সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ।। ২৮ পৌষ ১৪৩২ ।। ২৩ রজব ১৪৪৭


ইসলামী আন্দোলনের মেয়রপ্রার্থী শেখ মাসউদের নির্বাচনী ইশতেহার

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

আওয়ার ইসলাম: দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ, নগর সরকার প্রতিষ্ঠা, সর্বস্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ওয়ার্ডভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণসহ দুর্নীতি ও দূষণমুক্ত স্মার্ট ঢাকা গড়তে ৩১ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেন মেয়রপ্রার্থী মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ।

আজ রোববার সকাল ১১ টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ রিপোর্টার্স ইউনিটির স্বাধীনতা হলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে হাতপাখা প্রতীকের মেয়রপ্রার্থী অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়।

ইশতেহার ঘোষণা ও সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহা. রেজাউল করিম বলেন, ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। সিটি নির্বাচন নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার মিডিয়ায় হুংকার দিলেও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে তারা যে মোটেও আন্তরিক নয়, নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের বক্তব্যে তা স্পষ্ট। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ধুলোয় মিশে যাবে জনগণ তা হতে দিবে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকার ও নির্বাচন কমিশন যৌথভাবে ৩০ ডিসেম্বরের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চাচ্ছে।

তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এ ঢাকা আন্দোলন- সংগ্রামের সুতিকাগার। সুতরাং ঢাকা সিটি নির্বাচনে ৩০ ডিসেম্বরের পুনরাবৃত্তি হলে জনগণ তা রুখে দাঁড়াবে ইনশাআল্লাহ।

নগরবাসীর উদ্দেশে চরমোনাইয়ের পীর বলেন, চারশ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বসবাসের অযোগ্য শহর। যানজট, জলজট, ধুলোবালি, বর্জ্য, মাদক, চাঁদাবাজি ও দূষণে নগরজীবন আজ বিপর্যস্ত। ঢাকা আজ মৃতপ্রায়। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। তিনি মৃতপ্রায় ঢাকাকে বাঁচাতে হাতপাখাকে বিজয়ী করতে নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।

মেয়রপ্রার্থী মাসউদ ১০০ দিনের মধ্যে নগরীর যানজট নিরসনসহ দৃশ্যমান নাগরিক সুবিধা প্রদানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, নাগরিক সেবা প্রদানই আমার প্রধান লক্ষ্য। তিনি দুর্নীতি ও দূষণমুক্ত স্মার্ট ঢাকা গড়তে নগরবাসীর সমর্থন, দোয়া ও ভালোবাসা কামনা করেন।

ঢাকার সমস্যা ও নিরসনে মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদের ৩১ দফা ইশতেহার ঘোষণা

নীতিগত প্রস্তাবনা- ১. দুর্নীতিমুক্ত করা।

দুর্নীতি একটি সর্বগ্রাসী মহামারি। ডেঙ্গু নিয়ে যখন শহরব্যাপী আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিলো তখন টিআইবির প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে, ‘মশার ঔষধ ক্রয়ের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে ঘুষ লেনদেন ও দুর্নীতি হয়েছে রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশনেই’ ((NTV online/২৫ সেপ্টেম্বর-২০১৯)। একটি প্রাণঘাতি সমস্যার ক্ষেত্রেও দুর্নীতি করা সিটি কর্পোরেশন কর্মকর্তাদের দুর্নীতির খতিয়ান দিলে বিশাল শ্বেতপত্র হবে। আমি নির্বাচিত হলে যে কোন মূল্যে ডিএনসিসিকে দুর্নীতি মুক্ত করব, ইনশাআল্লাহ।

২. স্বচ্ছতা আনয়ন: আমি নির্বাচিত হলে সিটি কর্পোরেশনে স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে, এই প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটি কাজ কখন, কিভাবে কার মাধ্যমে করা হবে বা হচ্ছে তা ডিএনসিসির সব নাগরিককে জানান হবে। সিটিজেন চার্টার প্রদর্শন করা হবে। তথ্যের অবাধ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত জানান হবে।

৩. জবাবদিহি: আমি মেয়র নির্বাচিত হলে সর্বস্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে, প্রতিমাসে Open Discussion Session-এ জনগণের মুখোমুখি হবো। ডিএনসিসির প্রতিটি ওয়ার্ড কমিশনার ও ডিএনসিসির বিভিন্ন বিভাগের নির্বাহীগণও নিয়মিত জনতার মুখোমুখি হবেন। নগর ভবন সকল নগরবাসীর জন্য উন্মুক্ত থাকবে। ওয়ান স্টেপ সেবা প্রদান করা হবে। নগরীর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা প্রণয়নে নাগরিকদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হবে।

৪. শ্বেতপত্র প্রকাশ: আমি নির্বাচিত হলে, ডিএনসিসি বিগত বছরগুলোর কার্যক্রম ও দুর্নীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। কাউকে লাঞ্চিত করা বা কাউকে হেয় করতে নয়; বরং আগামীতে দুর্নীতির পথ বন্ধ করতেই এই পদক্ষেপ নেয়া হবে। আমার ও সব ওয়ার্ড কমিশনার ও ডিএনসিসির কর্মকর্তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রতি বছর প্রকাশ করা হবে।

৫. নগর বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন
ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন একটি বহুমাত্রিক ও বহুরৈখিক জটিল বিষয়। আমি নির্বাচিত হলে,
দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি নগর বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হবে।

৬. নগর সরকার: আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন ও সংস্কার। সিটি কর্পোরেশনকে গতিশীল ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে মেট্রোপলিটন গভর্নমেন্ট বা নগর সরকার গঠন করা একান্ত প্রয়োজন। বর্তমানে ব্রিটিশ-পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক কাঠামো ও আইন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে দেশের সিটি কর্পোরেশনগুলো। সিটি কর্পোরেশনে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ জন্য বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনগুলো নগরবাসীর চাহিদা অনুযায়ী সেবা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে। হোল্ডিং ট্যাক্স, আবর্জনা পরিস্কার আর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ছাড়া দৃশ্যত সিটি কর্পোরেশনগুলোর আর কোনো কর্মকান্ড চোখে পড়ছে না।

কার্যত নাগরিক সেবার মধ্যে থাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পয়ঃপ্রণালি, জলাবদ্ধতা, যানবাহন, সড়ক, নগর পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ, যানজট এবং নাগরিক নিরাপত্তায় আধুনিক নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন; যা পুরাতন আইন ও ব্যবস্থা দিয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পানি, পাতাল রেল, মনো রেল ও যানজটমুক্ত শহরসহ নগরবাসীর সেবা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় নগর সরকার প্রয়োজন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব নগর সরকারে মেট্রোপলিটন কাউন্সিল থাকবে। মেট্রোপলিটন কাউন্সিলে সব শ্রম-র্কম-পেশার প্রতিনিধি, সব সেক্টর কর্পোরেশন, অধিদপ্তর, সমবায়, এনজিও, নারী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধি থাকবে।

ঢাকার সমস্যা ও নিরসনে প্রস্তাবনা- ১. বায়ুদূষণ: বায়ুমান যাচাই বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘এয়ার ভিজ্যুয়াল’-এর তথ্যমতে, গত নভেম্বরে ৮ দিন বায়ুদূষণে ঢাকা বিশ্বে শীর্ষে ছিল। পর্যবেক্ষণ বলছে, বছরে ২০০ দিন ঢাকার বাতাস প্রচন্ড অস্বাস্থ্যকর থাকে। দূষিত শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া মাত্রার চেয়ে ঢাকার বাতাসে ক্ষুদ্র কণার পরিমাণ ১০ গুণ বেশি। বায়ু দূষণে ঢাকার ২৪.৫% শিশুর ফুসফুসের সক্ষমতা দ্রুত কমে যায়। বায়ু দূষণের কবলে ঢাকার গাছপালার টিকে থাকার ক্ষমতা ৩০% কমে যাচ্ছে।

আমি নির্বাচিত হলে, বায়ু দূষণের এই ভয়াবহতা থেকে ঢাকাবাসীকে রক্ষা করতে UN Environment and the Climate and Clean Air Coalition প্রস্তাবিত ‘25 science-based effective measure to reduce air pollution’ অনুসরণ করা হবে। জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে ঢাকার উন্নয়ন কর্মকান্ড ও রাস্তার ধুলোবালি নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

যত্রতত্র রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করা হবে। কোনো কারণে রাস্তা খোঁড়ার প্রয়োজন হলে ধুলোবালি নিয়ন্ত্রণ পদ্ধাতি অনুসরণ করা হবে। ঢাকা উত্তরের প্রতিটি রাস্তায় দিনে অন্তত ২বার পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা হবে। ঢাকা উত্তরের সড়ক দ্বীপগুলো সবুজায়ন করা হবে এবং রাস্তার পাশ্ববর্তী স্থানেও সবুজায়ন করা হবে। ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে উৎসাহিত করা হবে এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি নিষিদ্ধ করা হবে।

২. পানি সমস্যার সমাধান: বিশুদ্ধ পানির সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। গত ৩ জুলাই’১৯ হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত কমিটির দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকার ওয়াসার পানিতে ব্যাক্টেরিয়া, উচ্চ মাত্রার অ্যামোনিয়া এমনকি কিছু মলও পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকা ওয়াসার দূষিত পানি পান করে লাখ লাখ মানুষ বিশেষ করে শিশুরা অধিকহারে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। দূষিত পানির কারণে মানুষ ডায়রিয়া, কলেরা, জন্ডিস, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, কিডনি, লিভারসহ নানা জটিল ও প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

আমি নির্বাচিত হলে, ঢাকায় পানি সরবরাহের জন্য অন্তত আরো দু’টি পানি শোধনাগার স্থাপন করা হবে। শীতলক্ষ্যা থেকে পানি এনে তা শোধন করে সরবরাহ করা হবে। ঢাকার পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা হবে। ঢাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে সাধারণ নাগরিকদের প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ দেওয়া হবে। ঢাকার খাল-বিল, নদী উদ্ধার করে ভ‚-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা হবে। পানির অপচয়রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা হবে।

৩. নদীদূষণ: ঢাকার নদীদূষণ এখন ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে। ঢাকার কোনো কোনো নদীতে কোনো ধরনের প্রাণী বেঁচে থাকার মতো অবস্থা নেই। জলাধারের প্রতি লিটারে অন্তত ৫ মিলিগ্রাম দ্রবীভূত অক্সিজেন না থাকলে সেখানে কোনো প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না। অথচ ঢাকার নদ-নদীতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা ০.১৫ এর মত। ঢাকার নদীর পানি এতো বেশি দূষিত ও দুর্গন্ধময় যে তার পাশ দিয়ে মানুষ যেতে পারে না।

আমি নির্বাচিত হলে, ঢাকার নদীগুলো বাঁচিয়ে রাখতে কঠিন বর্জ্য পদার্থ পানিতে মেশার পথ বন্ধ করা হবে। মানব বর্জ্য ব্যবস্থার জন্য আলাদা ভাবে ট্রিটমেন্ট প্লান বাস্তবায়ন করা হবে। বুড়িগঙ্গার উত্তর অংশ, তুরাগ ও বালু নদী উদ্ধার করে পানি সংরক্ষণ করা হবে। বুড়িগঙ্গার সব ধরনের পয়ঃবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্য ডাইভারশন সুয়ারেজ লাইনের মাধ্যমে পাগলা সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টে নিয়ে যাওয়া হবে। জলাভূমি ও নদীতে কঠিন বর্জ্য নিক্ষেপ বন্ধ করা হবে।

৪. শব্দদূষণ: আন্তর্জাতিক আইন ও মান অনুযায়ী শব্দের সহনীয় মাত্রা ৪০-৪৫ ডেসিবল। অথচ পরিবেশ সংগঠন পবার মতে, রাজধানীর নীরব এলাকাতেও দিবাকালীন শব্দের মাত্রা ৭৫-৯৭ ডেসিবল। আর বাণিজ্যিক এলাকায় ৭১ থেকে ১০৭ ডেসিবল। উচ্চ মাত্রার শব্দ দূষণের কারণে উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, শ্রবণশক্তি হ্রাস, মনোসংযোগ কমে যাওয়া, মাথা ব্যাথা ও মাথাধরার মতো জটিল শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছে নগরবাসী।

আমি নির্বাচিত হলে, শব্দ দূষণ রোধে ঢাকার যানবহনে হাইড্রোলিক হর্ন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হবে। ঢাকায় মাইক ও শব্দযন্ত্র ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হবে। ২০০৬-এর শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা এর আলোকে নগরীর জন্য শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।

৫. দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড: ঢাকার দূষণ বহুমাত্রিক। এর ব্যাপকতাও বিস্তৃত। ২৩ জানুয়ারি ২০২০ গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, ঢাকার দূষণের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত বায়ুদূষণও দায়ী। তাই ঢাকাকে দূষণমুক্ত করতে হলে প্রয়োজন ধারাবাহিক ও সমন্বিত কার্যক্রম।

আমি নির্বাচিত হলে, দূষণ প্রতিরোধে ‘দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড’ প্রতিষ্ঠা করা হবে।

৬. খাদ্যে ভেজাল: গত ২ মে ২০১৯ বিএসটিআই এক প্রতিবেদনে জানায়, তারা খোলা বাজার থেকে ২৭ ধরণের ৪০৬টি খাদ্য পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ৫২টি নিম্নমানের ও ভেজালপণ্য রয়েছে। যদিও এটা দেশব্যাপী করা তারপরেও এর মাধ্যমে ঢাকার খাদ্যে ভেজালের ভয়াবহতা বোঝা যায়।

আমি নির্বাচিত হলে, খাদ্যে ভেজাল রোধে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হবে। নিয়মিত বাজার পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করা হবে। যে কোনো পণ্য বাজারজাত করার জন্য সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হবে।

৭. পরিকল্পিত ঢাকা: ঢাকা ৪০০ বছরের একটি ঐতিহ্যবাহী শহর। বর্তমানে ঢাকা পৃথিবীর সর্বোচ্চ জনঘনত্বের শহরে পরিণত হয়েছে। নিপোর্ট-এর তথ্যানুযায়ী প্রতিদিন ঢাকা শহরে জনসংখ্যা বাড়ছে ১৪১৮ জন হারে। ঢাকার প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে ৪৫ হাজার মানুষ বাস করে। ফলে ঢাকা শহর প্রতিদিনই দৈর্ঘ্য ও প্রস্তে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে তা কোনো ধরনের সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়াই। ১৯৫৯ সালে ঢাকা শহরের জন্য ২০ বছর মেয়াদি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা হয়। তা ছিল ১৫ লাখ মানুষের জন্য। এখন ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি। কিন্তু ১৫ লাখ মানুষের জন্য করা পরিকল্পনা দিয়েই ঢাকা চলছে। ২০১০ সালে ড্যাপ প্রণয়ন করা হলেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।

আমি নির্বাচিত হলে, পরিকল্পিত ঢাকা গড়তে স্মার্ট শহরের আদর্শমান অনুসারে ঢাকায় ৩০% খোলা জায়গা, ২০% রাস্তা, ১৫% জলাশয় ও ২৫% সবুজায়ন নিশ্চিত করা হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাথে পরামর্শ করে নগরের সাথে সম্পৃক্ত সব মন্ত্রনালয় ও নগরবিদদের নিয়ে একটি পরিকল্পনা করে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

৮. যানজট: ২০১৭ সালে প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের এক রিপোর্ট অনুযায়ী যানজটের কারণে রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। একই কারণে বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের সময় নষ্ট হয়। বুয়েটের তথ্যানুযায়ী ঢাকা শহরে যানজটের গতি ঘণ্টায় মাত্র ৫ কি.মি.। ২০২৫ সালে যা ৪ কিমিতে নেমে আসতে পারে। বিআইডিএস-এর জরিপ মতে ৯১.৫% মানুষ যানজটকে ঢাকার প্রধান সমস্যা বলে চিহ্নিত করেছে। স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট এসটিপির হিসাব মতে, বর্তমানে ঢাকার ১৫% যাত্রী ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে অথচ তারা রাস্তার ৭০% এর বেশি জায়গা দখল করে রাখে। ট্রাফিক বিভাগের হিসাব মতে সড়কের কমপক্ষে ৩০% জায়গা দখল করে থাকে অবৈধ পার্কিং বা অন্য দখলদাররা।

আমি নির্বাচিত হলে, ঢাকার যানজট সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা স্থাপন করা ও ফ্রাই াইজিভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু করা হবে। নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট নাম্বারের ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তা থেকে নিষিদ্ধ করা হবে। সড়ককে অবৈধ পার্কিং ও দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধার করা হবে।

৯. ওয়ার্ডভিত্তিক পরিকল্পনা: আমি নির্বাচিত হলে, ঢাকা উত্তরের ৫৪টি ওয়ার্ডের প্রতিটি নিয়ে স্থানীয়দের সাথে পরামর্শ করে প্রতি ওয়ার্ডের জন্য আলাদা আলাদা পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করা হবে। ওয়ার্ডভিত্তিক খোলা জায়গা, মাঠ, ঈদগাহ, কমিউনিটি সেন্টার, মশক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, পানি ও গ্যাস সরবরাহ লাইন স্থাপন, ইউটিলিটি ট্যানেল, প্রয়োজনীয় সেবা কর্মী, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, মাতৃসদনসহ জরুরি সব সেবা প্রদানের নিশ্চয়তা দিয়ে প বার্ষিক পরিকল্পনা করা হবে।

১০. বিল্ডিং কোডের যথাযথ অনুসরণ: আমি নির্বাচিত হলে, আগামী ৬ মাসের মধ্যে ঢাকা উত্তরের প্রত্যেকটি বিল্ডিংকে আলাদা আলাদা ভাবে পর্যবেক্ষণ করে বিল্ডিংগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করা হবে। প্রতিটি ভবন দুর্যোগ-সহিঞ্চু করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা হবে। নতুন নির্মাণাধীন প্রতিটি ভবনকে ‘বিল্ডিং কোড’ মানতে বাধ্য করা হবে।

১১. দুর্যোগ-সহিঞ্চু নগর: ঢাকায় আগুন একটি ভয়ঙ্কর মর্মান্তিক দুর্যোগ। একই সঙ্গে ঢাকা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। আমি নির্বাচিত হলে, ঢাকাকে দুর্যোগ সহিঞ্চু করে গড়ে তুলতে মসজিদভিত্তিক দুর্যোগ প্রশমনকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।
ঢাকার নাগরিকদের জন্য দুর্যোগ মোকাবিলার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হবে।

১২. বাসা ভাড়া: ঢাকার ৭০% মানুষ ভাড়া বাসায় থাকেন। ঢাকার বাসা ভাড়া নিয়ে কোনো কার্যকর বিধিমালা নাই। কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণও নেই। লাগামহীনভাবে প্রতিবছর বাসা ভাড়া বেড়েই চলছে। নাগরিককে তার আয়ের ৩০%-এর বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে বাসা ভাড়ার পেছনে।

আমি মেয়র নির্বাচিত হলে, ঢাকার বাসা ভাড়ার কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা করা হবে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সর্বোচ্চ ২০% বাসা ভাড়া কমিয়ে দেওয়া হবে।

১৩. স্মার্ট পার্কিং: আমি নির্বাচিত হলে, ঢাকায় যানজট থেকে মুক্তির জন্য স্মার্ট পার্কিং ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অল্প স্থানে বেশি গাড়ি পার্কিং করা হবে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে ঢাকার অন্তত ৫টি স্থানে স্মার্ট পার্কিং-এর ব্যবস্থা করা হবে। পর্যায়ক্রমে সমগ্র ঢাকাকেই স্মার্ট পার্কিং-এর আওতায় আনা হবে।

১৪. ফুটপা : ঢাকার বেশির ভাগ ফুটপাত অবৈধ দখলে রয়েছে। বাকিগুলোতেও নেই নিরাপত্তা। নেই পর্যাপ্ত লাইটিং ব্যবস্থা। ফলে পথচারীরা যত্রতত্র রাস্তা ব্যবহার করছে এবং তাতে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও যানজট।

আমি নির্বাচিত হলে, দখলকৃত ফুটপাতগুলো উদ্ধার করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। ফুটপথে জীবিকা নির্বাহী হকারদের নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসন করা হবে। ফুটপথ আরো বেশি নিরাপদ ও আরামদায়ক করতে ফুটপাতের ধারে সবুজায়ন করা হবে। রাতে পর্যাপ্ত লাইট ব্যবস্থা রাখা হবে এবং প্রতি ১ কিলোমিটার অন্তর একটি বিশ্রামাগার তৈরি করা হবে।

১৫. পাবলিক টয়লেট: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মোট ওয়ার্ডের সংখ্যা ৫৪। এর মধ্যে নতুন ওয়ার্ড ১৮টি। ১৯৬.২২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই সিটি করপোরেশনে গণশৌচাগার আছে মাত্র ২৫টি। পথচারী লাখ লাখ মানুষ বিশেষত নারীরা ভয়ঙ্কর বিব্রত পরিস্থিতির শিকার হন।

আমি নির্বাচিত হলে, টয়লেট সমস্যা সমাধানে প্রতি ১ কিলোমিটার অন্তর একটি করে গণশৌচাগার নির্মাণ করা হবে।

১৫. মশক নিধন: ২০১৯ সালে জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতি, অযোগ্যতা ও দায়িত্বে অবহেলার কারণে ডেঙ্গু মহামারিতে রূপ নিয়েছিলো। ২০১৯-এর ১ জানুয়ারি থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে ৫১ হাজার ৬৮০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। ঢাকার বাইরে ৪৯ হাজার ৪৩৩ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। দেশব্যাপী ডেঙ্গু মূলত ঢাকা থেকে ছড়িয়েছে এবং রক্ষণশীল সরকারি হিসেবেই ১৪১ জন ডেঙ্গুতে মারা গেছে। (জাগো নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ১৮ ডিসেম্বর-২০১৯) যদিও বেসরকারি হিসেব মতে এই মৃত্যুর সংখ্যা আরো বেশি। হাজার হাজার মানুষের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়া, শত শত মানুষ মারা যাওয়া এবং শহর জুড়ে দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টির পুরো দায় সিটি কর্পোরেশনের। ৩১ জুলাই প্রথম আলোর প্রতিবেদন বলছে, ‘সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অকার্যকর ঔষুধ কিনেছে সিটি কর্পোরেশন’। মশা নিয়ে মেয়রদের অবহেলা ও মানুষের মুত্যু নিয়ে উদসীনতা হতাশ করেছে গোটা জাতিকে।

আমি নির্বাচিত হলে, মশা নিয়ন্ত্রণে মশক ও ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণে মেয়র হিসেবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কীট নিয়ন্ত্রণ বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত ও কার্যকর করা হবে। প্রতিটি মহল্লায় ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে মশক নিয়ন্ত্রণ কমিটি করা হবে। প্রতিদিনই মহল্লাভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

১৭. রাস্তাঘাট: আমি নির্বাচিত হলে, রাস্তা নিয়ে মানুষের ভোগান্তি লাঘব করতে স্বল্প মেয়াদে ঢাকার রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করতে বছরের শুরুতে নগরীর সঙ্গে সম্পৃক্ত সব সংস্থাকে নিয়ে বৈঠক করে সমন্বয় করা হবে। দীর্ঘ মেয়াদে ঢাকায় ইউনিলিটি ট্যানেল তৈরি করা হবে এবং সব সেবা সেই ট্যানেল দিয়ে নেওয়া হবে। নতুন সম্পৃক্ত সব ওয়ার্ডের রাস্তাগুলো ৬ মাসের মধ্যে মেরামত করা হবে।

১৮. বস্তি: ঢাকা শহরে ২০১৪ সালের শুমারি অনুযায়ী বস্তির সংখ্যা মোট ৩ হাজার ৩৯৪ টি। প্রায় সাড়ে ২২ লাখ মানুষ এসব বস্তিতে বসবাস করে। গত ৬ বছরে এই সংখ্যা আরো বেড়েছে নিশ্চয়ই। সরু পথ, অন্ধকার খুপড়ি, নোংরা গোসলখানা ও টয়লেট আর আবর্জনা ইত্যাদি নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করা এ বস্তিবাসীদের নিয়ে সিটি কর্পোরেশন কোনো কাজ করে না। ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন বলছে, ডিএনসিসির এলাকাভুক্ত কড়াইল, ভাষানটেক ও চলন্তিকা বস্তি ঘিরে ২৪টি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এ সব বস্তি থেকে মাসে তারা ২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা আয় করে। এ সিন্ডিকেট রোধ করতে ডিএনসিসির মেয়র কার্যত কোনো ভূমিকা নেননি।

আমি মেয়র নির্বাচিত হলে, বস্তিগুলো চাঁদাবাজ ও মাস্তান মুক্ত করে নগর কর্তৃপক্ষের অধীনে নেওয়া হবে। বস্তিগুলোয় প্রয়োজনীয় মানবিক সেবা নিশ্চত করা হবে। দীর্ঘ মেয়াদে তাদের পুনর্বাসন করা হবে।

১৯. মাদক: ঢাকায় বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা দশ লাখের বেশি। ঢাকার একজন মাদকসেবী মাসে গড়ে ১১,৩৩৪ টাকা খরচ করে। ঢাকায় শিশু মাদকাসক্তের সংখ্যা ১০.৭ শতাংশ। যা দেশের মধ্যে শীর্ষে।

আমি নির্বাচিত হলে, ঢাকাকে মাদক মুক্ত করতে প্রতিটি ওয়ার্ডে ধর্মীয়, সামাজিক ও বিশিষ্ট নাগরিক নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে মাদক নির্মূল কমিটি করা হবে। নিয়মিত মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হবে। শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

২০. খাল: ঢাকায় এক সময় শতাধিক খাল ছিল। বর্তমানে ৪৮টি খালের কথা স্বীকার করা হলেও ২৬টি কোনো রকম টিকে আছে। যে ২৬টি টিকে আছে তারও বেশির ভাগ অংশ দখল হয়ে গেছে। ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ এটি।

আমি মেয়র নির্বাচিত হলে, সব ধরনের রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে ঢাকার দখলকৃত খাল উদ্ধার করে বর্ষার পানি মওজুদ করা হবে। কোনো শিল্প কারখানার বর্জ্য কোনো খাল ও নদীতে পড়তে দেওয়া হবে না।

২১. মাঠ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষের জন্য ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা প্রয়োজন। ঢাকায় আছে মাত্র ১ বর্গমিটার। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি)-এর তথ্য মতে জনসংখ্যার ভিত্তিতে ঢাকার ১ হাজার ৩০০ খেলার মাঠ থাকার কথা। সেখানে আছে মাত্র ২৩৫টি। যেগুলো আছে তার মাত্র ৪২টিতে সাধারণের প্রবেশের অধিকার আছে। ১৬টি সরকারি মাঠ বিভিন্নভাবে দখল হয়ে গেছে। রাজউকের মতে, ঢাকায় দখল হওয়া মাঠ ও পার্কের পরিমাণ ৬ হাজার ৯০০ একর। বিআইটির তথ্য মতে, ঢাকা সিটি উত্তরে ৩৬টি ওয়ার্ডে ৬১০টি মাঠের ঘাটতি আছে।

আমি নির্বাচিত হলে, সকল দখলকৃত মাঠ ও পার্ক ৬ মাসের মধ্যে উদ্ধার করা হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে হিসাব করে মাঠ ও পার্ক স্থাপন করা হবে।

২২. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সিটি কর্পোরেশনের প্রধানতম কাজ। চলতি বছরে শুধু ডিএনসিসি এলাকাতে দৈনিক ৫ হাজার ২০০ টন বর্জ্য তৈরি হবে। প্রতি বছর প্রায় ২১.৯৩ শতাংশ বর্জ্য বৃদ্ধি পায়। এই বিপুল বর্জ্যরে ৭৮ শতাংশই হলো অর্গানিক বর্জ্য। যার কোনো সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই। এই বর্জ্য পঁচে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি মিথেন গ্যাস তৈরি করে। এই গ্যাস কার্বনডাই অক্সাইডের চেয়েও ২১ গুণ বেশি বিপদজনক। সিটি কর্পোরেশন প্রতি বছর গৃহকরের ৩ শতাংশ পরিচ্ছন্নতা বাবদ নিলেও তারা বাসাবাড়ি থেকে সরাসরি বর্জ্য সংগ্রহ না করে সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে দেয়। সিন্ডিকেট অনেক ক্ষেত্রে বাসা প্রতি ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করে। তারা রাজধানীবাসীকে জিম্মি করে বছরে অনন্ত ৪৫০ কোটি টাকার ময়লা বাণিজ্য করে। গত ৪ ডিসেম্বর দুদকের তদন্ত দল জানায়, বর্জ্য সংগ্রহে প্রতি ডিএনসিসির কার্যত কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। ডিএনসিসিতে ২০২১ নাগাদ ৫ হাজার ২০০ টন বর্জ্য তৈরি হবে।

আমি নির্বাচিত হলে, বর্জ্যরে দুর্গন্ধ থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করতে

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে five R strategy-তে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আনা হবে। রিডিউস, রিইউজ, রিকভার, রিপারপাজ ও রিসাইকেল নীতিকে সামনে রেখে Strategic West Management ব্যবস্থা করা হবে। তরল বর্জ্যরে ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের (ইটিপি) ইনফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট-এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

২৩. জলাবদ্ধতা: সিটি কর্পোরেশনের দুর্নীতিগ্রস্ত, অদক্ষ, দায়বদ্ধহীন ও সেবাদানকাী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতা এবং দায় এড়ানোর মানসিকতার কারণে নগরবাসীকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। গত ১ অক্টোবর ২০১৯ মঙ্গলবার ৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই ঢাকা শহর ডুবে যায়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্রটি, নালা-খাল-নদী পর্যন্ত পানি যাওয়ার প্রক্রিয়াটি নির্বিঘœ না হওয়া এবং পর্যাপ্ত জলাধার না থাকায় জলাবদ্ধতা বাড়ছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসা ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। ঢাকা ওয়াসার অধীনে ৩৮৫ কি.মি. গভীর নর্দমা ১০ কি.মি. বক্স কালভার্ট, ৮০ কি.মি. খাল এবং ৩৬০ কি.মি. পানি নিষ্কাশন নেটওয়ার্ক রয়েছে। অন্য দিকে দুই সিটি কর্পোরেশনের অধীনে ২০০০ কি.মি. নর্দমা, ১২০০ কি.মি. ভ‚-গর্ভস্থ পাইপ লাইন, তন্মধ্যে সিটি উত্তরের অধীনে ৭০০ কি.মি. পাইপ লাইন ১৮ কি.মি. নর্দমা ২০০ কি.মি. পানি নিষ্কাশন নেটওয়ার্ক এবং ৪.৫ কি.মি. বক্সকালভার্ট রয়েছে।

আমি নির্বাচিত হলে, জলাবদ্ধতা নিরসনে স্বল্প মেয়াদে ওয়াসার সঙ্গে সমন্বয় করে বিদ্যমান পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার যথাযথ ব্যবহার করা হবে। পানি নিষ্কাশন নেটওয়ার্ক পরিষ্কার করা হবে। দীর্ঘ মেয়াদী কার্যক্রম হিসেবে ঢাকার খাল-বিল ও জলাশয় উদ্ধার করা হবে।

২৪. নগরস্বাস্থ্য: ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে মাত্র ৫টি মাতৃসদন, ২৭টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ৫৪টি স্যাটেলাইটকেন্দ্র রয়েছে। প্রায় ১ কোটি নগরবাসীর জন্য এ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র কতটা অপ্রতুল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ৮৬টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র দিয়ে ১ কোটি মানুষকে সেবা দেওয়া এক কথায় অবাস্তব এবং নগরবাসীর সঙ্গে উপহাস করার নামান্তর। তার পরও গণমাধ্যমে প্রকাশ এ নামমাত্র সেবা কেন্দ্রগুলোয় ডাক্তার থাকে না। ঔষধ থাকে না।

আমি মেয়র নির্বাচিত হলে, নগরে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চত করতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে মাতৃসনদ প্রতিষ্ঠা করা হবে। সর্বসাধারণের জন্য একটি করে নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। মাতৃসদন ও নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সার্বক্ষণিক ডাক্তার ও নার্সের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে।

২৫. সিটিজেন চার্টার: সিটিজেন চাটার হলো, সরকারি অফিসে একজন নাগরিক কি কি সেবা কত দিনের মধ্যে কার কাছে কিভাবে পাবেন তার ঘোষণা।

আমি নির্বাচিত হলে, সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি অফিসে সিটিজেন চার্টারের প্রকাশ্য প্রদর্শন বাধ্য করা হবে। সিটিজেন চার্টারের যথাযথ বাস্তাবায়ন নিশ্চিত করা হবে।

২৬. হকার ও ছিন্নমূল শিশুদের পুনর্বাসন: ঢাকায় বিভিন্ন রেল স্টেশনে ছিন্নমূল শিশুরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। শিক্ষা ও পরিবেশের অভাবে তারা মাদকাসক্ত হয়ে এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে অংশ নিয়ে জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘিœত করছে।

আমি নির্বাচিত হলে, ফুটপাতে হকারদের থেকে সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করা হবে। ছিন্নমূল শিশুদেরকে শিক্ষা ও সমাজবোধ জাগ্রত করার জন্য শিশু শিক্ষা ও শোধনাগার প্রতিষ্ঠা করা হবে। হকারদের স্থায়ী পুনর্বাসন করা হবে এবং ভ্রাম্যমাণ হকারদের সিটি কর্পোরেশন থেকে পরিচয়পত্র প্রদান করা হবে। ছিন্নমূল বস্তিবাসীদের জানমালের নিরাপত্তা জোরদার করা হবে।

২৮. নারীবান্ধব গণপরিবহণ: আমি নির্বাচিত হলে, নারীদের সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় ঢাকায় গণপরিবহনে নারীদের জন্য বিশেষ পরিবহন সার্ভিস ব্যবস্থা করা হবে। নারীদের উঠা নামার জন্য প্রতিটি বাস স্টপেজে আলাদা ব্যবস্থা করা হবে। গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করা হবে।

২৯. নাগরিকের নৈতিক উন্নয়ন: রাজধানী হিসেবে দেশের সভ্যতা সংস্কৃতি নির্মাণের মূল জায়গা হলো ঢাকা সিটি। এটা সভ্যতার অন্যতম নিদর্শন। পারস্পরিক সম্মানবোধ অপরের প্রতি সহানুভতি প্রদর্শন, আতিথেয়তা, মুসাফিরের পথ দেখানো ঢাকা শহরের পুরানো ঐতিহ্য।

আমি নির্বাচিত হলে, ঢাকায় বাঙালীর চিরায়ত ইতিহাস, ঐতিহ্য, সম্মানবোধের ধারণা, সামাজিক সম্পর্কের উন্নয়ন করা হবে। নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ কমিয়ে আনা হবে। বয়স্কদের পরিবারে সম্মানের আসনে রাখার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

৩০. জাকাত বোর্ড: মহান আল্লাহর নির্দেশনা অনুসারে ধনীদের সম্পদের ২.৫% জাকাত হিসেবে প্রদান করতে হয়। প্রত্যেক মুসলমানের ওপরে তা ফরজ। একই সঙ্গে এই সম্পদ গরিবের অধিকার বলে ইসলাম নির্দেশনা দিয়েছে। ঢাকা শহরে জাকাত ফরজ হওয়া মানুষের সংখ্যাও যেমন অনেক, তেমনি অভাবী মানুষের সংখ্যাও অনেক। জাকাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একদিকে যেমন মুসলিম ধনীদের দায়মুক্ত করা যায়, তেমনি অভাবীদের অভাব পূরণ করা যায়।

আমি মেয়র নির্বাচিত হলে, ঢাকা উত্তর সিটিতে জনপ্রতিনিধি, সাবেক বিচারপতি ও আলেমদের সমন¦য়ে জাকাত বোর্ড গঠন করা হবে। যার মাধ্যমে সুষ্ঠু জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

৩১. সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি: ১. হিজড়া : বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে ১০ হাজারের মতো হিজড়া জনগোষ্ঠি আছে। তাদের বেশির ভাগই ঢাকায় বসবাস করেন। নগরবাসী হিজড়াদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। অন্যদিকে হিজড়ারা বলছে, তারা নিরুপায়। তাই হিজড়া জনগোষ্ঠি নিয়ে বাস্তবমুখী কাজ করা দরকার।

আমি নির্বাচিত হলে, হিজড়া পুনর্বাসন কন্দ্রে গড়ে তোলা হবে। তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মক্ষম করে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা হবে।

২. ভিক্ষুক: সংসদের তথ্যানুসারে বাংলাদেশে আড়াই লাখ ভিক্ষুক। যাদের বেশির ভাগ ঢাকায় বসবাস করে। আমি মেয়র নির্বাচিত হলে, ঢাকার ভিক্ষুক, পাগল, লাওয়ারিস ও পথবাসী মানুষদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তেলা হবে। কর্মে অক্ষমদের ভরণপোষন সিটি কর্পোরেশন বহন করবে।

ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ, রাজনৈতিক উপদেষ্টা অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন, যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, সহকারী মহাসচিব আলহাজ্ব আমিনুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ূম, সহ-প্রচার সম্পাদক মুফতি দেলোয়ার হোসাইন সাকী , ঢাকা মহানগর উত্তর সহ-সভাপতি আলহাজ্ব আনোয়ার হোসাইন, সেক্রেটারি মাওলানা আরিফুল ইসলাম প্রমুখ।


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ