‘‘মুহাম্মাদ শোয়াইব‘‘
কাশ্মীর উপত্যকার বিভিন্ন মসজিদ ও সেগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাপক তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করেছে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। তবে বিষয়টিকে ষড়যন্ত্রের অংশ মনে করছেন মসজিদ কমিটির সদস্যরা। তাদের মতে, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর নীরব হস্তক্ষেপ। তারা এটিকে যতটা আইনি বিষয় মনে করছেন তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক নীরব হস্তক্ষেপ। তাদের বক্তব্য হলো, কারো বিরুদ্ধে কোনো মামলা না থাকলে এরকম স্পর্শকাতর পারসোনাল তথ্য সংগ্রহ করা আইনসম্মত নয়। এটি মূলত ভীতির সঞ্চার করারই উদ্দেশেই করা হয়ে থাকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কার্যক্রমের আওতায় শুধু মসজিদ নয়, বরং ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব, মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য এবং মসজিদ-সংযুক্ত দাতব্য সংস্থা বায়তুল মাল এর সদস্যদের তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় চার পৃষ্ঠার একটি ফরম বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি পৃষ্ঠা মসজিদসংক্রান্ত তথ্যের জন্য এবং বাকি তিন পৃষ্ঠা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত তথ্যের জন্য নির্ধারিত।
ফরমে মসজিদের ধর্মীয় মতাদর্শ বা মাজহাব যেমন বেরেলভি, হানাফি, দেওবন্দি বা আহলে হাদিস ইত্যাদি উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি আসন ধারণক্ষমতা, তলার সংখ্যা, নির্মাণ ব্যয়, অর্থায়নের উৎস, মাসিক বাজেট, ব্যাংক হিসাব, পরিচালনা কাঠামো এবং মসজিদ যে জমির ওপর নির্মিত, তা সরকারি, ব্যক্তিমালিকানাধীন (মিলকিয়াত) না যৌথ মালিকানাধীন (শামিলাত) এসব তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
এছাড়া মসজিদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে অত্যন্ত বিস্তারিত ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জন্মতারিখ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, যোগাযোগের তথ্য, পাসপোর্ট সংক্রান্ত তথ্য, বিদেশ সফরের ইতিহাস, প্রবাসী আত্মীয়দের তথ্য, ভোটার আইডি ও আধার নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেশন কার্ড এবং ব্যাংক হিসাবের বিবরণ।
তাদের মোবাইল ফোনের তথ্যও দিতে বলা হয়েছে, যেমন হ্যান্ডসেটের মডেল, আইএমইআই নম্বর, এটিএম ও ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, প্যান নম্বর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ও ইমেইল ঠিকানা। এমনকি মোবাইলে ব্যবহৃত অ্যাপগুলোর তালিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তার তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আর্থিক তথ্য হিসেবে মাসিক আয়-ব্যয়, সম্পত্তির মালিকানা ও সম্পদের আনুমানিক মূল্য উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বাবা-মা, ভাইবোন ও সন্তানদের তথ্যও ফরমে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ফরমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পূর্বে কোনো সশস্ত্র কার্যকলাপ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়েছে। এ ধরনের তথ্য সংগ্রহকে কেন্দ্র করে উপত্যকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
একটি মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে বলেন, এই উদ্যোগ “ধর্মীয় বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল”। তিনি বলেন, “এই প্রথম এমন কিছু দেখা যাচ্ছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করে তাদের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, ধর্মীয় বিশ্বাস, পারিবারিক তথ্য বা ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থায় হস্তক্ষেপ না করেও প্রয়োজন হলে পটভূমি যাচাই করা সম্ভব।
যদিও পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রমের কথা স্বীকার করেনি, তবে সূত্র জানিয়েছে এটি বেশ কিছুদিন ধরেই পরিকল্পনার আওতায় ছিল।
তবে ভারতের সংবিধানে Article 21রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর স্পষ্ট সাংবিধানিক সীমারেখা টেনে দেয়। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, “আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে তার জীবন বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।” সুপ্রিম কোর্টের ধারাবাহিক ব্যাখ্যায় “জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা” বলতে কেবল শারীরিক স্বাধীনতা নয়, বরং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মর্যাদা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং অযথা নজরদারি থেকে মুক্তির অধিকারও অন্তর্ভুক্ত।
২০১৭ সালে Justice K.S. Puttaswamy বনাম Union of India মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে Right to Privacy একটি মৌলিক অধিকার, যা Article 21-এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। অর্থাৎ মোবাইল ব্যবহার, ব্যাংক তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত তথ্য ইত্যাদি সবই সাংবিধানিক সুরক্ষার আওতায় পড়ে।
তবে হ্যাঁ পুলিশ মামলা ছাড়াও তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। তবে তা করতে হলে চারটি কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়।
প্রথমত, অবশ্যই নির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে (CrPC, IT Act, UAPA ইত্যাদি); মৌখিক নির্দেশ বা “রুটিন ভেরিফিকেশন” যথেষ্ট নয়।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রকে বৈধ উদ্দেশ্য প্রমাণ করতে হবে। যেমন জাতীয় নিরাপত্তা বা নির্দিষ্ট আইনশৃঙ্খলা হুমকি। কেবল ধর্মীয় পরিচয় বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকা কোনো বৈধ কারণ নয়।
তৃতীয়ত, Doctrine of Proportionality অনুযায়ী রাষ্ট্র যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই তথ্য নিতে পারবে। নির্দিষ্ট সন্দেহ ছাড়া IMEI নম্বর, অ্যাপের তালিকা, পরিবারের সম্পদ বা বিদেশে আত্মীয়ের তথ্য সংগ্রহ অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে গণ্য হতে পারে।
চতুর্থত, প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা থাকতে হবে। লিখিত আদেশ, তথ্য সংরক্ষণের সীমা ও অপব্যবহার রোধের ব্যবস্থা; এগুলো না থাকলে তা সরাসরি Article 21 লঙ্ঘন। আইনি দৃষ্টিতে, কোনো নির্দিষ্ট মামলা, FIR বা যুক্তিসংগত সন্দেহ ছাড়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আলাদাভাবে টার্গেট করে ব্যাংক, IMEI, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পরিবার বা সম্পদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হলে সেটি Article 21 ও গোপনীয়তার অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য। পাশাপাশি এখানে Article 25 (ধর্ম পালনের স্বাধীনতা) ও Article 26 (ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকার) ও প্রযোজ্য। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে আলাদা করে নজরদারির আওতায় আনা হলে সংবিধানের একাধিক অনুচ্ছেদ একসঙ্গে প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এমএন/