যাকারিয়া মাহমুদ, সাব-এডিটর
‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা ব্যক্তি বিশেষের অপরাধে মাদরাসা শিক্ষার মতো পুরো একটা ব্যবস্থাকে দোষারোপ করা যুক্তিযুক্ত নয়। আজ কোনো বালিকা বিদ্যালয়, নারী হোস্টেল বা কলেজ ভার্সিটিতে হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যেমন সে স্কুল, কলেজ বা ভার্সিটি বন্ধ করে দেওয়া হবে না—তেমনি মহিলা মাদরাসার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়া অযৌক্তিক।’
আওয়ার ইসলামের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে এভাবেই সাম্প্রতিক ঘটনা সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিলেন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাপরিচালক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী।
বিশিষ্ট এই আলেম, সাংবাদিক ও রাষ্ট্রচিন্তক বলেন, ‘মহিলা মাদরাসার যদি ৫টা দিক খারাপ থাকে তাহলে ৯৫টা দিক আছে ভালো। এই ৫টার খারাপের ওপর ভিত্তি করে তো আর ৯৫টা ভালোকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আমাদের চেষ্টা করা উচিত—কীভাবে সে ৫টা দিকও ভালো করা যায়! সমস্যামুক্ত করা যায়। কিন্তু আমরা সমাজে দেখি এর বিপরীত। যখনই কোনো মহিলা মাদরাসার ব্যাপারে অভিযোগ ওঠে, একটা শ্রেণি অভিযোগ তদন্ত না করেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালাতে থাকে। আর এ সুযোগে স্বার্থান্বেষী মিশনারি, এনজিও ও বিভিন্ন পশ্চিমা এজেন্সী—যারা মাদরাসা শিক্ষা-ব্যবস্থার বিরোধী, তারা এনিয়ে ক্যাম্পেইন শুরু করে। ভিউ ব্যবসায়ীরা নতুন ঘটনার পাশাপাশি বহু বছরের কোনো পুরনো ভিডিও ছাড়তে শুরু করে। অন্য কোনো ঘটনাকেও এই মাদরাসার বলে ছড়িয়ে দেয়। তবে হ্যাঁ, কিছু ঘটনা যে ঘটে না এমন নয়। আমরাও চাই সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। এমন অসংখ্য ছোট বড় মাদরাসা আছে, যারা দশ-বিশ-ত্রিশ বছর ধরে সুনামের সাথে পরিচালিত হয়ে আসছে। মহিলাদের দীনি শিক্ষার বিস্তার করে চলেছে সুন্দরভাবে। কোনো দোষ তাদের দেখানো যাবে না। তাহলে বিনাদোষে সেসব প্রতিষ্ঠান তো বন্ধ করা যায় না!’
মহিলা মাদরাসার আবাসিক ব্যবস্থার ব্যাপারে মাওলানা নদভী আওয়ার ইসলামকে বলেন, ‘মেয়েরা বাড়ির কাছে পড়াশোনা করবে, এটাই ভালো। তাদের আবাসিক থাকাটা আামি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করিনা। কিন্তু আবাসিক-ব্যবস্থা না থাকলে সমস্যা যেটা হতে পারে—মহিলা মাদরাসার এমন অসংখ্য মেয়ে আছে, যারা নিজেদের বাড়িতে পরিপূর্ণ পর্দা করতে পারে না। এবং অনেকের আবার প্রবাসী, শ্রমজীবী, চাকুরিজীবী বাবা-মা সারাদিন ঘরে থাকে না, ফলে মেয়ে তার নিজের ঘরেও পরিপূর্ণ নিরাপদ না। বিশেষ করে শহরে গার্মেন্টস এলাকায় বাবা-মা চাকরি-বাকরি করেন, মেয়েটাকে কোথায় রাখবেন, সেটার ব্যবস্থা করতে পারেন না, কিংবা বাড়ি থেকে মাদরাসায় চলাচলের পরিবেশ এবং রাস্তাও নিরাপদ থাকে না। রাস্তায় নানান বখাটে ছেলেরা টিজ করে, ডিস্টার্ব করে—তো এসব ক্ষেত্রে বাবা-মা তাদের মেয়েকে মাদরাসায় আবাসিক রাখাই স্বস্তি বোধ করেন। এখন যদি মহিলা মাদরাসার আবাসিক ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয় তাহলে এমন লক্ষ লক্ষ মেয়ে কোথায় যাবে? এদের জন্য তো মাদরাসা একটা আশ্রয়। আর এই সংখ্যাটা এত বেশি পরিমাণ যে, চাইলেই এই ব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়া সম্ভব না। তাছাড়া যাদের বাড়িঘর নিরাপদ, পর্দাপুশিদার ব্যবস্থা ঠিক আছে, তারা তো আর সাধারণত মেয়েকে আবাসিক রাখে না। রাখে তারাই যাদের কোনো না কোনো সমস্যা আছে।’
বেফাকের নিয়ন্ত্রণাধীন মহিলা মাদরাসাগুলোর ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘বেফাকের অধীনে সারাদেশে প্রায় ১৬/১৭ হাজার মহিলা মাদরাসা রয়েছে। বেফাক নিয়মিত তাদের খোঁজখবর রাখে। যেকোনো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। সে মাদরাসাগুলোর ওপর বেফাক বেশ কিছু শর্ত আরোপ করে থাকে। যারা মানেন, তারা তো ভালোই। আর যারা এড়িয়ে যান, তাদেরকে সময় দেওয়া হয়। যেমন, এমন শর্ত আছে, মাদরাসার ভেতরে কোনো হুজুরের আবাসন থাকতে পারবে না। কিন্তু দেখা যায় অনেক মাদরাসার প্রিন্সিপালের পৃথক জায়গায় আবাসস্থল নির্মাণের সামর্থ্য থাকে না। তারা স্ত্রী সন্তানসহ মাদরাসায় থাকেন। এ ক্ষেত্রে তাদের সময় বেধে দিয়ে বলা হয়, যেন নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর সবকিছুর ব্যবস্থা করে।’
বেফাকের শীর্ষ এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সবকিছু মেনে চলার পরও যখন কোনো দুর্ঘটনার সংবাদ আসে, তখন সেটা যাচাইয়ের বিষয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমন হয়—যেসব মাদরাসার ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে, খোঁজ নিলে দেখা যাবে—সেগুলোর সাথে হয়তো অন্য মাদরাসার রেষারেষি আছে, অথবা সে মাদরাসার হুজুরের সাথে এলাকার কোনো প্রতাপশালীর শত্রুতা আছে। সে শত্রুতা ও রেষারেষির ফলে তারা নিজেদের পরস্পরকে সাজানো ঘটনার শিকার বানায়। মিথ্যা প্রচারণা ও মামলা করতেও দ্বিধা বোধ করে না। বাংলাদেশে এমন ঘটনা বহুবার ঘটেছে। প্রথমে অপবাদ রটানো হয়েছে হুজুরের নামে। এলাকাবাসী ক্ষেপে হুজুরকে যাচ্ছেতাই বলেছে, পরে যখন হুজুর নির্দোষ প্রমাণ হন, এলাকাবাসী তখন সরি বলে পাশ কেটে যায় কিন্তু অপবাদ দিয়ে, মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে তার যে ক্ষতি করা হয়েছে, এর কোনো বিচার হয়না।’
মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী বলেন, ‘আসলে এই মহিলা মাদরাসার কারণে, দীনি ইলমের সঙ্গে মেয়েরা পরিচিত হচ্ছে, আজকালকার মেয়েরা নিজেদের ভেতর ইসলাম লালন করার কারণে এ দেশে ইসলাম শক্তিশালী হচ্ছে—যা কি না, বিভিন্ন বিদেশি এজেন্সীর মাথাব্যথার কারণ। তারা চায় না—এদেশের মানুষের ভেতর ইসলামি মূল্যবোধ টিকে থাকুক। তাই তারা কওমি মাদরাসা বন্ধের পাঁয়তারা চালায়। আজ দাবি তুলছে, মহিলা মাদরাসার আবাসিক ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাক, দুদিন পর দেখা যাবে মহিলা মাদরাসাই বন্ধ করে দেয়ার দাবি তোলা হবে।'
মাওলানা নদভী বলেন, ' অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। তবে সত্য মিথ্যা যাচাই ও অভিযোগ তদন্ত না করেই কোনো মানুষের মিডিয়া ট্রায়েল করে ফেলা সুবিচার হতে পারে না। যে কোনো নিউজ, পোস্ট বা ফটো কার্ড পাওয়া মাত্রই তা শেয়ার করে ছড়িয়ে দেওয়া, মিথ্যা প্রচারণা, গীবত এবং অপবাদ দেওয়ার মতো কঠিন গোনাহের কাজ। এ ক্ষতির কোনো প্রতিকার হয়না। এমন পাপের কোনো প্রায়শ্চিত্ত হয় না। সত্য ঘটনা বর্ণনা হলেও একটা কথা কিন্তু মিথ্যা অভিযোগ পাওয়া মাত্রই সারা দুনিয়ায় প্রচার করা দায়িত্বশীল মানুষের কাজ নয়। পরে এই ঘটনা মিথ্যা সাব্যস্ত হলে বা দায়ী ব্যক্তি নির্দোষ প্রমাণিত হলে, প্রচারকরা কি তার সম্মান ফিরিয়ে দিতে পারে? অতএব, মন্দের বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করার ক্ষেত্রেও সবাইকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। ভিউ অর্জনের জন্য কোনো নারী বা পুরুষের সম্মান নিয়ে খেলা করা যাবে না।'
জেডএম/