|| মুফতি মুহাম্মদ উসামা হাবীব ||
রমজান পরবর্তী শাওয়াল থেকে শুরু হয়—হজের মৌসুম, বাইতুল্লাহ সফরের প্রস্তুতি। নতুন করে তীব্র হয়—মুমিন হৃদয়ের গহীনে সযতনে লালিত বাইতুল্লাহ জিয়ারতের স্বপ্ন, হজের প্রতি হৃদয়ের ঈমানি আকর্ষণ। হাদিসের পাতায়-পাতায় বর্ণিত হয়েছে হজের প্রতিটি অধ্যায় সম্পর্কে সুসংবাদ ও সতর্কবাণী। অগণিত বর্ণনা আছে এই বিষয়ে। হাদিসে এসেছে, ‘হজ্জে মাবরুর’-এর বিনিময় কেবল জান্নাত। জানতে চাওয়া হলো, ‘হজ্জে মাবরুর’-কী? তিনি বললেন, মানুষকে আহার করানো ও তাদের সাথে সুন্দর কথা বলা। (মুসনাদে আহমদ: ১৪৫২২)
মুসনাদে বাজ্জারের এক বর্ণনায় এসেছে, হজ পালনকারী ব্যক্তি সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর মতো গুনাহ থেকে মুক্ত। নির্মল।
ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি পালনে আমরা প্রধানত ভয় পাই—দারিদ্র্যের। অথচ নিয়মিত হজ-ওমরাহ আদায়কারীর সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমরা ধারাবাহিক হজ-ওমরাহ করতে থাক। কেননা এই দুটি আমল দারিদ্র্য ও গুনাহকে শেষ করে দেয়। যেমন—কামারের হাপর লোহা, স্বর্ণ ও রুপার খাদ দূর করে দেয়। (তিরমিজি শরিফ: ৮১০)
অন্য বর্ণনায় আছে, ‘হজ-ওমরা রিজিক ও হায়াত বৃদ্ধি করে।’ এর প্রতিটি কাজ সম্পর্কে—চাই তা যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন—আলাদা আলাদা বর্ণনা এসেছে। তালবিয়া সম্পর্কে বর্ণিত আছে—বাইতুল্লাহ সফরকারী যখন তালবিয়া পাঠ করে তখন তার ডান-বাম, আশপাশের পাথর, বৃক্ষ সব কিছু তার সঙ্গে তালবিয়া পাঠ করে। এমনকি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে গিয়ে তা শেষ হয়। (তিরমিজি শরিফ: ৮২৮)
মক্কা-মদিনার প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা বরকতে ভরপুর। জমজমের পানি সম্পর্কে বর্ণিত আছে বিখ্যাত এক হাদিস, ‘জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যেই পান করা হোক, সফলতা আসবেই। (ইবনে মাজা: ৩০৬২)
এই বরকতময় ইবাদত পালনে পুরস্কারের কথা যেভাবে বর্ণিত আছে হাদিসের পাতায় পাতায়; ঠিক একইভাবে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃত ছেড়ে দেওয়া ব্যক্তির শাস্তির ব্যাপারেও বর্ণনা আছে অগণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি হজ করল না, তার ব্যাপারে কোনো পরোয়া নেই। চাই সে নাসারা হয়ে মৃত্যুবরণ করুক অথবা ইহুদি হয়ে। (তিরমিজি শরিফ: ৮১২)
হাদিসের এ সকল বর্ণনা ও সালাফদের হৃদয় মথিত করা হজের ঘটনা শুনে মুমিন মাত্রই হৃদয়ে হজ-ওমরার প্রতি স্বপ্ন লালন করেন।
আধুনিক বিশ্বে মুসলিমদের মাঝে ওমরাহ সফরের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কারণ হতে পারে—যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি; খরচের সহজলভ্যতা; বা মানুষের জানার পরিধি বৃদ্ধি। পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে মানুষ ওমরার সফর বেশি করে। কিন্তু এত কিছুর মাঝেও লক্ষণীয় হলো—আমাদের সকল বন্দেগিই যেন হয়, খালেস আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য। আজকের অনলাইনের যুগে এটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষত বাইতুল্লাহর সফরের মতো সম্মানজনক ও প্রেমময় সফরের ক্ষেত্রে এটাতো আরও ক্ষতিকর। এমনকি—আমার এই ধারণা মিথ্যা হোক—অনেক ক্ষেত্রে তো মনে হয় আজকাল অনেকের বায়তুল্লাহ সফরের সুপ্ত উদ্দেশ্য থাকে লোকদেখানো। আল ইয়াজু বিল্লাহ!
অথচ কুরআনে লোকদেখানো ইবাদতকারীর শাস্তি সম্পর্কে কঠোর বার্তা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ধ্বংস ওই সকল নামাজ আদায়কারীর জন্য— যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ইবাদত করে। (সুরা মাউন: ৪-৬)
এক হাদিসে এসেছে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যে ফেতনার আশঙ্কা করি, তা হলো, ছোট শিরক অর্থাৎ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ইবাদত করা। আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন যখন মানুষকে তার কৃত আমলের জন্য পুরস্কৃত করবেন, তখন তিনি ওই সকল লোকেদের বলবেন, তোমরা ওদের কাছে যাও এবং চেষ্টা করো তাদের নিকট থেকে কোনো প্রতিদান পাও কি না, যাদেরকে দেখানোর জন্য ইবাদত করতে। (শুয়াবুল ঈমান: ৬৮৩১)
এ ক্ষেত্রে কুরআন-হাদিসের দলিলের পাশাপাশি যৌক্তিক কারণও আছে। যেমন, ইবাদত অনেক উঁচু বিষয়। মর্যাদার বিষয়। তাই ইবাদত করা উচিত—পরিপূর্ণ আবেগ ও যত্নের সাথে। এক্ষেত্রে হজের বিষয়টি তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা ব্যাপক হারে আরামপ্রিয় হয়ে গেছি। হজ-ওমরার পরবর্তী সময়ে আমাদের গল্পের প্রধান অংশই হয়ে থাকে—কে কতটুকু আরামদায়ক সময় কাটাতে পারলাম। অনেক সময় এটাকেই সফলতার মাপকাঠি মনে করা হয়। হজ পরবর্তী সময়ে অনেকের আফসোস দেখে এমনটাই মনে হয়। অথচ কুরআন-হাদিসে ওই ইবাদতকে সর্বোত্তম বলা হয়েছে, যা নিজে খেটে করা হয়। আরামপ্রিয়তা বা অন্যের সাহায্য নেওয়াকে অনুৎসাহিত করা হয়েছে। সাহাবা-তাবেয়ী ও সালাফদের জীবন থেকে আমরা এমন শিক্ষাই পাই।
অবশ্য এ ক্ষেত্রে ভিন্ন কথাও আছে। মুসতাদরাকে হাকেমের এক বর্ণনায় পদব্রজে হজ করার বিশেষ মর্যাদার কথাও বলা হয়েছে। সহিহ ইবনে খুজাইমার এক বর্ণনায় এসেছে, হজরত আদম আ. পুরো জীবনে এক হাজার বার হিন্দ থেকে বাইতুল্লাহর জিয়ারতে এসেছেন। কিন্তু একবারও তিনি বাহনে আরোহণ করেননি। (আল মাতজারুর রাবেহ: ৮১৩)
অতএব আমাদের উচিত, বর্তমানে অনেকের মাঝে যে প্রবণতা অধিক হারে দেখা যায় যে—একেবারে আবশ্যকীয় কাজগুলো নিজে করে, বাকি কাজ অন্যের সাহায্যে করা, আর নিজে হোটেলে আরাম করা—এমনটা না করে হারামের নিকট বেশি সময় ব্যয় করা উচিত। এবং হারামের সফরকে নিছক আনুষ্ঠানিকতা ও লোকদেখানো না বানিয়ে, নবীয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়া উচিত—যা হবে একেবারেই সাদাসিধে, বন্দেগির আমেজে সুসজ্জিত। এক হাদিসে এসেছে, হজরত আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (উটের পিঠে) একটি পুরাতন জিন ও পালানে উপবিষ্ট অবস্থায় হজ করেন। তাঁর পরিধানে ছিল একটি চাদর যার মূল্য চার দিরহাম বা তারও কম। অতঃপর তিনি বলেন, হে আল্লাহ, এ এমন হজ, যাতে কোনো প্রদর্শনের বা প্রচারের ইচ্ছা নেই। (ইবনে মাজাহ: ২৮৯০)
লেখক: প্রবন্ধকার, শিক্ষক, ইমাম ও খতিব
আইও/
