আব্দুল্লাহ আল মুবিন।।
মুদ্রার অপর পিঠের মতই পৃথিবীতে আসার আরেক অর্থ হলো এখান থেকে বিদায় নেয়া। মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে প্রত্যেক প্রাণীর। সেই অমোঘ নিয়ম মেনেই চলে গেলেন আল্লামা আশরাফ আলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি।
পৃথিবী তাঁকে বিদায় জানালো চোখে জল নিয়ে। তিনি চলে গেছেন, রেখে গেছেন তাঁর স্মৃতি, অক্ষয় কীর্তি।
তাঁর ইন্তেকালে যে শূন্যতা তৈরি হল তা কি আর পূরণ হবে? রাববুল আলামীনের কাছে হৃদয়ের মিনতি, তিনি যেন আমাদের দান করেন তাঁর উত্তম উত্তরসূরী হওয়ার তাওফিক।
জীবনের সিংহভাগ অধ্যাপনার খিদমাত আঞ্জাম দিয়েছেন তিনি। হাদিসে নববীর দরস দান করেন প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল ধরে। ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় আসার সুবাদে হযরতকে আমার দেখার সৌভাগ্য হয়। ২০১৮ সনের শুরুর দিকে বেফাকের মিটিংয়ে তিনি ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় তাশরিফ আনেন। সকাল ৯টায় মিটিং শুরু হয়ে দুপুর ১টায় আল্লামা আহমদ শফীর আলোচনা ও দোয়ার মাধ্যমে শেষ হয়।
আমরা আহমদ শফী সাহেবকে বুখারীর দরসে আনতে চাইলে হুজুর অসুস্থ থাকায় সেটা মনজুর হয়নি। শেষে আব্দুল কুদ্দুস সাহেব নিজেই বলেন, তোমরা বরং আল্লামা আশরাফ আলী সাহেবকে নিয়ে যাও। আমরা সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম। আসলে এটা রব্বে কারীমেরই ফায়সালা ছিলো। হুজুরের কাছ থেকে শেষ বরকত হাসিল করা। আমাদের বিনীত অনুরোধে অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও আশরাফ আলী সাহেব দাওরা হাদিসের দরসে আগমন করেন।
মূল্যবান নসিহতের পাশাপাশি বুখারির বিভিন্ন হাদিসের তাকরীরের মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে মুগ্ধ করেন। দরস ছিল সাবলীল ও প্রাঞ্জল, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ। এতো বৃদ্ধ বয়সেও তাঁর কণ্ঠস্বর ছিলো সুস্পষ্ট ও জোরালো। পরিশেষে মোনাজাতের মাধ্যমে আলোচনার ইতি টানেন।
শুরু হয় নীরব দহন। নিঃশব্দে মোনাজাত হৃদয়ে এমন তরঙ্গজোয়ার আনে! মনে হয় নুরের একটা জ্যোতি। তা আমাদেরও বেষ্টন করে নিচ্ছে।
সামনের দু'হাত তোলা মানুষটি যদিও নীরব, হৃদয়ে তার কান্নার তরঙ্গ, আমাদেরও যেন তা স্পর্শ করছে। পরম শান্তির সুশীতল একটি প্রবাহ হৃদয় ও আত্মাকে স্নিগ্ধতা দান করলো। হৃদয়ের গভির থেকে একটি আশ্বাস যেন উৎসারিত হচ্ছে। এমন মোনাজাতে আমাদের নামেও লেখা হয়েছে কিছু না কিছু প্রাপ্তি।
নববী হাদিসের দ্যুতি ছড়িয়ে দিয়ে দারুল হাদিস থেকে যখন বের হন, তখন তালিবে ইলমরা তাঁর পেছনে পেছনে যাচ্ছিল, যেন প্রজ্জ্বলিত প্রদীপের পেছনে ছুটে চলছে আলোক প্রেমিক পতঙ্গ! গাড়িতে উঠে উপস্থিত ছাত্রদেরকে সুমধুর কণ্ঠে সালাম দিলেন। শ্রোতারা সালামের জওয়াব দিল এবং মুগ্ধ দৃষ্টিতে শুধুই তাকিয়ে থাকল তাঁর গমনপথের দিকে।
তাঁর হাজার হাজার ছাত্র আছে যাঁরা ইসলামের এই চিরসজীব ধারাকে সমুন্নত রেখেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন বেফাক বোর্ডের সিনিয়র সহ সভাপতি ও আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়ার মহাপরিচালক আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ। তার এই ছাত্র বেশ কিছু দিন ধরে রোগশয্যায় শায়িত আছেন। দীর্ঘদিন ব্যাংককে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
রোগশয্যা থেকেই প্রাণপ্রিয় উস্তাদের প্রতি স্মৃতিচারণ মূলক শোক বার্তা প্রেরণ করেন তিনি। শোক বার্তায় তিনি বলেন, উস্তাদে মুহতারাম শায়খুল হাদীস আল্লামা আশরাফ আলী রহ. রব্বে কারীমের ডাকে সাড়া দিয়ে আমাদেরকে শোকাহত করে চলে গেলেন। তিনি আমার মুহতারাম উস্তাদ, আল-জামিয়াতুল ইমদাদিয়ায় যখন তিনি শিক্ষকতা করতেন, তখন আমি তার কাছে পড়েছি।
তিনি আল-জামিয়াতুল ইমদাদিয়ার মজলিসে শুরার সভাপতি ছিলেন। মরহুম ছিলেন জাতির দূরদর্শী, চিন্তাশীল এক অভিভাবক। উলামায়ে কেরাম এ দ্বীনদরদী মুসলিম সমাজের একজন মুরুব্বী। তার নিয়ােগে জাতি একজন অভিভাবক হারিয়েছে, আমরা মুরুব্বী শুণ্য হয়েছি।
আল্লামা আশরাফ আলী গত কয়েকমাস ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বিভিন্ন স্থানে তাঁর সুস্থতার জন্য দো’আ হচ্ছিল, কিন্তু আল্লাহ রাববুল আলামীনের ইচ্ছা ছিল ভিন্ন।
অবশেষে সোমবার (৩০ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত ১টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর আসগর আলী হাসপাতালে এই নশ্বর জগত থেকে বিদায় নেন। হাজারো ভক্ত, অনুরক্ত, ছাত্র-শিষ্য ও আত্মীয় স্বজনকে শোকসাগরে ভাসিয়ে চলে যান তিনি।
আল্লাহ তাআলা অভিভাবককে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন, আখেরাতে তাঁর দরজা বুলন্দ করুন এবং আমাদের সবাইকে সবর করার এবং তাঁর পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমিন।
-ওএএফ