শরীফ পুনর্নির্মাণ করেন। সেই থেকে মক্কা মানবজাতির জন্য হিদায়াত, ইবাদত ও তাওহীদের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়।

আজও হাজার হাজার বছর পর পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ এই বরকতময় জমজমের পানি পান করছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, এত দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এর উৎস শুকিয়ে যায়নি। মহান আল্লাহর কুদরতে এটি আজও অবিরাম প্রবাহিত হচ্ছে—তৃষ্ণার্ত হৃদয়কে তৃপ্ত করছে, আর যুগে যুগে মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে আল্লাহর অসীম রহমত, কুদরত এবং তাঁর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুলের অনন্য শিক্ষা।

মূল: মাওলানা আব্দুর রহমান কাওসার মাদানী

অনুবাদ: শরিফ হাসানাত  

 

 


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ