|| মাওলানা আবু সাঈদ ||
ইসলাম আল্লাহর মনোনীত এবং তাঁর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম। ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু ধর্ম হিসেবে নয়; মানবসভ্যতার বিকাশ, স্থায়িত্ব ও পৃথিবীতে সকল সৃষ্টির শান্তিপূর্ণ অবস্থানের জন্য একটি আদর্শ জীবনব্যবস্থা হিসেবেও ইসলাম প্রয়োজন। ইসলাম ব্যতীত পৃথিবী কাঙাল। পৃথিবী যদি ইসলাম শূন্য হয়, মানবজাতির কাছে যদি ইসলাম পরিত্যক্ত হয়, ইসলাম ব্যতীত মানবরচিত অন্য কোনো ধর্ম বা মতবাদ যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সেটা হবে পৃথিবীতে অবস্থানকারী প্রতিটি সৃষ্টির জন্য দুর্ভাগ্য। অতএব এই পৃথিবীর স্বার্থেই, মানবতার প্রয়োজনে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ইসলামের দাওয়াত প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। প্রতিটি মানুষের সামনে ইসলামের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে হবে।
ইরানের প্রখ্যাত সেই সেনাপতি—মহাবীর রুস্তমের সামনে সাহাবি হজরত রিবঈ ইবনে আমের রা. বিপুল শৈর্য-বীর্য ও দীনি আত্মমর্যাদার বলে বলীয়ান হয়ে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, সেই ভাষণে মূলত ইসলামে দাওয়াতের পরিপূর্ণ রূপরেখা ফুটে উঠেছে। তার ভাষণটি ছিল-
الله ابتعثنا لنخرج من شاء من عبادة العباد إلى عبادة الله، و لنخرج الناس من ضيق الأرض إلى سعتها و جور الأديان إلى عدل الإسلام –
‘মহান আল্লাহ আমাদেরকে পাঠিয়েছেন যেন আমরা মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে একমাত্র আল্লাহর উপাসনার পথে নিয়ে আসি। পৃথিবীর সংকীর্ণতা থেকে বের করে পৃথিবীর প্রশস্ত উন্মুক্ত প্রান্তরে নিয়ে আসি। অপরাপর ধর্ম ও মতবাদের শোষণ থেকে মুক্ত করে ইসলামের ন্যায় ও সাম্যের নেয়ামতে সমৃদ্ধ করি।’
*দাওয়াতের ক্ষেত্র—
বলা যায়, মৌলিকভাবে দাওয়াতের ক্ষেত্র দুটি, যেমন—
ক্ষেত্র-১: মুসলিমদের মাঝে দাওয়াতি কার্যক্রম—
মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও তাদের মাঝে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। ‘হে ইমানদারগণ তোমরা ইমান আনো’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৩৬) এই আয়াতের মাধ্যমে যার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন মহান আল্লাহ।
মুসলিমদের মাঝে দাওয়াতি কার্যক্রমের উদ্দেশ্য দুটি—
১। মুসলিমদের ইসলামের উপর অবিচল রাখা। তাদের আমল সংশোধন ও নিজেদের মাঝে আমলের আগ্রহ-উদ্দীপনা তৈরি করা। যে কাজটি হজরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর মাধ্যমে চালু হওয়া দাওয়াত ও তাবলিগের মেহনতের মাধ্যমে সারাবিশ্বে উল্লেখযোগ্য আকারে চলমান। তাছাড়া হক্কানি পির-মাশায়েখের আত্মশুদ্ধি কার্যক্রমের মাধ্যমে ও মাদরাসা মসজিদ ভিত্তিক দীনি-তালিমের মাধ্যমেও দাওয়াতের এ-মেহনত মুসলমানদের মাঝে চালু আছে। এ-কাজের তত্ত্বাবধানে দীনের গভীর জ্ঞানের অধিকারী ওলামায়ে কেরামকে এগিয়ে আসতে হবে। সাধারণ জনগণকে আরও বেশি পরিমাণে এ-কাজের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করতে হবে। একজন দাঈকে হেকমত, উত্তম নসিহা, চারিত্রিক কোমলতা, ভাষার মাধূর্য, নববি দরদ ইত্যাদি উত্তম গুণে অবশ্যই গুণান্বিত হতে হবে। ঘৃণা নয়, ভালোবাসা দিয়ে মানুষের মন জয় করতে হবে।
২। নতুন প্রজন্মকে ধর্মান্তর ফেতনা থেকে রক্ষা করা। তারা যেন ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে নাস্তিকতা ও ধর্মহীনতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে না-যায়, সে জন্য তাদের মাঝে দীনি মৌলিক শিক্ষা পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা। এ কাজের জন্য কয়েকটি পদ্ধতিতে মেহনত করা যেতে পারে—
ক। স্কুল-কলেজ ইউনিভার্সিটির শিক্ষকদেরকে দীনের উপর নিয়ে আসার বিশেষ মেহনত করতে হবে। তাদেরকে দাঈ বানাতে হবে। কিংবা দাঈদেরকে এ-সকল জায়গায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি এ-সকল অঙ্গনে ইসলাম সম্পর্কিত বিষয়ের শিক্ষক ও দায়িত্বশীলদের সাথে আন্তঃযোগাযোগের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কেননা তারাও স্ব-অবস্থানে থেকে সীমিত পরিসরে দাওয়াতে দীনের কাজ করছেন। তবে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ও ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাতধান না থাকায় কাজটি অপরিকল্পিত, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যহীন ও অগোছালোভাবে হচ্ছে। এ কাজের জন্য হক্কানি ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে যদি একটি মারকাজ গড়ে ওঠে এবং কেন্দ্র থেকে সারা দেশের এসকল দাঈদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা, পরামর্শ প্রদান ও কোনো একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে কর্মসূচী প্রণয়ণ করা হয়, তাহলে এটিই দাওয়াতের একটি বিরাট প্লাটফর্ম হতে পারে। ফলে তাদের এই চলমান খেদমতগুলোই আরোও গতিশীল এবং বেশি ফলপ্রসূ হবে বলে আশা করা যায়। কারণ তাদের সামনে রয়েছে ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভাবী নেতৃত্বদানকারী এক বিরাট জনগোষ্ঠী।
খ। আলেম-ওলামা ও দায়ীদের তত্ত্বাবধানে স্কুল-কলেজ ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করার প্রতি গুরুত্বারূপ করতে হবে। যেখানে স্কুল সিলেবাসই পড়ানো হবে। তবে পাশাপাশি বিশুদ্ধ আকিদা, বিশুদ্ধভাবে কুরআন তেলাওয়াত ও প্রয়োজনীয় দীনি মাসয়ালা-মাসায়েল শিখিয়ে দেয়া হবে। সেখানকার শিক্ষক শিক্ষার্থী সবাই ইসলামি চেতনা ও আদর্শে উজ্জীবিত থাকবেন। ইসলামহীনতা ও বিজাতীয় কালচারের প্রতি থাকবে তাদের অপছন্দ ও ঘৃণাবোধ।
গ। সাধারণ জনগণের জাগতিক শিক্ষার চাহিদা পূরণে দীনি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জীবনঘনিষ্ঠ প্রয়োজনীয় জাগতিক শিক্ষার উপযুক্ত বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ-ক্ষেত্রে মাতৃভাষা ও ইংরেজি ভাষার চর্চা বৃদ্ধি, বিজ্ঞান ও গণিতকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত গুরুত্বের সাথে পাঠদান, ইতিহাস চর্চা, কারিগরি বিদ্যা ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বিষয়গুলোকে সিলেবাসভুক্ত করে এগুলোকে গুরুত্বের সাথে পাঠদান করতে হবে। এতে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়বে। কর্মক্ষেত্রের হতাশা ঘুচবে। দীন ও জাগতিক শিক্ষায় শিক্ষিত লোকগুলো কর্মের বিস্তৃত অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়লে, তাদের দ্বারা দীনি পরিবেশ সৃষ্টি হবে। আশপাশের মানুষের কাছে তাদের আমলী দাওয়াত পৌঁছে যাবে। এক্ষেত্রে মাওলানা সালমান নদভী দা. বা. কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বিত সিলেবাসের প্রতিষ্ঠান ‘রাশাদ একাডেমি, মিরপুর-১২, ঢাকা’ একটি আদর্শ নমুনা হতে পারে।
ক্ষেত্র-২ : অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতি কার্যক্রম—
দাওয়াতের কাজ এমনিতেই একটি প্রজ্ঞার কাজ। হেকমত, প্রজ্ঞা, মনস্তাত্মিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ ছাড়া দাওয়াতের ময়দানে সফলকাম হওয়া কঠিন। নাস্তিকতা, ইসলামবিদ্বেষ ও পশ্চিমাপন্থী মিডিয়ার এ যুগে দাওয়াতি কাজটি যদি অমুসলিমদের মাঝে হয় তাহলে সেটি তো আরো দুরূহ, ঝুকিপূর্ণ ও জটিলতর হয়ে দাঁড়ায়। অতএব অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা বাড়াতে হবে। প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং প্রজ্ঞা ও কৌশলী কর্মপন্থার মাধ্যমে এ অঙ্গনে কাজ করতে হবে।
*অমুসলিম দুই প্রকার—
১। প্রথম প্রকার অমুসলিম—যারা পূর্ব থেকেই অমুসলিম। যারা কখনো ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আসেনি। তাদেরকে ইতিবাচক ভঙ্গিতে দাওয়াত দিতে হবে। কথায় ও কাজে তাদের সামনে ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে হবে। কটাক্ষ কিংবা তাচ্ছিল্যের আশ্রয় না-নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইসলামের সত্যতা, চিরন্তনতা, উপযুক্ততা ও উপকারিতা তুলে ধরতে হবে। ইসলাম ব্যতিত অন্যান্য ধর্মের অসারতা, সমন্বয়হীনতা ও বিকৃতির চিত্র সপ্রমাণ বুঝিয়ে দিতে হবে।
২। দ্বিতীয় প্রকার অমুসলিম—যারা পূর্বে মুসলমান ছিল, অতঃপর কোনো কারণে ইসলামের প্রতি বিরাগভাজন হয়ে কিংবা কোনো প্রতারণা বা লোভের শিকার হয়ে ধর্মান্তরিত হয়ে গেছে। যে বিষয়ে ভুল বোঝাবুঝির কারণে ধর্মান্তরিত হয়েছে তাকে সে সম্পর্কে সঠিক বুঝ এবং তার আপত্তির সন্তোষজনক জবাব প্রদান করতে হবে। যেন তার মনে আর কোনো সংশয় বা সন্দেহ না থাকে। ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণ যদি কোনো প্রলোভন হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রেও তাকে ইমানের মূল্য, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব, আখেরাতের স্থায়িত্ব ও পরিণাম বুঝিয়ে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে তা’লিফে কালবের (আত্মতুষ্টি) জন্য তার জাগতিক প্রয়োজন পূরণ ও বিপদাপদে পাশে থেকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে তার মনে ইসলাম ও ইসলামি জীবন ব্যবস্থার প্রতি আকর্ষণ তৈরি করতে হবে।
*অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতি কার্যক্রমের ফলপ্রসূ পদ্ধতি—
অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে দুটি পদ্ধতি অত্যন্ত নিরাপদ ও ফলপ্রসূ বলে প্রমাণিত।
১। দাওয়াতের ক্ষেত্রে সাধারণ বিষয় নিয়ে অগ্রসর হওয়া। অর্থাৎ যেসকল মহৎ কাজ ধর্মের বিবেচনা ছাড়াই শুধুমাত্র মানবিক বিবেচনায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছেই প্রশংসিত, এরকম কাজে বেশি ফোকাস করা। যেমন: মানবসেবামূলক কাজ, হাসপাতাল নির্মাণ, প্রাকৃতিক দূর্যোগে সহায়তা প্রদান, নগদ আর্থিক অনুদান, সুদমুক্ত ঋণ প্রদান, করজে হাসানা প্রজেক্ট, বৃক্ষরোপন, গবাদি পশু বিতরণ, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন (ঝশরষষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ) ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে প্রথমে তাদের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া। অতঃপর পরিবেশ বুঝে ইসলামের দাওয়াত পেশ করা।
২। বিভিন্ন মিশনারিদের মোকাবিলায় ইসলামি এনজিও প্রতিষ্ঠা করা। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চল ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে এনজিও কার্যক্রম জোরদার করা। এসকল জায়গায় যেন খ্রিষ্টান মিশনারিদের সহযোগিতার প্রয়োজনই মানুষ অনুভব না করে, সেই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আসলে মিশনারি বলতে কী বোঝায়? মিশনারি হলো ‘সংঘবদ্ধ কোনো জনগোষ্ঠী সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য সামনে রেখে তা বাস্তবায়নে পরিকল্পিতভাবে কাজ করে যাওয়া।’ এ অর্থে মসজিদ ভিত্তিক, মাদরাসা ভিত্তিক, অঞ্চল ও সংগঠন ভিত্তিকও এনজিও গড়ে উঠতে পারে। তবে শর্ত হলো সাম্প্রদায়িকতা ও সংকীর্ণ মনোভাব, দল ও ধর্মীয় পরিচয়ের উর্ধ্বে ওঠে উদারভাবে মানবতার কল্যাণে কাজ করে যেতে হবে।
*একজন দাঈ-র গুণাবলী—
১। দাঈকে অবশ্যই নুহ আ. এর মত ধৈর্যশীল হতে হবে।
২। মিষ্টভাষী ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী হতে হবে।
৩। ত্যাগী ও নির্মোহ হতে হবে।
৪। দাঈকে হতে হবে প্রজ্ঞাবান।
৫। দীন অনুযায়ী নিজের জীবনকে পরিচালনা করতে হবে। নিজে আমলকারী হতে হবে।
৬। জাগতিক ব্যাপারেও ভরসা দিতে হবে। ভীতি নয়।
৭। সেবা ও সহযোগিতার মন মানসিকতা থাকতে হবে।
৮। মাদ’উ এর ভাষা, ধর্মীয় অনুভূতি সম্পর্কেও সম্মক ধারণা থাকতে হবে।
৯। হতাশ বা নিরাশ হওয়া যাবে না।
১০। অন্যান্য ধর্ম দর্শনের অসারতা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য দলিল দ্বারাই প্রমাণ করতে সক্ষম হতে হবে।
লেখক: মুহাদ্দিস, মাদরাসা দারুর রাশাদ, মিরপুর-১২, ঢাকা
এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
জেডএম/
