শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬ ।। ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ২৬ জিলহজ ১৪৪৭

শিরোনাম :
চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী লাইসেন্স বাতিলের প্রতিবাদে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রোগীর স্বজনদের বিক্ষোভ বিতর্কিত শিবমূর্তি অপসারণের দাবিতে রাজধানীতে খেলাফত আন্দোলনের বিক্ষোভ সাবেক এমপি বাহারের বক্তব্যের প্রতিবাদ, দেশে এনে বিচারের দাবি আলেমদের প্রস্তাবিত বাজেট ঋণনির্ভর ও উচ্চাভিলাসী: খেলাফত মজলিস আশাবাদে ভারাক্রান্ত সুলিখিত বাজেট, বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ: ইসলামী আন্দোলন কুমিল্লা ও নগরকান্দায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রশিক্ষণ সভা অনুষ্ঠিত হিল্লার নামে ‘পাতানো বিয়ে’ কবিরা গুনাহ: মাওলানা আজহারী বৃহৎ রামমূর্তি নির্মাণ নিয়ে উদ্বেগ, দ্রুত অপসারণ চান পীর সাহেব মধুপুর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার চায় ইসলামী আন্দোলন

হিল্লা বিয়ে: ইসলাম কী বলে

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| আল আমীন বিন সাবের আলী ||

শিরোনাম দেখে অনেকে সংশয়-সন্দেহে পড়তে পারেন যে, হিল্লা বিয়ে আবার কোনটা? এতদিন যে বিয়ে-শাদি দেখে আসছি, সেটা কী? জী, তাদের জন্যই আজকের এই প্রয়াস। প্রথমে জানব সচরাচর বিয়ে সম্পর্কে। তারপরে জানব হিল্লা বিয়ে এবং সে সম্পর্কে ইসলামি নির্দেশনা।

* বিয়ে মূলত আদর্শ পরিবার গঠন, জৈবিক চাহিদা পূরণ, মানসিক প্রশান্তি ও মানব বংশ বৃদ্ধিসহ জীবনকে পরিশীলিত, মার্জিত ও পবিত্র করা এবং পারিবারিক জীবনে সুখ শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পরস্পরের মধ্যে অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের অপরিহার্যতা আরোপিত হয় এমন একটি বন্ধন। এ বন্ধনের সূচনা হয় একাধিক সাক্ষীর উপস্থিতিতে দেনমোহর ধার্য করত নারী-পুরুষের মধ্যকার ইজাব কবুল বিনিময়ের মাধ্যমে। আর এ বিয়েকেই উৎসাহিত করেছেন স্বয়ং রব্বুল আলামিন। যেমনটি ইরশাদ হয়েছে, 'আরেকটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন। যাতে তোমরা তাদের কাছে গিয়ে প্রশান্তি লাভ কর। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করে দিয়েছেন পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া'। (সূরা রোম, ২১) 'তারা–স্ত্রীরা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা–স্বামীরা তাদের পোশাক স্বরূপ' (সূরা বাকারা, ১৮৭) 'তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে বিহীন তাদের বিয়ে সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ তাদেরও। তারা যদি নিঃস্ব হয় তবে আল্লাহ তা'আলা নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছল করে দিবেন'। (সূরা নূর, ৩২) এ বিয়েতে উৎসাহিত করেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও। তিনি ইরশাদ করেন, 'বিবাহ সম্পাদন করা আমার সুন্নত, যে আমার সুন্নত মোতাবেক আমল করবে না সে আমার দলভুক্ত নয়'। (ইবনে মাজাহ, ১৫০৮) 'যে ব্যক্তি বিয়ে করল সে তার ঈমানের অর্ধাংশ পূর্ণ করলো, সে যেন বাকি অর্ধাংশের ব্যাপারে তাকওয়া অবলম্বন করে চলে'। (তাবরানি, ৭৬৪৭) 'হে যুব সম্প্রদায়, তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে নেয়। কারণ, এটি দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে। আর যারা সামর্থ্য রাখে না, তারা যেন রোজা রাখে। কারণ, রোজা তাদের জন্য ঢালস্বরূপ'। (বুখারি, ৫০৬৬)

হিল্লা বিয়ের হুকুম ও সুরত

* আরেক প্রকার বিয়ে আছে, যার নাম হিল্লা বিবাহ। এই প্রকার বিবাহ সম্পাদন করা মাকরুহে তাহরিমি। (ফতোয়ায়ে শামী, ৩/৪১৫) এ ব্যাপারে ইসলামি শরিয়ত নিরুৎসাহিত করেছে। শুধু তাই নয়, বরং এ কাজ সম্পাদনকারী ও সম্পাদনকৃতের জন্য রাসূল সা. লানতেরও ঘোষণা দিয়েছেন। (তিরমিজি, ১১২০) এ বিয়েকে নিরুৎসাহিত করতে রাসূল সা. একটি মন্দ উপমাও দিয়েছেন এবং শেষে আল্লাহ তায়ালারও লানতের কথা জানিয়েছেন। উকবা ইবনে আমের রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সা. বলেছেন, আমি কি তোমাদের ধার করা পাঁঠা সম্পর্কে অবহিত করবো না? তারা বললেন, জী, হে আল্লাহর রসুল। তিনি বলেন, সে হলো তাহলিলকারী (হিল্লা বিয়ে করে যে)। আল্লাহ তাহলিলকারী এবং যার জন্য তাহলিল করা হয় তাদের উভয়কে অভিসম্পাত করেছেন। (ইবনে মাজাহ, ৩/১৯৩৬)

সুরত : প্রথমোক্ত বিবাহের পর সংসার সুখময় হয় স্বামী স্ত্রী দুজনের গুণে। কোনো একজনের বা দুজনেরই গুণ যখন দোষে পরিণত হয়, এবং ধীরে ধীরে তা সীমা অতিক্রম করতে থাকে তখনই সে সংসার ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। বনিবনা না হতে হতে একপর্যায়ে তা বিচ্ছেদে রূপান্তরিত হয়। সে বিচ্ছেদের শরয়ি রূপরেখা হলো শরিয়ত সম্মত উপায়ে তালাক প্রদান বা গ্রহণ করা। এ ক্ষেত্রে নিয়ম হলো, ইসলাহের জন্য সর্বোচ্চ দুটি তালাক পর্যন্ত (ধাপে ধাপে) ব্যবহার করতে পারবে। (সূরা বাকারা, ২২৯) তিন নাম্বারটা প্রয়োগ করার আগ পর্যন্ত ফিরিয়ে নিয়ে সংসারেও নিয়মিত হওয়া যায়। তিন নাম্বার তালাক (একসঙ্গে বা ধাপে ধাপে) কেউ দিল মানে সে বিষ পান করল। সেটা সে বুঝে করুক বা না বুঝে করুক। হুঁশ থাকুক বা না থাকুক। বিষ তার ক্রিয়া প্রয়োগে যেমন থেমে থাকে না, তেমনি তিন তালাক দিয়ে দিলেও তার ক্রিয়া সংসার যত বছরেরই হোক তাকে একেবারে শেষ করে দেয়। তারা পরস্পরে আজনবি হয়ে যায়। তারা আর স্বামী স্ত্রী থাকে না। ফলে একসাথে সংসার করারও সুযোগ সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়।

একান্তই কোনো স্বামী স্ত্রী যদি পূর্বোক্ত সংসারে ফিরতে চায় তাহলে স্ত্রীর জন্য প্রথমে বিবাহোত্তর ইদ্দত পালন করতে হবে। তার এই ইদ্দত শেষে অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বসতে হবে। বিবাহের পর সেই স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যদি পূর্ণ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তারপর জীবনের কোনো বাস্তবতায় গিয়ে তাদের মাঝে তালাক সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে আবারো যথারীতি ইদ্দত পালনের পর ওই নারীর সঙ্গে তার পূর্বের স্বামীর বিবাহ সংঘটিত হওয়া বৈধ। (সূরা বাকারা, ২৩০। বুখারি, ৫০১১)

কেউ যখন পরিকল্পিতভাবে ন্যূনতম সময়ের মধ্যে উপরোক্ত কাজগুলো করিয়ে নিতে চায় বা করিয়ে নেয় তাহলে সেটাকেই বলা হয় ‘হিল্লা বিবাহ’ বা 'কন্টাক্ট ম্যারেজ'। আরবী ‘হিলা’ শব্দের অর্থ কৌশল। কৌশলী এ বিবাহটিই আমাদের সমাজ ও মিডিয়ায় ‘হিল্লা বিয়ে’ নামে পরিচিত। এটা ইসলামের বিধিবদ্ধ কোনো অনুশাসন নয়। এটা এ বিয়ের নাম থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায়। কেননা ইসলামে কৌশলমুক্ত ও কৌশলযুক্ত বিবাহ বলতে কিছু নেই। এতদসত্ত্বেও এ ধরনের বিবাহ সংঘটিত হয়ে যথানিয়মে বিচ্ছিন্ন হলে এই নারীকে যে আগের স্বামী বিয়ে করতে পারেন –এ বিধানটির কোনো তারতম্য এতে ঘটে না। ওলামায়ে কেরাম শরিয়তের উক্ত সমাধানটি পেশ করে থাকেন। ফলে এ বিষয়ে অনভিজ্ঞ অনেকে আপত্তি তুলে বলে যে, এটা সামাজিক চাপের কারণে হয়ে থাকে। অতএব আইন করে এটা বন্ধ করে দেওয়া উচিত। তাদের প্রতি বিণিত জিজ্ঞাসা হলো, সামাজিক চাপ যদি না থাকে আর বিয়ে যদি আরেকটি না হয় তাহলে কি তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর সঙ্গে স্বামী এক সঙ্গে  ঘর করতে পারবেন? ইসলামী শরীয়তের আলোকে তো এ প্রশ্নের জবাব ‘হ্যাঁ’ হতে পারে না। তালাকদাতা স্বামী বা তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী এটা মেনে নিয়ে কি বাকী জীবন বিচ্ছিন্ন জীবন-যাপন করতে সম্মত থাকবেন? তারা সম্মত থাকলে তো এ বিষয়ে কোনো সমস্যাই থাকে না। তাহলে হিল্লা বিয়েও বন্ধ হবে, এক সঙ্গে ঘর করাও বন্ধ হবে। আর যদি বিচ্ছিন্ন থাকতে তারা সম্মত না হন, তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়ায়? তিন তালাকও হবে, দ্বিতীয় কোনো ধরনের বিয়েও হবে না এবং এক সঙ্গে ঘর-সংসারও হবে। নাউজু বিল্লাহ! যে ইসলামী বিধান অনুযায়ী সংসারের সূচনা, অবৈধ ও অনৈতিক যৌনাচার থেকে বেঁচে সুন্দর-সুষ্ঠু দাম্পত্য জীবন অবলম্বনের জন্য যে অনুশাসন ও নীতির আশ্রয় গ্রহণ –এতে কি তার কোনো কিছু রক্ষা হয়? নিজেরা আইন করে এটা ঠিক, ওটা বেঠিক বলে দিলেই কি দাম্পত্যের পবিত্রতা বজায় থাকবে? রুচিহীন হিল্লা বিয়ে বন্ধ করার এবং এর জন্য ইসলামী অনুশাসন ‘ফতোয়া’ নিয়ে বিষোদগার করার সময় এ প্রশ্নগুলো সামনে রাখলে উত্তর পেতে সহজ হবে। আরো আগে থেকে যদি আমরা ভাবতে চেষ্টা করি তাহলে দেখব এর মূল হচ্ছে, শরীয়তের বিধান না মেনে এক সঙ্গে তিন তালাক দিয়ে দেওয়া। পবিত্র কুরআন হাদিসে কঠোরভাবে নিষেধ করা হলেও এ ধরনের ‘তিন তালাক’ থেকেই এসব সমস্যার উৎপত্তি। ঠাণ্ডা মাথায় পর্যায়ক্রমে তিন তালাক কার্যকর করার যে বিধান ইসলামে রয়েছে সে বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করলে এ ধরনের সমস্যারই সৃষ্টি হতে পারে না। যেহেতু শরীয়তের দৃষ্টিতে চরম অপছন্দনীয় হওয়া সত্ত্বেও তিন তালাক এক সঙ্গে দিলে তালাক হয়েই যায় এবং চুড়ান্ত বিচ্ছিন্নতা সম্পন্ন হয়, সেজন্য তিন তালাক এক সঙ্গে দেওয়ার দরজা বন্ধ করার আইনী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এটা যেমন মানবিক, তেমনি শরীয়তসম্মত একটা পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হবে।

অতএব ‘ফতোয়া’ ও আলেম-উলামাদের প্রতি বিষোদগর না করে নারীর জন্য অবমাননাকর ও গ্লানিকর হিল্লা বিয়ে বন্ধ করতে হলে ‘এক সঙ্গে তিন তালাক’ দেওয়ার ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারিমূলক আইন ও পদক্ষেপ নেওয়াটাই হবে প্রধান কাজ। এর জন্য মাথা গরম, মূর্খ ও চরম অসংযত মানুষদের সামনে এক সঙ্গে তিন তালাকের বিষয়ে ভীতিকর কিছু আইনী ও বাস্তব পদক্ষেপ গৃহীত হলে এতে ঘর সংসার, নারীর সম্মান-মর্যাদা সুরক্ষিত হতে পারে বলে আমরা মনে করি। একজন বিষ খেয়েছে। পেট থেকে সে বিষ বের করার জন্য তাকে মল খাইয়ে বমি করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকে। ‘মল’ খাওয়ানোর মতো ঘৃণ্য ও বিড়ম্বনাকর বিষয়টি বন্ধ করে দিতে সোচ্চার হয়ে বিষ খাওয়ার দরজা খোলা রাখলে যা হওয়ার তাই হবে। সুতরাং বিষ খেতেই আগে বাধা দিতে হবে।

লেখক : পরিদর্শক, বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক)

প্রতিনিধি/আইও


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ