সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ।। ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ ।। ১০ রবিউস সানি ১৪৪৮


বিশ্ববাজারে কমলেও বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণ কী

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: এআই

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে ডিজেল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর আগে দাম ছিল যথাক্রমে ১১৫, ১৪০, ১৪৫ ও ১৩৫ টাকা। অথচ একই দিন সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের ভবিষ্যৎ সরবরাহের দাম ৮১ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ১০৩ দশমিক ০৬ ডলারে নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও ৮৯ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ কমে ৯৯ দশমিক ৪১ ডলারে নামে।

কয়েকমাস আগেও তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠলেও এতটা দাম বাড়ানো হয়নি। তবে কেন হঠাৎ করে এত বেশি বাড়ানো হলো জ্বালানি তেলের দাম, তা নিয়ে জনমনে এখন নানান প্রশ্ন।

সরকারের ব্যাখ্যা, মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছে।

সরকারের হিসাবে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। নতুন দাম নির্ধারণের ফলে বিপিসির লোকসান কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমবে বলে জানিয়েছে সরকার।

চলতি বছরে এর আগে ১৮ এপ্রিল জ্বালানির দামে বড় ধরনের সমন্বয় করা হয়। তখন ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকা করা হয়।

এরপর ১ জুন থেকে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম আরো ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। ডিজেলের দাম তখন অপরিবর্তিত রাখা হয়। ফলে সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ বৃদ্ধির আগে ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা।

এ ছাড়া জেট ফুয়েল ও ফার্নেস অয়েলের দামও এ বছর বেড়েছে। ৭ এপ্রিল দেশীয় ফ্লাইটের জন্য জেট ফুয়েলের দাম লিটারে ২২৭ টাকা ৮ পয়সা এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য ১ দশমিক ৪৮০৬ ডলার নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

১২ এপ্রিল ফার্নেস অয়েলের দাম ৭০ টাকা ১০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯৪ টাকা ৬৯ পয়সা করা হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত এই জ্বালানির দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের দর ও ডলারের বিনিময়মূল্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে বিইআরসি জানিয়েছিল।

এর আগে জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বিবৃতিতে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছিলেন, ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের গড় দাম ৯৮ শতাংশ এবং অকটেনের দাম ২৬ শতাংশ বেড়েছিল। এ কারণে সরকার জ্বালানি খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিচ্ছে বলে তিনি জানান। মার্চ থেকে জুন সময়ে ডিজেলে ১৫ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা এবং অকটেনে ৬৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে বলে সে সময়ের হিসাব তুলে ধরা হয়েছিল।

বিপিসি সূত্র অনুযায়ী, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৭৫ লাখ টন। এর প্রায় ৭৫ শতাংশই ডিজেল। বাকি চাহিদা পূরণ হয় পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, জেট ফুয়েল ও ফার্নেস অয়েলসহ অন্যান্য জ্বালানি দিয়ে।

দেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের দায়িত্বও এক নয়। জেট ফুয়েল ও ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। আর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম নির্ধারণ করে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ।

সরকারের আরেকটি যুক্তি হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দামের বড় ব্যবধান থাকলে সীমান্তপথে পাচারের ঝুঁকি বাড়ে। দাম বাড়িয়ে সেই ব্যবধান কমানো গেলে পাচারের প্রবণতাও কমতে পারে।

অথচ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু পাম্পে গিয়ে বেশি টাকা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন, কৃষি, পণ্য সরবরাহ ও শিল্পের ব্যয়ে চাপ পড়ে। এর প্রভাব পরে বাজারদরেও পড়বে। চলমান মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেই ব্যবসায়ী ও শিল্প খাত থেকে জ্বালানির বাড়তি ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে পড়তে পারে। কৃষিতে সেচ, যান্ত্রিকীকরণ ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে। শিল্পে বাড়বে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়।

এর অর্থ হলো— জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাবের চেয়ে পরোক্ষ প্রভাব আরো বিস্তৃত হতে পারে। একজন ভোক্তা গাড়িতে তেল না কিনলেও পণ্য পরিবহনের বাড়তি খরচের কারণে বাজারে বেশি দাম দিতে পারেন।

দেশে একবারে সবচেয়ে বেশি হারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল ২০২২ সালের আগস্টে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর তখন ডিজেলের দাম ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১১৪ টাকা করা হয়েছিল।

এবারের মূল্যবৃদ্ধির পর তাই আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপথের দিকে নজর থাকবে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সরবরাহ পরিস্থিতি তেলের বাজারকে অস্থির করে রেখেছে, অন্যদিকে সৌদি আরবের সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশায় বিশ্ববাজারে দাম কমছে। এ দুই বিপরীত প্রবণতার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে কীভাবে পড়ে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ