বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬ ।। ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ১ সফর ১৪৪৮


দৈনন্দিন জীবনে নবীজির (সা.) সুন্নাহ

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

|| শরিফ হাসানাত ||

সুন্নাহ অনুসরণ একজন মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব। এটি নবীপ্রেমের উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। সুন্নাহ ঈমানের পূর্ণতার নিদর্শন। এতে নিহিত রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর এটাই আখিরাতের সফলতার চাবিকাঠি। মানুষের জীবনের প্রতিটি কাজে জড়িয়ে আছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ। দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জীবন চলার পূর্ণ পথনির্দেশনা রয়েছে এতে। আলোকিত জীবন গঠনের এক নির্মল অভ্যাস এটি। সুন্নাহ মানুষের বাহ্যিক আচরণ যেমন শুদ্ধ করে, তেমনি আলোকিত করে তার অন্তরও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুসরণ করলে প্রতিটি বৈধ কাজই ইবাদতে পরিণত হয়। সওয়াব লাভের এটি এক সহজ ও সুন্দর মাধ্যম। তাই প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণের নির্দেশ কুরআনেও এসেছে।

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

"নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে—তাদের জন্য, যারা আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।" (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:২১)

আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের অন্যতম শর্তও হলো নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,

"আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো, তবে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আল-ইমরান, ৩:৩১)

মুমিনের জীবনের অপরিহার্য অংশ সুন্নাহ অনুসরণ। এর ফজিলতও অপরিসীম। এটি নবীজির প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার প্রকাশ এবং জান্নাত লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

"যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহকে ভালোবাসে, সে আমাকে ভালোবাসে। আর যে আমাকে ভালোবাসে, সে জান্নাতে আমার সঙ্গে থাকবে।" (জামে তিরমিজি)

আরেক হাদিসে তিনি বলেন,

"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।"

(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এমন অনেক ছোট ছোট সুন্নাহ রয়েছে, যেগুলো আমরা প্রতিদিন খুব সহজেই আমল করতে পারি। জীবনের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন কয়েকটি সুন্নাহ হলো—

সর্বাবস্থায় সালাম প্রচলন : সালাম শুধু পরিচিতদের নয়, পরিচিত-অপরিচিত সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া সুন্নাহ। সালামের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে মুহাব্বাত ও হৃদ্যতা বৃদ্ধি পায়। কঠিন হৃদয়ও নরম হয়ে যায়। অথচ আজ আমরা এই সুন্নাহ থেকে অনেক দূরে সরে গেছি। ব্যস্ত হয়ে পড়েছি বিজাতীয় 'হাই-হ্যালো' সংস্কৃতিতে। অথচ ইসলামের রয়েছে শান্তি ও কল্যাণের সম্ভাষণ—সালাম।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৪)

হাসিমুখে মানুষের সঙ্গে কথা বলা : সুখ-দুঃখ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই মানুষের সঙ্গে কটু কথা বলা উচিত নয়। ছোট-বড়, ধনী-গরিব—সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা ইসলামের শিক্ষা। অনেকেই এটিকে সাধারণ সৌজন্য মনে করেন, অথচ এটি একটি সুন্নাহ এবং সদকা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "তোমার ভাইয়ের প্রতি হাসিমুখে তাকানোও সদকা।" (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৬)

পরিবারের কাজে সহযোগিতা করা : পুরুষের কর্মস্থল বাইরে—অফিস, দোকান বা ব্যবসা-বাণিজ্য। পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব সাধারণত তার ওপরই ন্যস্ত। আর নারীর প্রধান কর্মক্ষেত্র হলো অন্দরমহল। রান্নাবান্না, সন্তান লালন-পালন ও সংসারের অভ্যন্তরীণ কাজ তিনি পরিচালনা করেন। এটাই ইসলামী পারিবারিক ব্যবস্থার সাধারণ রীতি। তবু কর্মস্থল থেকে ফিরে স্ত্রীর কাজে সহযোগিতা করা, পরিবারের কাজকে ছোট মনে না করা এবং প্রয়োজনে নিজ হাতে কাজ করা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্দর সুন্নাহ।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পরিবারের কাজকর্মে সহযোগিতা করতেন।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৬)

উপহার বিনিময় করা : মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বসবাস করতে হলে একে অন্যের সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রয়োজন। পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার মাধ্যমেই একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে ওঠে। মানুষের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে ইসলাম উপহার বিনিময়ের শিক্ষা দিয়েছে। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহটি আজ অনেকটাই অবহেলিত। হাদিয়া মানুষের অন্তরে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা বৃদ্ধি করে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "তোমরা পরস্পর উপহার আদান-প্রদান করো; এতে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।" (আল-আদাবুল মুফরাদ)

অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া : সুস্থতা আল্লাহ তাআলার এক মহামূল্যবান নিয়ামত। আর রোগ-ব্যাধির মাধ্যমে তিনি তাঁর বান্দার ধৈর্য পরীক্ষা করেন এবং গুনাহ মাফের ব্যবস্থা করেন। তাই অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। অথচ আজ একই ভবনে বসবাস করেও আমরা অনেক সময় একে অপরের খোঁজ রাখি না। ইসলামের এই সুন্দর শিক্ষা থেকে আমরা অনেক দূরে সরে গেছি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "এক মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের ছয়টি অধিকার রয়েছে... তার একটি হলো, সে অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাবে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৬২)

কম কথা বলা ও ভালো কথা বলা : ছুরির আঘাত একদিন শুকিয়ে যায়, কিন্তু কথার আঘাত মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন থেকে যায়। মতবিরোধ হতেই পারে, কিন্তু কাউকে কটু কথা বা বাক্যবাণে আঘাত করা ইসলামের শিক্ষা নয়। বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই সুন্নাহ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। ভালো কথা বলাও ইবাদত। আর ভালো কথা বলতে না পারলে নীরব থাকাই উত্তম।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৭)

রাগ সংযত করা : রাগ মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু রাগের বশবর্তী হয়ে অন্যায় কথা বা কাজ করা ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। প্রকৃত শক্তিশালী সে-ই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। পরিবার ও সমাজের অনেক বিরোধের মূলেই রয়েছে অনিয়ন্ত্রিত রাগ।

এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উপদেশ চাইলে তিনি বারবার বলেন, "রাগ করো না।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৬)

নিয়মিত মিসওয়াক করা : ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার অন্যতম উত্তম উপায় হলো মিসওয়াক। এটি শুধু দাঁত ও মুখ পরিষ্কার রাখে না; বরং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। অথচ ব্যস্ত জীবনে এই সহজ ও বরকতময় আমলটি অনেকটাই অবহেলিত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "মিসওয়াক মুখকে পবিত্র করে এবং রবের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।" (সুনানে আন-নাসায়ি, হাদিস: ৫; সহিহ)

নবীজির সুন্নাহ মুসলমানের জন্য সর্বোত্তম জীবনপদ্ধতি। জীবনের ছোট-বড় প্রতিটি কাজে সুন্নাহ অনুসরণ করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়, চরিত্র পরিশুদ্ধ হয় এবং সমাজে কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই আসুন, আমরা শুধু সুন্নাহ সম্পর্কে জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। কেননা সুন্নাহ অনুসরণই ঈমানের সৌন্দর্য, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখিরাতের সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গঠনের তাওফিক দান করুন। আমীন।

এসএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ