শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬ ।। ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ১১ মহর্‌রম ১৪৪৮


মাদকাসক্তি: ব্যক্তি-পরিবার ও সমাজের বিপর্যয়


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| মুহাম্মদ ছফিউল্লাহ হাশেমী ||

ইসলাম সব ধরনের মাদকদ্রব্যকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ মর্মে মহানবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'যে ব্যক্তি পৃথিবীতে মদ্যপান করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নামের উষ্ণ পানি ও কুপেয় পদার্থ পান করাবেন।' ইসলামের আবির্ভাবের আগে পৃথিবীতে নানা কুসংস্কারের প্রচলন ছিলো। তন্মধ্যে জুয়া, পাশা, মাদকাসক্তি ইত্যাদি ছিলো অন্যতম। মাদকাসক্তিতে পূর্ণ এ সমাজ ব্যবস্থাকে আল্লাহর প্রিয় নবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে সম্পূর্ণ আদর্শ সমাজে পরিণত করলেন। সে সমাজে ছিলো না কোনো অপসংস্কৃতি, ছিলো না কোনো মাদকাসক্তি।

আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চেষ্টা করেছেন মানুষের হৃদয়ে পরিবর্তন আনতে এবং অন্তরে তাকওয়া ও আনুগত্য সৃষ্টি করতে। তাইতো দেখা যায় মদ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মদিনার মুসলমানদের মধ্যে যারা মদপান করতেন তারা এমন আনুগত্য প্রকাশ করলেন যে, কারো হাতে মদের পাত্র আছে, এক চুমুক পান করছেন- এমন সময় নির্দেশ শোনার পরপরই পাত্র মুখ থেকে পৃথক করে ফেললেন এবং দ্বিতীয়বার আরেক চুমুক পান করা থেকে বিরত থাকলেন। আর পাত্র হাত থেকে ছুড়ে ফেলে দিলেন। যাদের ঘরে মদ মজুদ ছিলো তারা সব মদ নালা-নর্দমায় ফেলে দিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের মনে মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে নৈতিক উন্নয়নের যে বিপ্লব সৃষ্টি করেন তা ছিলো অনন্য ও অসাধারণ।

বিড়ি, সিগারেট, পাইপ, গুল, জর্দাপাতা, কোকেন, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা- এসবই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মাদকাসক্তির ফলে জন্ডিস, হেপাটাইটিস, লিভার সিরোসিস, ক্যান্সার, স্মরণশক্তি ও ইচ্ছাশক্তি লোপ, যৌন অক্ষমতা, কিডনি রোগ, এসিডিটি, আলসার, চর্মরোগ, হৃদরোগ ইত্যাদি ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারে। এমনকি এর ফলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে মাদকাসক্তি একটি ভয়াবহ সমস্যা। মাদকদ্রব্যের বিস্তারের ফলে বিভিন্ন দেশে অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশেও মাদকাসক্তি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা এখন ২ কোটির উপরে। এর মধ্যে দেড় কোটি নিয়মিত। ৫০ লাখের মতো অনিয়মিত। দেশে সেবনকারীরা গড়ে প্রতিদিন অন্তত ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করে। এর মধ্যে মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের সংখ্যাই বেশি।

বাংলাদেশে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে পাঁচটি সংস্থার ১২ বছরের (২০০৯-২০২০) পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১২ বছরে যে পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার হয়েছে, প্রচলিত দাম অনুযায়ী টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ১৪ হাজার ৩১৩ কোটি ৭৯ লাখ ৬২ হাজার ১৩০ টাকা। পাঁচ সংস্থার মাদক উদ্ধারের ঘটনায় এক যুগে ৭ লাখ ৯৩ হাজার ৩৮২টি মামলা হয়। পাঁচ সংস্থ হলো- মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড।

বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ ও বিদেশি মদ, প্যাথেড্রিন, ডিনেচার্ড স্পিরিট, ভাং, বিয়ার, তাড়ি, বুপ্রেনরফিন (টিডি জেসিক ইঞ্জেকশন), কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বায়োজেসিক ইঞ্জেকশন), মরফিন, আইস পিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাসিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন। মাদকদ্রব্য পাচারের কারণে সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং দেখা দিচ্ছে নানা ধরনের অপরাধ। এ অপরাধপ্রবণতা সামাজিক জীবনে মারাত্মক অস্থিরতা সৃষ্টি করছে এবং যুব সমাজকে বিভ্রান্ত করছে। যুব সমাজের এ বিভ্রান্তির ফলে জাতীয় জীবনের সার্বিক উন্নতি ব্যাহত হচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে সহিংসতা, সন্ত্রাস, মাস্তানি ও জীবন সম্পর্কে নৈরাশ্যবাদিতা, বৃদ্ধি পাচ্ছে হত্যা, রাহাজানি, ছিনতাই, ধর্ষণ, লুটতরাজ, ডাকাতি এবং পকেটমারের মতো ঘৃণিত ও গর্হিত কাজ। আমাদের দেশে কিশোর অপরাধীদের ক্রমবর্ধমান দাপটের যে তথ্য সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে তার মূল কারণও এই মাদকাসক্তি।

বর্তমানে দেশী-বিদেশী মদ, সিগারেট, ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজার নেশা গ্রাস করেছে তরুণ সমাজকে। গ্রাম-গঞ্জে, খাল-বিলে, বন-জঙ্গলের ঝোপঝাড়ে, আম-কাঁঠালের বাগানের আড়ালে এবং বিভিন্ন পার্কে একশ্রেণির তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী গাঁজার আসর জমায়। পাড়ার মাস্তান, গ্রামের টাউট-বাটপার, ভণ্ড পীর-ফকিরদের আস্তানায় তাদের সাঙ্গপাঙ্গ ও চেলারা গাঁজার আসর জমায় এক রকম প্রকাশ্য স্থানেই।

ইসলামে পরিমাণ ও প্রকারের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে মাদকদ্রব্য গ্রহণ করাটাই শয়তানি ও কুৎসিত কাজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সুতরাং নেশার জিনিস হওয়ার ক্ষেত্রে স্থান-কাল-পাত্র ও ধরন-পরিমাণের প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। কী দিয়ে তৈরি, দেশী না বিদেশী, কম বা বেশির প্রশ্ন কিংবা উপকারের দোহাই দেয়ার কোনো অবকাশ নেই। এ প্রসঙ্গে মহানবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, 'যে জিনিসের এক পেয়ালা গ্রহণ করলে নেশা হয়, সে জিনিসের এক চুমুক পরিমাণও হারাম।" (মিশকাত শরিফ)।

মদ সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে পবিত্র কুরআনুল কারিমের চারটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। তন্মধ্যে প্রথম যে আয়াতে কারিমা অবতীর্ণ হয় তা হলো, 'আর খেজুরবৃক্ষ ও আঙ্গুর ফল থেকে তোমরা মধ্যম ও উত্তম খাদ্য তৈরি করে থাকো, এতে অবশ্যই বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।' (সুরা আন-নাহল, আয়াত নং-৬৭)।

অতঃপর দ্বিতীয় আয়াত অবতীর্ণ হয় হজরত উমর (রা.) ও হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর প্রশ্নের উত্তরে- 'আর লোকে আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্য উপকারিতাও রয়েছে। তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অধিক।' (সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত নং- ২১৯)। যেহেতু পাপ অধিক তাই অনেকে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর মদপান ছেড়ে দিয়েছেন।

তৃতীয় আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রাসঙ্গিক ঘটনা হলো, হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর বাড়িতে কয়েকজন মুসলমানের দাওয়াত ছিলো। মদপান করার পর তারা মাগরিবের নামাজে দণ্ডায়মান হলেন। ইমাম সুরা আল-কাফিরুন তিলাওয়াত করলেন। এতে যতো 'লা' হরফ রয়েছে সব বাদ দিয়ে পাঠ করলেন। তখন আয়াতে কারমা অবতীর্ণ হয়, 'হে মুমিনগণ! নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা নামাজের নিকটবর্তীও হয়ো না।' (সুরা আন-নিসা, আয়াত নং- ৪৩)।

হজরত ইতবান ইবনে মালেক (রা.)-এর কিছু বাড়িতে কিছু মুসলমানের দাওয়াত ছিলো। খাওয়া-দাওয়া শেষে একজন কবিতা আবৃতি করলেন। যাতে আনসারদের নিন্দা ছিলো। তখন একজন আনসারি কবির মাথায় আঘাত করলো। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এ ঘটনা জানানো হলো। হজরত উমর (রা.) দোয়া করলেন, 'হে আল্লাহ! এ ব্যাপারে স্পষ্ট হুকুম নাজিল করুন।' তখন এ আয়াতে কারিমা অবতীর্ণ হয়, 'হে মুমিনগণ! এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চাররিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে তোমাদের বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখনো কি নিবৃত্ত হবে?' (সুরা আল-মায়িদাহ, আয়াত নং- ৯০-৯১)।

শরাব নিষিদ্ধ হওয়ার আয়াত নাজিল হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আল্লাহ তাআলা মদ হারাম করেছেন এ আয়াতের সংবাদ পৌঁছার পর কারো কাছে শরাব থাকলে সে যেন তা পান না করে এবং বিক্রিও না করে।'

বর্তমান সময়ে মাদকাসক্তির ব্যাপকতার কারণে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নেমে আসছে ভয়াবহ দুর্যোগ। মহানবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ মেনে চলা, আল্লাহ তাআলার ভয় ও আখিরাতের জবাবদিহিতা ইত্যাদি মৌলিক ন্যায়নীতির প্রতি বিশ্বাসী হয়ে চলা ছাড়া মাদকাসক্তি থেকে মুক্তির বিকল্প কোনো পথ নেই। সব ধরনের মাদকাসক্তি ও অপসংস্কৃতি থেকে মুক্তিলাভ করতে হলে ইসলাম প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় ও সমাজব্যবস্থার দিকে আমাদের ফিরে যেতে হবে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে সেই তাওফিক দান করুন। আমিন!

লেখক: আলেম, প্রাবন্ধিক ও কলেজ শিক্ষক


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ