|| মাওলানা সাইফুদ্দীন কাসেমী ||
ফেনী শর্শদি মাদরাসার সাবেক শাইখুল হাদীস, দাঈ ইলাল্লাহ আল্লামা মুফতি আব্দুল আজিজ রহ. (লাকসামের হুজুর) আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উস্তাদ। জাহেরি গুণাবলির পাশাপাশি তিনি ছিলেন বহু গুণাবলির মিলনমোহনা। ইলমে ওহির আলোতে তিনি ছিলেন আলোকিত। পাশাপাশি একজন মুমিনের যে গুণগুলো থাকা দরকার, তার সবগুলো হুজুরের মধ্যে ছিল বিদ্যমান। আমার অস্তিত্বের প্রতিটি বিন্দুকণা তাঁর কাছে ঋণী। এ ঋণ কখনো শোধ হবার নয়। এ ঋণ আমার জন্য গর্বেরও বটে।
আল্লাহ তাআলা নিজ অনুগ্রহে শত ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও যে অধমকে এখনো দ্বীনের খেদমতে লাগিয়ে রেখেছেন, এর জন্য আমি আমার পরম মুহসিন উস্তাদ হজরত লাকসাম হুযুরের কাছে ঋণী। তাঁর কাছ থেকে আমি বহু কিছু শিখেছি। উস্তাদে মুহতারাম ছিলেন আমার তালিমি মুরুব্বি (শিক্ষাগুরু)। পড়ালেখা ও তারবিয়াত বিষয়ে আমি তাঁর শরণাপন্ন হতাম। তিনিও আমাকে উপযুক্ত সময়ে যথাযথ দিকনির্দেশনা দিতেন। খুবই মুহাব্বত ও স্নেহ করতেন। এমনকি আম্মাজানের কাছেও নাকি আমার কথা বলতেন।
উস্তাদে মুহতারামের কথা স্মরণ হলে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারি না। আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়ি। হুযুরের কোনো হক তো আদায় করতে পারিনি, তবে এখনো সুযোগ হলে হুজুরের মাকবারায় ছুটে যাই জিয়ারত করতে।
আমরা যখন আমাদের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান জামিয়া মাদানিয়া প্রতিষ্ঠা করি, তখন বাংলাদেশের যে কজন মুরুব্বি জামিয়া মাদানিয়ার সরাসরি তত্ত্বাবধান করেছেন তাদের মধ্যে আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ., আল্লামা হারুন ইসলামাবাদী রহ. ও আল্লামা মুফতি আব্দুল আজিজ রহ. (লাকসামের হুজুর) ছিলেন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
জামিয়া মাদানিয়ার শুরুর দিকে হুজুর প্রতি বৃহস্পতিবার ফেনী তাবলিগ মারকাজে বয়ান করে এশার পর সোজা জামিয়া মাদানিয়ায় চলে আসতেন। এটি ছিল জামিয়া মাদানিয়ার প্রতি হুজুরের হুসনে তাওয়াজ্জুহের (ইতিবাচক মনোভাব) বহিঃপ্রকাশ। এছাড়া হুজুরের যখনই সুযোগ হতো জামিয়া মাদানিয়ায় আপন সন্তানতুল্য শাগরিদদের দেখতে আসতেন। এটি ছিল তাঁর উদার ও প্রশস্ত হৃদয়ের পরিচয়।
হুজুর তাঁর ছোট দুই ছেলে মাওলানা জোবায়ের ও মাওলানা জুনায়েদ আহমদ উভয়কে জামিয়া মাদানিয়ায় ভর্তি করিয়েছেন। তারা আমাদের কাছে পড়েছে। হজরতুল উস্তাদের কাছে আমি বহু কিতাব পড়েছি। কিছু কিতাব পড়েছি দরসে। আর কিছু কিতাব পড়েছি দরসের বাহিরে হাঁটা-চলার মধ্যে। ছাত্রদেরকে হেঁটে-হেঁটে পড়ানো শিখেছি হুজুর থেকে।
শর্শদী মাদরাসায় যেহেতু আমি তালেবে ইলম ছিলাম আবার কর্মজীবনের একটা অংশ শর্শদিতেই কেটেছে, তাই হুজুর থেকে ইলমি ইস্তিফাদা করার সৌভাগ্য হয়েছে অনেক বেশি। সকল বিষয়ে আমি হুজুরের সঙ্গেই পরামর্শ করতাম।
হুজুরের ইলমি মাকাম (অবস্থান) কত ঊর্ধ্বে ছিল, তা বলে শেষ করা যাবে না। তাঁর মত এত বড়মাপের আলেমের স্নেহধন্য শাগরিদ হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। বাস্তবতা হলো, ইলমি হাইসিয়াতে হুজুর ছিলেন বাংলাদেশের শীর্ষ আলেমদের মধ্যে একজন।
হুযুর ফাতহুল বারি, ফাতহুল কাদির, মুসাল্লামুস সুবুত, মাইবুজি, সুল্লাম, হিদায়া, মিশকাত ইত্যাদির মত জটিল-কঠিন কিতাবের ইবারত, হাশিয়া কেটে দিতেন এবং নিজের পক্ষ থেকে আরবিতে আরেকটি হাশিয়া লিখে দিতেন। ইবারত এভাবে হলে ভালো হতো—একথা বলে হুজুর বহু কিতাবের ইবারত, হাশিয়া কেটে দিতেন। আর হুজুরের তাসহিহ (পরিশুদ্ধ) করা হাশিয়ার উপর কারো কলম ধরার সাহস হতো না।

আল্লামা আব্দুল আজীজ (লাকসাম হুজুর) রহ.-এর যৌবনকালের ছবি। উপমহাদেশের প্রখ্যাত বুজুর্গ ও বিদ্বান ব্যক্তিত্ব।
হানাফি মাজহাবের সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ হেদায়ার মত কিতাবের বিভিন্ন ইবারত ও হাশিয়ার উপর হুজুর বিভিন্ন টীকা-টিপ্পনী লিখে হাটহাজারীর উস্তাদদেরকে দেখালে উস্তাদগণ বলতেন ‘হেদায়ার হাশিয়া লেখকও ফিকহ ততটুকু বোঝেন নি, যতটুকু আমাদের আব্দুল আজিজ বুঝেছে।’
হেদায়া কিতাবের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ সম্পর্ক। এজন্য তিনি তাঁর এক নাতির নামও রেখেছেন হেদায়া কিতাবের মুসান্নিফের নাম হিসেবে—বুরহানুদ্দীন। সে আমাদের ছাত্র। তাকে আমি প্রায় বলে থাকি, তোমার নানার মত একজন বড় আলেম হওয়ার চেষ্টা করো। দোয়া করি, আল্লাহ তাআলা তাকে দ্বীনের জন্য, ইলমের জন্য কবুল করেন।
হুজুরের সঙ্গে আমার আব্বাজান রহ. এর সম্পর্ক ছিল অনেক আগে থেকে। তাই আব্বাজান রহ. আমাকে শর্শদি মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দেন এবং আমাকে হুজুরের হাতে সোপর্দ করেন। হুযুর নিজ সন্তানের মত আমার যাবতীয় বিষয় দেখাশুনা করতেন।
শর্শদী মাদরাসায় আমি পঞ্চম (শরহে জামি) পর্যন্ত পড়েছি। এরপরের বছর জামাতে চাহারুমে (শরহে বেকায়া) ভর্তি হই। কুরবানি পর্যন্ত পড়ি। কুরবানির পর বিশেষ পরিস্থিতির কারণে শর্শদি মাদরাসায় আর আমার থাকা সম্ভব হয়নি। আমি হযরতুল উস্তাদকে কুরবানির আগে বিশেষ এপরিস্থিতির কথা অবহিত করি এবং বলি, আমার পক্ষে আর শর্শদী থাকা সম্ভব নয়।
উস্তাদজী বললেন, কুরবানির পর চট্টগ্রামে আরব থেকে একটি তাবলীগের জামাত আসবে আমি তাদের ইস্তেকবালে যাব। তখন তুমি আমার সঙ্গে হাটহাজারী যাবে। আমি তোমাকে হাটহাজারী মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দেবো। অতঃপর আমি হুজুরের সঙ্গে কুরবানির পর হাটহাজারী মাদরাসায় যাই। হুজুর আমাকে নিয়ে সোজা হাটহাজারীর মুহতামিম সাহেব তথা হজরত মাওলানা হামেদ রহ. এর কাছে যান। হযরত বললেন, আমার আব্দুল আজিজের কথা তো ফেলে দিতে পারি না। তাই নিয়ম ভঙ্গ করে হলেও কুরবানির পর ভর্তির সুযোগ দিয়ে দিলাম।
হজরতুল উস্তাদের আগমন উপলক্ষ্যে হাটহাজারীর মুহতামিম সাহেব তাঁর জন্য সে বিশাল খাবারের আয়োজন করলেন। আমি তো ছোট মানুষ। ছাত্র উস্তাদের কেমন প্রিয় পাত্র হলে উস্তাদ ছাত্রের জন্য এমন আয়োজন করতে পারেন! তা ভেবে আমি বড় অবাক হই।
হাটহাজারীর মুহতামিম সাহেব সেদিন হুযুরকে বললেন, ‘আব্দুল আজিজ! আঁই তোঁয়ারে খয়েদ তুঁই হাটহাজারী চলে আইস্সো, তোঁয়ারে আঁই হাটহাজারীর শায়খুল হাদীস বানাই দিয়ুম।’ হুজুর যখন হাটহাজারী যেতেন, হাটহাজারীর মুহতামিম সাহেব হুজুরকে মসজিদে বয়ান করতে বলতেন। হুযুর তখন আরবিতে অনর্গল বয়ান করতেন।
একবার হুজুর হাটহাজারী মাদ্রাসায় আরবিতে এমন বয়ান দিলেন, হাটহাজারীর হযরত মাওলানা হামেদ সাহেব রহ. দাঁড়িয়ে তালেবে ইলমদের লক্ষ্য করে বললেন, ‘দেখেছো! একেই বলে আলেম। যাকে নিয়ে হাটহাজারী মাদরাসা গর্ব করে।’
মোটকথা, হাটহাজারী মাদরাসার উস্তাদগণের নিকট হুজুরের অনেক মূল্যায়ন ছিল। হজরতের শাগরিদ হওয়ার সুবাদে হাটহাজারীর উস্তাদগণও আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। হাটহাজারীর উস্তাদগণ তাঁকে নিয়ে গর্ব করতেন।
হুজুরের দিলটা ছিল বড় উদার, উম্মতের ব্যথায় বড় ব্যথিত। মানুষকে হাতে পায়ে ধরে মসজিদমুখী, মাদরাসামুখী করতেন। হুজুরের মেহনতে বহু মানুষ দ্বীনের পথে এসেছে এবং নিজ সন্তানদের আলেম বানিয়েছে। হুজুর ছিলেন হেদায়েতের একটি উজ্জ্বল প্রদীপ।
এত বড় আলেম হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে কিভাবে গোপন রাখতে হয়, তা তিনি রপ্ত করেছেন খুব ভালোভাবে। হুজুরের মধ্যে বিনয় ও আত্মোৎসর্গ প্রবল ছিল। নিজেকে যেভাবে বিলীন করেছেন তার উপমা তিনি নিজেই। কখনো কোনোভাবে নিজের প্রকাশ চাইতেন না।
হুজুরের হস্তলিপি ছিল খুবই চমৎকার। কিতাবের পাশে যখন হাশিয়া লিখতেন, মনে হতো যেন কিতাবেরই লেখা। এত সুন্দর ছিল। হুজুর আরবি ভাষায় ছিলেন খুবই দক্ষ। আরবিতে কথা বলতেন আরবদের মত অনর্গল। আজমিদের মধ্যে এত বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল আরবি ভাষায় কথা বলতে পারাটা অনেকটা দুষ্কর। হুযুরের আরবি ভাষায় বয়ান শুনে আরবরা পর্যন্ত বিমোহিত হতো।
হুজুরের মেধা ছিল প্রখর। হাটহাজারীর শায়খুল হাদিস আব্দুল আজিজ রহ. যিনি হুযুরেরও উস্তাদ ছিলেন, তিনি বলতেন, ‘আব্দুল আজিজ আহাদু আযকিয়াই উম্মাতি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।’
আমি যখন হাটহাজারী পড়ালেখা করি, তখনও হাটহাজারীতে হুযুরের উস্তাদ অনেকেই জীবিত ছিলেন, তাঁরা ছিলেন হুজরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাঁদের মুখে উস্তাদজীর প্রশংসা শুনে ভাবতাম, একেই বলে হাকিকি ছাত্র, উস্তাদরাই যার এত আশেক!
একবার হুজুর একটি কিতাবের বহু জায়গায় হাশিয়া কেটে দিলেন, এটি দেখে আমার খারাপ লাগলো। এ কিতাবের হাশিয়া যে কিতাব থেকে আনা হয়েছে তা শর্শদী মাদরাসায় ছিলো না। একবার আমার হাটহাজারী যাওয়া হলে মূল কিতাবটি যখন দেখলাম, তখন আমি রীতিমত হতবাক হয়ে যাই। হুযুর যেভাবে লিখলেন, মূল কিতাবে ঠিক এভাবে ছিল। আর কিতাবের হাশিয়া ছিলো ভুল। হুযুর কুরআন কারিমের হাফেজ ছিলেন না। কিন্তু হাটহাজারীর হযরত আল্লামা হামেদ রহ. তাঁর মেধাশক্তি ও বহু কিতাবের ইবারত মুখস্থ থাকার কারণে তাঁকে হাফেজ সাহেব খেতাব দিয়েছেন। তিনি হাটহাজারীর উস্তাদগণকে বহু কিতাবের ইবারত মুখস্থ শুনিয়েছিলেন। বিশেষ করে কুদুরি, কানযুদ্দাকায়েক, কাফিয়া ইত্যাদিসহ বহু কিতাবের ইবারত তাঁর সম্পূর্ণ মুখস্থ ছিলো।
হুজুরের সাথী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী রহ. ও আল্লামা হারুন রহ. (হাটহাজারীর সাবেক মুহাদ্দিস) প্রায় সময় হুযুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে শর্শদী মাদরাসায় চলে আসতেন। তখন আমরা তাঁদের কাছে দুতিনটে সবক পড়তাম। তাঁরা তখন আমাদেরকে বলতেন, তোমাদের হুজুর (তথা লাকসামের হুযুর) অনেক বড় আলেম।
হজরত মাওলানা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী রহ. এর মুখে বহুবার শুনেছি, আমাদের উস্তাদজী ছাত্র জামানায় এত প্রখর মেধার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও প্রচুর মেহনত করতেন। শীতকালে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে না ঘুমিয়ে একটি কাঁথা ভিজিয়ে এনে পাশে রাখতেন, যখন ঘুমে ধরতো, তখন সেটি গায়ে দিয়ে মুতালাআ করতেন।" এ ছিল তাঁর মুতালাআর চিত্র।
হজরতুল উস্তাদে মুহতারাম রহ. বহুবার আল্লাহ তাআলাকে ও তাঁর হাবিব রাসুল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখেছেন। হাটহাজারীর উস্তাদগণ তাঁর ব্যাপারে বলতেন: ‘নাফসে কুদসী’ তথা পবিত্রাত্মা। হাটহাজারীর উস্তাদগণ তাঁর অনেক মূল্যায়ন করতেন। হাটহাজারীর মুহতামিম আল্লামা হামেদ রহ. বলতেন, ‘আব্দুল আজিজকে নিয়ে হাটহাজারী মাদরাসা গর্ব করে।’
আমি একবার হুজুরকে বলেছিলাম, হুজুর বাড়িতে যাই কিন্তু আমার ভাই বিয়ে করেছেন। ফলে পর্দা করতে পারি না। হুজুর আমাকে বললেন, ‘যখন আপনার ভাবী আপনার সামনে আসবে, তখন নিচের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। এভাবে কয়েকবার যখন এমন ঘটনা ঘটবে, দেখবেন ভাবী আর আপনার সামনে আসবে না।’ আমি হুজুরের কথা অনুযায়ী আমল করেছি, ফলে পরিপূর্ণ উপকারও পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ।
একবার একছাত্র হুজুরের সঙ্গে গাড়িতে ওঠে। কিছু দূর যাওয়ার পর কিছু কলেজ ছাত্রী গাড়িতে ওঠে। তখন ঐ ছাত্র ঐ মেয়েগুলোর দিকে তাকায়। তখন হযরত তাকে লক্ষ্য করে আরবিতে নজরের হেফাজতের প্রসঙ্গে এমন বয়ান দেন, ফলে জীবনের জন্য তার শিক্ষা হয়ে যায়।
হুজুরের অন্যতম একটি গুণ ছিল কানাআত। হুজুর শর্শদী মাদরাসায় সামান্য ওজিফা পেতেন। অথচ হুজুরকে একবার দারুল উলুম দেওবন্দ পর্যন্ত মুহাদ্দিস হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা উঠেছিল। অথচ তিনি দেওবন্দে পড়েননি। পটিয়া মাদরাসার প্রধান মুফতি হজরত মাওলানা মুফতি ইবরাহীম রহ. বহুবার হুজুরকে পটিয়া মাদরাসায় প্রধান মুফতি ও মুহাদ্দিসের দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। কিন্তু হুজুর এ প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। এছাড়া দারুল উলুম হাটহাজারী, বড়উড়া মাদরাসা, ঢাকা ফরিদাবাদ মাদরাসাসহ বহু নামী-দামী প্রতিষ্ঠানে মুফতি ও শায়খুল হাদিস হিসেবে যোগ দেওয়ার বহু প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু হুজুর সবগুলো প্রস্তাব নাকচ করে আজীবন শর্শদিতেই খেদমত করেছেন। অথচ এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে গেলে আজ হুজুরের প্রসিদ্ধি অনেক বেশি হতো নিঃসন্দেহে। আর্থিক অবস্থাও তাঁর খুব ভালো থাকতো। কিন্তু তিনি দ্বীনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি কখনো মাদরাসার বোর্ডিংয়ের খাবারের অভিযোগ করতেন না।

উপর থেকে ঐতিহ্যবাহী শর্শদী মাদরাসা। এখানেই খুব অল্প হাদিয়ায় খেদমত করতেন আল্লামা আব্দুল আজীজ রহ.।
একবার হুজুর খানা খাচ্ছিলেন। তরকারি ছিল মাতবাখ থেকে দেওয়া পাতলা ডাল আর সাথে শুধু কাঁচা মরিচ। আমি লক্ষ করলাম হুজুরের খানা খেতে খুব কষ্ট হচ্ছে, তখন আমি দুঃখের সাথে বললাম, হুজুর আপনি খান পাতলা ডাল দিয়ে আর অনেকে খায় মাগুর মাছ দিয়ে। তখন হুজুর বলে উঠলেন আস্তাগফিরুল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ!! আস্তাগফিরুল্লাহ!!! আপনি তো আমার আমল নষ্ট করছেন। আর নিজের জিহ্বাকে সম্বোধন করে বললেন, ‘জিহ্বা তুই নষ্ট হইছিস। এগুলো আমার আল্লাহর নিআমত এগুলোর স্বাদ বহাল আছে। কত মানুষ খানা পায় না। আল্লাহ যে আমাকে খাওয়াচ্ছেন কিভাবে তাঁর শোকর আদায় করি?’ এরপর বললেন, ‘আমিও কানে ধরি’ একথা বলে হুজুর নিজের কান নিজে ধরলেন। এরপর বললেন, ‘আপনিও কান ধরেন!’ কেন গীবত করলেন? হুজুর ছিলেন একজন হাকিকি অর্থে আল্লাহওয়ালা।
এটা ঠিক যে হুজুরের কোনো খানকা ছিলো না। কিন্তু তিনি সত্যিকার অর্থে একজন বুজুর্গ ছিলেন। নিজের বুজুর্গীকে যথাসম্ভব ঢেকে রাখতেন। কখনো প্রকাশ পেতে দিতেন না। তারপরও হুজুর থেকে অনেক কারামত প্রকাশ পেতো, যা আমরা বুঝতে পারতাম।
একবারের ঘটনা, হুজুর একদিন ফজরের আগে আমাকে বললেন, চলেন চৌছনা মিয়াজী বাড়িতে যাই, সেখানে গিয়ে দাওয়াতের আমল করব। তখন ফজরের জামাতের মাত্র কিছুক্ষণ বাকি। সেখানে গিয়ে জামাত পাওয়া যাবে না। তাই আমি আরজ করলাম হুযুর আমরা এখানে নামাজ পড়ে গেলে ভালো হবে। তখন হুজুর বললেন, না আমরা সেখানে গিয়ে নামাজ পড়বো। তখন হুযুর আমার হাত ধরে বললেন, চোখ বন্ধ করে হাঁটেন আর মনে মনে দুআ-দরুদ পড়েন। এক-দেড় মিনিট পর বললেন চোখ খোলেন। তখন আমি চোখ খোলা মাত্রই দেখি আমরা চৌছনা মিয়াজী বাড়ি মসজিদের সামনে পৌঁছে গেছি! তখন হুযুর আমাকে বললেন, ‘অন্তত পক্ষে আমার মৃত্যুর আগে কাউকে এ ঘটনা বলবেন না।’
অনেক সময় হুযুর ঘুম থেকে উঠে সোজা আমার কামরায় চলে আসতেন। এবং আরবিতে বলতেন মাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখেছি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে তাবলীগের কাজে নিয়োজিত থাকতে বলেছেন। দ্বীনের জন্য ও তাবলীগের জন্য হুযুর অনেক কষ্ট করেছেন। দেখা যেত মাদ্রাসা খোলার দিন সেই লাকসাম থেকে রেল লাইন ধরে পায়ে হেঁটে শশ্রদী মাদ্রাসায় আসতেন। টাকা না থাকার কারণে গাড়িতে করে আসতে পারতেন না।
প্রথম যখন তাবলীগে গিয়েছেন, তখন হুযুর হাত খালি থাকার কারণে নিজের জামা-কাপড় ও ছাতা বিক্রি করে তাবলীগের কাজ করেছেন এবং অনাহারে-অর্ধাহারে সে সময়গুলো কাটিয়েছেন। মোটকথা জীবনের বিশাল একটা অংশ তাঁর কুরবানী আর বিসর্জনে ভরা ছিল। তবে জীবনের শেষ দিকে অনেক নুসরাত ও ফুতুহাত এসেছে। তখন হুযুর সে সময়গুলোতে যত টাকা-পয়সা হাতে আসতো সব আত্মীয় স্বজন, তালেবে ইলম ও তাবলীগের পেছনে খরচ করেছেন।
হুযুর তাবলীগ করতেন ঠিকই। তবে মাদ্রাসার হক নষ্ট করে তাবলীগে যেতেন না। হুযুর ছুটির সময়ে কিংবা মাদ্রাসার পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিশ্রামের সময়ে তাবলীগের কাজে বের হতেন। আর মাদ্রাসার সময়ে পূর্ণ মনোযোগের সঙ্গে যথেষ্ট মুতালাআ করে দরস-তাদরীসে লিপ্ত থাকতেন।
হুযুরের মধ্যে দায়িত্ব সচেতনতা ছিল অনেক বেশি। মাদ্রাসার পক্ষ থেকে কিংবা কোনো সংস্থার পক্ষ হতে অর্পিত দায়িত্বের মধ্যে অবহেলা কোনোভাবে মেনে নিতে পারতেন না।
হুযুর ২-৩ বছর আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিসিল কাওমিয়া বাংলাদেশের (যেটি বাংলাদেশের সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত কওমী মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড) প্রধান পরীক্ষানিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করেন। হুযুর সতর্কতাবশত সে সময় গভীর রাতে যখন সবাই ঘুমের মধ্যে, তখন ইত্তেহাদের প্রশ্ন করতেন ও প্রশ্ন দেখতেন। ইত্তেহাদের সকল মুরুব্বী, বিশেষত পটিয়ার হাজ্বী ইউনুস রহ. ও আল্লামা হারুন ইসলামাবাদী রহ. এক্ষেত্রে হুযুরের সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার ভূয়সী প্রশংসা করতেন।
হযরতুল উস্তাদের ইন্তিকালে বাংলাদেশের ইলমী অঙ্গনে বিরাট শূন্যতা তৈরি হয়েছে। যা সহজেই পূরণ হওয়ার নয়। আমরা যারা হুযুরের শাগরিদ, হুযুরের ইন্তিকালের পর আমাদের মানসিক অবস্থা ঠিক তেমনি হয়েছিল, হযরতুল ইমাম কাশ্মীরী রহ. এর ইন্তিকালে মুফতীয়ে আযম মুফতী কিফায়েতুল্লাহ দেহলবী রহ. এর মানসিক অবস্থা যেমন হয়েছিল। তিনি বলেন—
إن فكرتي وحواسي أضحت معطلة بداهية موت الشيخ محمد أنور، رحمه الله، كان أمةً، إماماً مقداماً، إنه لم يمت، ولكنه مات العلم والعلماء.
"আল্লামা কাশ্মীরী রহ. এর আকস্মিক মৃত্যুতে আমি চেতনা ও বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছি। আল্লাহ তাঁর উপর রহম করুন। তিনি একাই একটি জাতি ছিলেন। তিনি মরেননি। বরং ইলম ও আহলে ইলমই আজ মারা গিয়েছে।" (ফায়যুল বারী ১/১৪)
আজ লাকসামের হুযুর রহ. নেই। আছে শুধু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ। আমরা যদি তাঁর জীবনী থেকে নিজেদের জীবন গঠনের উপাদানগুলো সংগ্রহ করি, তাহলে আশা করি আমরাও সফল হতে পারবো। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুক। উস্তাদজীকে আল্লাহ তাআলা জান্নাতের আলা মাকাম নসীব করুন। আমীন।
কবির ভাষায়---
رفتم واز رفتم من اک جہاں معدوم شدہ
من مگر شمعم چوں رفتم بر ہم ساختن
‘আমি বিদায় নিয়েছি, আমার বিদায়ে এক পৃথিবী হারিয়ে গেছে/ আমি তো ছিলাম বাতি, যখন চলে গেলাম, মাহফিল ভেঙে দিয়ে গেলাম।’
লেখক, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, জামিয়া মাদানিয়া সিলোনিয়া ফেনী।
সিনিয়র সহ-সভাপতি, ইত্তিহাদুল মাদারিসিল কাওমিয়া বাংলাদেশ।
খলীফা, আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.
আওয়ার ইসলাম/জেডএম
