সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬ ।। ১৭ ফাল্গুন ১৪৩২ ।। ১৩ রমজান ১৪৪৭


কাজী সাহেবের পাঠদান ও উপস্থাপনায় ছিল অফুরন্ত মধুরতা: আল্লামা মাহমুদুল হাসান

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

আল্লামা মাহমুদুল হাসান।।

হযরত মাওলানা কাজী মু'তাসিম বিল্লাহ রহ. আজ নশ্বর পৃথিবীতে নেই। তার সাথে আমার পরিচয় সেই ছাত্রজীবন থেকেই। পরে সম্পর্ক আরাে গভীর হয়েছে কর্মজীবনে এসে। একটু বিলম্ব হলেও তার বিস্ময়কর মহতী জীবনের ওপর একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি প্রশংসনীয়।

এই উদ্যোগে শরীক হওয়া আমার জন্য শুধু গৌরবই নয়; তার স্নেহ, মায়া, মমতা এবং জীবন পথে তার দূরদর্শী দিক-নির্দেশনার ঋণ আদায়ের একটা বড় সুযােগও বটে। বাস্তবতা হল, তাঁর বিশাল জীবন সম্পর্কে যখনই ভাবতে যাই আমার হৃদয় মােমের মত বিগলিত হয়ে পড়ে।

হারিয়ে যাই, স্মৃতির গভীর অতলে। সেই স্মৃতি এক বিস্তৃত মহাসমুদ্র। আমার সামান্য সন্তরণবিদ্যার ওপর ভর করে সেই মহাসমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে কিনারায় উঠতে চাওয়া একটি দুঃসাধ্য কাজ বৈকি! এ কারণে কয়েকটি কথা লিখেই ইতি টানব বলে মনস্থির করেছি।

হযরত মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ. ছিলেন একজন অসাধারণ প্রতিভাবান। সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস। তার পাঠদান ও উপস্থাপনায় ছিল অফুরন্ত মধুরতা, প্রাঞ্জলতা আর আবেগ ও তড়পের অভূতপূর্ব মিশ্রণ। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যে তার ব্যুৎপত্তি ছিল অসাধারণ।

তার যােগ্যতা আলিয়া ও কওমী শিক্ষার সমন্বয়ে গঠিত ছিল বিধায় তা ছিল অত্যন্ত ক্রিয়াশীল । এর প্রভাবে অধিক মুতালায়া, পড়াশােনা ও সাহিত্যচর্চায় এক অপূর্ব উদ্দীপনার বহিঃপ্রকাশ ঘটত। যারা কাজী সাহেবের দীর্ঘ সান্নিধ্যসৌরভ লাভ করতে পেরেছেন, তাদের কর্মজীবন আমার এ কথার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। তিনি অসংখ্য চিন্তাশীল ও ওয়াফাদার শিষ্য রেখে গেছেন, যারা ইনশাআল্লাহ তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তার বৈশিষ্ট্যকে উজ্জীবিত করবে বলে আশা রাখি।

কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ. এক ক্ষণজন্মা মহান পুরুষ। তিনি তদানীন্তন স্বনাম বড় উলামা-মাশায়েখের নিকট শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহণ করেছেন। ফল দেখে গাছ সমানে সুনিশ্চিত ধারণা নেওয়া যায়, তেমনি কাজী সাহেবের কর্মকাণ্ডে শায়খুল ইসলাম মাওলানা সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর আদর্শ সম্বন্ধে জানা যেত।

তিনি ছিলেন হযরত মাদানী রহ.-এর একজন খাঁটি আশেক। তাই তার কর্মময় জীবনের পাতায় পাতায় মাদানীর আদর্শ, ত্যাগ, দয়া, মায়া, মহব্বত ও দেশপ্রেম এবং বৃটিশের প্রতি গর্জন ও বলিষ্ঠ কণ্ঠের ক্ষিপ্রতা প্রকাশ পেত। হযরত মাদানীর জীবনী ছিল তার মনমানসিকতা গঠনের বিশেষ উপাত্ত।

তিনি কেবল মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষককে নিয়ে ভাবতেন না। তার জীবনের ফিরিস্তিতে যে কীর্তি ও সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা আমাদের জীবন পথের পাথেয়! তিনি ছিলেন দিনের আলােয় সাবধানী হয়ে থাকা নীরব সাধক।

তার অনন্য প্রতিভা ও সূক্ষ্ম চিন্তাধারার কারণে অল্পদিনেই তিনি প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন তরুণ সমাজের কাছে। চিন্তাধারা, লেখালেখি ও বাংলাসাহিত্যে তিনি যে নজির স্থাপন করেছেন, তা আশা জাগিয়ে ছিল হতাশ তরুণদের মনে।

এমনকি বাংলাদেশে যখন কাদিয়ানী নামে ইসলামবিরােধী ষড়ন্ত্রের সেই ঝড়াে হাওয়া বয়ে চলছিল, তখন পাঠদানের পাশাপাশি সেই ঝড়াে হাওয়া মােকাবেলায় কঠিন প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

তার নেতৃত্ববলয় ছিল কাদিয়ানীবিরােধী আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। নানা রকম জাতীয় সমস্যা ও তার সমাধান নিয়েও তার চিন্তাভাবনার যেন অন্ত ছিল না। কেবল বক্তৃতা-বিবৃতি কিংবা বাগ্মিতার আদলেই নয়, তিনি বিভিন্ন বিষয়ে ছােটবড় বই পুস্তকও রচনা করেছেন। বক্তৃতা ও বয়ানের ন্যায় তার প্রবন্ধ ও রচনাবলীতেও বাগ্মীসুলভ বলিষ্ঠতা ও স্বতঃস্ফূর্ততার জোয়ার সৃষ্টি হত, যেমনটি অনলবর্ষী বক্তা ও সিদ্ধহস্ত। অলঙ্কারবিদ লেখকদের বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকে বাস্তবতায় বিশ্বাসী কাজী সাহেব যা সত্য মনে করতেন, তা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলে যেতেন।

আর সমাধানের পথ খুঁজতেন। এ ক্ষেত্রে কোনাে ভয় বা প্রলােভন তাকে কখনাে দমাতে পারেনি। তার জীবন ছিল একেবারেই সরল ও সাদাসিধে। পরােপকারিতায় নিজেকে ভুলে যাওয়া ত্যাগী চরিত্রের কারণে তাকে অনেক বেগ পােহাতে হয়েছে; দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে।

কিন্তু তিনি ছিলেন নিজ স্বার্থের বেলায় নীরব দর্শক; সর্বাবস্থায় ছিলেন অমায়িক সহিষ্ণু। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা বা প্রতিশােধপ্রবণতা তার রক্তে ছিল না। হাসিমুখে সকলকে বরণ করে নেওয়া ছিল তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

কাজী সাহেব আলিয়াতেও পড়াশােনা করেছেন। আলিয়াতেই তার মুলজীবন গঠিত হয়, কিন্তু তার স্বভাব-চরিত্র, ভাবধারা ছিল একেবারেই কওমী। সে কারণেই তিনি একা যেমন সরকারী আলিয়া মাদরাসায় প্রথম মুহাদ্দিস হিসাবে বুখারীর দরস দিয়েছেন। তেমনি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও হাদীসের দরস দান করেছেন।

এ ছাড়া তিনি জামিয়া ইমদাদিয়া কিশােরগঞ্জে আকাশচুম্বী সাফল্যের সাথে বুখারীর দরস দান করেছেন। এর আগে তিনি। বড়কাটারা মাদরাসায়ও হাদীসের শিক্ষকতা করেছেন। সে সময় সুপ্রসিদ্ধ ছিল তাঁর দরস।। কেবল মুহাদ্দিস হিসাবেই নয়। তিনি যশাের দড়াটানা মাদরাসা এবং ঢাকার অন্যতম প্রাচীন মাদরাসা তাঁতিবাজার মাদরাসারও একাধারে মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস ছিলেন। তার ইহতিমামের যুগেই মাদরাসাটির ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়।

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান মালিবাগ মাদরাসা। সত্যি বলতে কি, মালিবাগ মাদরাসার সুনাম সুখ্যাতির মূলে কাজী সাহেবের নামটিই প্রধানত চলে আসে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি সেখানকার মধ্যমণি হয়ে উঠেছিলেন।

যদিও তিনি ইহতিমাম পরিচালনার প্রতি উদগ্রীব ছিলেন না, তবু পরিস্থিতির কারণে যেখানেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, সেখানেই তার পরিচালনার যােগ্যতা ও দক্ষতার সুফল প্রকাশ পেয়েছে। মালিবাগ মাদরাসা এর অন্যতম প্রধান দৃষ্টান্ত।

কাজী মু'তাসিম বিল্লাহ সাহেব ছিলেন সংস্কারপন্থী সুদক্ষ গবেষক। মাদরাসার শিক্ষাদীক্ষা, যােগ্য লােক তৈরি এবং যুগােপযােগী শিক্ষা-সিলেবাস প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নিয়েও তার চিন্তাধারার শেষ ছিল না।

এত চিন্তাধারা, ভাবনা ও পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও তিনি। সঠিকভাবে কাজ করার জন্য যে ধরনের উপকরণ ও লােকবলের প্রয়ােজন ছিল, তিনি তা পাননি; তবু হতাশা তার জীবনে ঠাঁই পায়নি।

এক সময় তিনি ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে তিন শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি মক্তব ও হিফজখানার সম্প্রসারণকরণের জন্য কর্তৃপক্ষের ডাকে সাড়া দিয়ে নিজ পরিকল্পনামাফিক তা বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখেন।

৬৯ এ যখন এটুকু স্থানে বৃহত্তম পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মনস্থির করলেন, তখন আমি তাঁরই ইঙ্গিতে যশােরে এক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছি।

তিনি আমার নিকট পত্র পাঠালেন, তােমার সাথে আমার যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে তা পূরণের জন্য পত্র পাওয়ামাত্র চলে এসাে। কতটা অন্তরঙ্গ হলেই কেবল এমনটি হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমি ইস্তফা দিয়ে সারারাত সফর করে ভােরবেলায় যাত্রাবাড়ী হাজির হই। মাদরাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। কিন্তু ছয় মাস পর হযরত বিনুরী সাহেব রহ. আমাকে ডেকে পাঠান। তখন কাজী সাহেবের কাছ থেকে অনেক চেষ্টা তদবিরের পর ছুটি নিয়ে নিউটাউনে চলে যাই। ইতােমধ্যে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। '৭৫ এ আমি বাংলাদেশে আসি। কাজী সাহেবের সাথে যাত্রাবাড়ী মাদরাসায় সাক্ষাৎ করি।

এ যাবৎ হযরত আব্দুল্লাহ দরখাস্তী মাদরাসার প্রতিষ্ঠাকালীন মুহতামিম হিসেবে কাজী সাহেবই দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। পরবর্তী সময়ে মুরুব্বি হিসেবে অনেকটা আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বীয় শায়খ হযরত মাওলানা তাজাম্মুল আলী সাহেব রহ.-এর হাতে ইহতিমামের দায়িত্ব সােপর্দ করেন।

কিন্তু পরিতাপের সাথে বলতে হয়, এক বিশেষ পরিস্থিতির কারণে কাজী সাহেবের যাত্রাবাড়ীতে আর থাকা হল না। এর বছর দুই পরে তার শায়খও কোনাে এক কারণে যশাের গিয়ে আর ফিরে আসেননি। তখন আমাকেই ইহতিমামের দায়দায়িত্ব বুঝে নিতে হয়।

মৃত্যুর প্রাক্কালেও একান্ত মুহূর্তে আমি কাজী সাহেবকে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেছিলাম, আমার কাছে দেওয়া আমনত যথাযথ আছে কি না যদি স্বচক্ষে একবার দেখে আসতেন,.!

তিনি বললেন, আল্লাহ পাক তােমার মাধ্যমে আমার আশার বাস্তবায়ন ঘটিয়েছেন। আমি সুস্থ হলে মাদরাসায় অবশ্যই যাব। কিন্তু তার যাওয়া-আসা আর আমার আনার ব্যাপারটি তাকদীরের অধীনেই রইল। আল্লাহ পাক তাকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করুন।

(২০১৭ সালে জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ কর্তৃক প্রকাশিত ‘শায়খুল হাদীস আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ. স্মারক গ্রন্থ’ থেকে নেয়া।)

লেখক: শায়খুল হাদিস ও মুহতামিম, জামিয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী ঢাকা। আমীর, দাওয়াতুল হক।

ওআই/আবদুল্লাহ তামিম


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ