সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬ ।। ২২ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ২১ মহর্‌রম ১৪৪৮


দেওভোগ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী রহ.

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| মুফতি এনায়েতুল্লাহ ||

দেওভোগ মাদরাসা। নারায়ণগঞ্জের অন্যতম আলোচিত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম দেওভোগ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা হলেন আমাদের পরিবারের রাহবার, মুরুব্বি ও আমার উস্তাদ আল্লামা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী রহমাতুল্লাহি আলাইহি। আবার বাবা মাওলানা ইসলামাবাদীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলতেন। আমার নামকরণও তিনিই করেছেন। হুজুরের আদেশমূলক পরামর্শে আব্বাজান (রহ.) আমাকে মাদরাসায় ভর্তি করেন এবং আমার শিক্ষাজীবনে তিনিই ছিলেন শেষ কথা। হুজুরের সূত্র ধরে আমার আব্বা দেওভোগ মাদরাসার বদরি কমিটির সদস্য ছিলেন।

নানা কারণে দেওভোগ মাদরাসা আমাদের হৃদয়ে রক্ত ঝরিয়েছে। বিশেষ করে আল্লামা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী (রহ.)-এর চলে আসা এবং তার পরবর্তী নানা সময়ে মাদরাসার বিবাদ সামনে আসলে হৃদয়ে ব্যাথা অনুভব করি। এ ব্যাথা কবে উপশম হবে, আল্লাহতায়ালাই ভালো জানেন।

দেওভোগ মাদরাসা নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই নানা ধরনের দ্বন্দ্ব চলে আসছে। অনেক মামলা-মোকাদ্দমা হয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা বিভিন্ন সময়-নানাভাবে হস্তক্ষেপ করেছেন। বিশেষ করে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পর পর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভীর বাবা আলী আহাম্মদ চুনকা আল্লামা রিজাউল করীম ইসলামাবাদীকে নানাভাবে বিরক্ত করেছেন। কমিটি নিয়ে নানা সময় দ্বন্দ্ব হয়েছে, মুহতামিম নিয়োগ নিয়ে দ্বন্দ্ব হয়েছে। আজকেও আলোচনায় দেওভোগ মাদরাসা। সেই আলোচনার সূত্র ধরেই মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে নিয়ে এই লেখা।

বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব, দারুল উলুম দেওবন্দের সদরুল মুদাররিসিন, শায়খুল আরব ওয়াল আজম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানি রহমাতুল্লাহি আলাইহির যে কয়জন শিষ্য বাংলাদেশে কৃতিত্বের সঙ্গে ইলমে হাদিসের খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন- তাদের অন্যতম হলেন আল্লামা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী (রহ.)। তিনি একাধারে শায়খুল হাদিস, সাহিত্যিক, বাগ্মী ও খতিব হিসেবে সর্বমহলে সমাদৃত ছিলেন।

আল্লামা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী (রহ.) ছিলেন বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী। জীবনের পড়ন্ত বেলায় ৭৭ বছর বয়সেও তিনি চারটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। পুরাতন ঢাকার ইসলামপুর নবাববাড়ি জামে মসজিদের খতিব, জামিয়া আরজাবাদ ও কেরানীগঞ্জ চাঁন মিয়া ওয়াহ্হাবুল উলুম মাদরাসায় শায়খুল হাদিস এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সিরাত বিশ্বকোষ ও ইসলামি বিশ্বকোষ সম্পাদনা বোর্ডের অন্যতম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

চট্টগ্রামের পটিয়া থানার হরিণখাইন গ্রামে ১৯৩০ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। তারপর পটিয়া ও জিরি মাদরাসায় অধ্যয়ন করেন। জিরি মাদরাসায় শরহেজামী পড়ার সময়ে ১৯৪৭ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ গমন করেন। ১৩৭১ হিজরি সালে (১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে) দাওরায়ে হাদিসে প্রথম স্থান লাভ করে উত্তীর্ণ হন।

দারুল উলুম দেওবন্দে ইসলামাবাদী (রহ. )-এর সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয়। উস্তাদগণ তাকে খুবই স্নেহ করতেন। উত্তম চারিত্রিক গুণাবলী, অক্লান্ত পরিশ্রম, উস্তাদদের আনুগত্য ও খেদমতের কারণে সব উস্তাদের প্রিয়পাত্র ছিলেন। দেওবন্দ মাদরাসায় কোনো কোনো পরীক্ষায় উস্তাদগণ তাকে পূর্ণমান থেকে অধিক নম্বর দিয়েছেন।

দেওবন্দে তিনি সেখানে জগদ্বিখ্যাত আলেমদের সাহচর্য লাভ করে ধন্য হয়েছেন। তার উস্তাদরা ছিলেন উপমহাদেশের তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিস ও শায়খুল হাদিস। তার সবচেয়ে প্রিয় উস্তাদ ও ব্যক্তিত্ব ছিলেন শায়খুল আরব ওয়াল আজম আওলাদে রাসূল সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)। তার নিকট তিনি বোখারি শরিফ ও তিরিমিজি শরিফ ১ম খণ্ড পড়েছেন। হজরত মাদানি (রহ.) মদিনায় নবী কারিম (সা.)-এর রওজা মোবারকের পাশে ১৮ বছর হাদিসের দরস দিয়েছেন।

আল্লামা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী (রহ.) দেওবন্দে পড়ার সময়ই সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর নিকট বায়াত হন। সেখানে তার সাথীদের মধ্যে ছিলেন- হাটহাজারীর শাহ আবদুস সাত্তার রহ., বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা মুফতি আবদুর রহমান রহ., সিলেটের মাওলানা হাবীবুল্লাহ রহ., নাজিরহাটের মাওলানা শামসুদ্দীন রহ. ও ভৈরব কমলপুর মাদরাসার শায়খুল হাদিস মাওলানা আবদুল আলীম আল হুসাইনী রহ.। আল্লামা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী (রহ.) সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানি (রহ.)-এর ইন্তিকালের পর তার খলিফা মাওলানা বশীর আহমাদ শায়খে বাঘা (রহ.)-এর নিকট বায়াত হন।

দেওবন্দ থেকে ফারেগ হওয়ার পর দেশে ফিরে হাদিস চর্চা, লেখালেখি এবং মাদরাসায় শিক্ষকতায় নিজেকে অর্পণ করেন। মোজাহেদে আজম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত গওহরডাঙ্গা মাদরাসা, বড় কাটরা মাদরাসা, ফরিদাবাদ মাদরাসা, জিরি মাদরাসা, পটিয়া মাদরাসা, মিরপুর আরজাবাদ মাদরাসা, চট্টগ্রামের কৈগ্রাম মাদরাসাসহ আরও বিভিন্ন মাদরাসায় তিনি শিক্ষকতা করেছেন। প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৭ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জে দারুল উলুম দেওভোগ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দেওভোগ মাদরাসায় মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে তিনি মাদরাসার কাজে নিজ পরিবারের স্বর্ণালঙ্কারসমূহ বিক্রয় করে বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণ করেন। তিনি মালিবাগ মাদরাসার মুহতামিমেরও দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৫ সাল থেকে ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত ঢাকার ইসলামপুর নবাববাড়ি মসজিদের খতিব ছিলেন। একজন আলেমের জীবনে যত সৎ গুণের সমাবেশ ঘটতে পারে তার সবই তার জীবনে একত্রিত হয়েছিল। তিনি একাধারে ছিলেন মুহাদ্দিস, ওয়ায়েজ (বক্তা), লেখক, ইসলামি চিন্তাবিদ, সিরাত গবেষক ও সফল অনুবাদক। তিনি লেখক সমাজ বাংলাদেশ, সমাজ সংস্কার পরিষদ, বাংলাদেশ ইমাম সমিতি ও সীরাতুন্নবী সা. কমপ্লেক্স নামে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান গঠন করেছিলেন। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ’ গঠনে তার ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞ পাঠক, গবেষক ও লেখক। তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে প্রায় ২০ হাজার দুর্লভ কিতাব রয়েছে। শুধু কিতাব সংগ্রহ নয়, ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকাও তিনি নিয়মিত সংগ্রহ করতেন। এমনকি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লেখাও তিনি সংগ্রহ করেছেন। তার সংগৃহীত খুব কম কিতাব পাওয়া যাবে, যেগুলোতে তার টিকা, মন্তব্য চিহ্নিত করা নেই। অনেক কিতাবের মলাটের গায়ে ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ইঙ্গিত আছে। কোনো কিতাব মুতালাআর সময় তার কোনো তথ্য বা ঘটনা অন্য কিতাবে থাকলে কিতাবের টিকায় সেগুলোও লিখে রাখতেন।

আল্লামা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী (রহ.)-এর অন্যতম প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন শায়খুল ইসলাম হজরত মাদানি (রহ.)। হজরত মাদানি (রহ.)-এর নাম উচ্চারণ করলে তার চেহারা উজ্জ্বল হয়ে যেত। সবকে প্রায়ই তিনি মাদানি (রহ.)-এর প্রসঙ্গ আলোচনা করতেন। দরসে কখনো মাদানি (রহ.)-এর নাম আসলে তার প্রতি যেই আজমত ও ভক্তি-শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন, সত্যিই তা বিরল। শায়খুল ইসলাম হজরত মাদানি (রহ.) ও তার পরিবারের প্রতি ভালোসা তার রক্তে-মাংসে মিশে গিয়েছিল। মূলত হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যিকারের ভালোবাসা ছিল এর উৎস। শায়খুল ইসলামের পরিবারের কোনো সদস্যের আগমন বা সাক্ষাৎ নয়; বরং তাদের নাম উচ্চারিত হলেই হজরতের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে যেত। হজরত মাদানির হাজার হাজার আশেকিনের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম আশেক ও ফেদায়ী। আমার আব্বা, আমার ভাই ও আমার মাদানি খান্দানের প্রতি ভালোবাসার উৎসও এটাই। তাই নিজেকে ‘মাদানি খান্দানের গোলাম’ পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ করি না কখনও।

আল্লামা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী (রহ.) ছাত্রদের খুব ভালোবাসতেন। তিনি খুব মেহমান নাওয়াজ ছিলেন। তার কামরায় কোনো ছাত্র তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে, তাদেরকেও তিনি মেহমানদারি করতেন। আমরা ছোটবেলা থেকে দেখেছি, তিনি বছরে নিয়ম করে এক-দুই বার আমাদের বাড়িতে আসতেন। তিনি এক-দুই দিন বাড়িতে থাকার সময় আমাদের বাড়িতে ঈদের আনন্দ বিরাজ করতো। টাকার নোট চেনার পর প্রথমবার হুজুর আমাকে পঞ্চাশ টাকার নোট হাদিয়া দিয়েছিলেন আমাদের বাড়ি থেকে আসার সময়। এছাড়া যতবার বাড়িতে আসতেন কিংবা আমি হুজুরের বাসায় যেতাম হাদিয়া ছিল অবধারিত।

আল্লামা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী (রহ.) যুগ ও সমাজ সচেতন একজন আলেম হিসেবে দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকায় বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত লেখালেখি করতেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে তার লিখিত ১৮টি বই প্রকাশিত হয়েছে। নিজে প্রকাশ করেছেন তিরমিজি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ, দরসে মাদানি এবং দরসে এযাযী।

তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তাফসিরে কুরআনুল কারিম, সহিহ মুসলিম শরিফ, তাফসিরে ইবনে আব্বাস, ইসলামী বিশ্বকোষ, সীরাত বিশ্বকোষ, দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, সীরাতে ইবনে হিশাম রহ.-সহ বিভিন্ন সম্পাদনা বোর্ডে দায়িত্ব পালন করেছেন। অগ্রপথিক, ঐতিহ্য, বাতায়ন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, মাসিক তমদ্দুন, সবুজ পাতা, ইনকিলাব, ইত্তেফাক, যুগান্তর, নয়াদিগন্ত ও মাসিক পয়গামে হকসহ বিভিন্ন পত্রিকায় তার বহু লেখা ছাপা হয়েছে।

আল্লামা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী (রহ.) অনেকবার সৌদি আরব আরব ভ্রমণ করেছেন। এছাড়া ইরাক, ইরান, সিরিয়া, ভারত ও পাকিস্তানে ভ্রমণ করেছেন। তার ছাত্রদের মধ্যে মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী রহ., সুলতান যওক নদভী রহ., দারুর রাশাদ মাদরাসার শায়খুল হাদিস মাওলানা হাবীবুর রহমান, মাওলানা ইসহাক ফরীদী রহ., নারায়ণগঞ্জের পাঠানটুলির জৌনপুরী প্রাক্তন পীর নিসার আহমাদ আব্বাসী রহ., কুমিল্লার আবদুল বারী (১৯৬৭), মাওলানা জাফর আহমাদসহ আরো অনেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত আছেন।

২০০৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার জুমার আজানের পূর্বমুহূর্তে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার অসিয়ত অনুযায়ী আজিমপুর গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। আল্লাহতায়ালা হজরতকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উঁচু মাকাম দান করুন। আমিন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

/আইও


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ