ড. মো. ইব্রাহীম খলিল
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৭ সালের পর বাংলাদেশের কোনো কলেজে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালুর একটি আবেদনও বিবেচনা করেনি। সরকারি কলেজগুলোতে অনুসৃত হয়েছে ভিন্ন ধারা। বিভাগ ছিল কিন্তু শিক্ষক ছিল না। শিক্ষকের মৃত্যু বা বদলির পর নতুনভাবে কাউকে পদায়ন করা হয়নি। ফলে অঘোষিতভাবে বিভাগটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগটি ছিল সেখানেও আসন কমেছে আশংকাজনকভাবে। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮০টি আসনের বিপরীতে বর্তমান আসন ১০০টি।
স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়েও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ খোলা হয়নি। যেমন কুমিল্লা, বরিশাল ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। পাকিস্তানি শাসনের শেষ লগ্নে চালু হওয়া (১২/১/১৯৭১) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগটি নেই। ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি’ নাম দিয়ে চালু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কলা ও সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের কিছু বিষয় থাকলেও একটিতেও নেই ইসলামিক স্টাডিজ। অনেকেই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলতে পারেন। ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেই যাত্রা শুরু হয়েছিল, বর্তমানে বরং এর গতি-প্রকৃতি প্রতিষ্ঠাকালীন আকাঙ্ক্ষার বিপরীত দিকে। আর ২০০৫ সালে জগন্নাথ কলেজকে যখন বিশ্ববিদ্যালয় করা হয় তখন আগে থেকেই কলেজে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়টি ছিল বরং অন্য অনেক বিভাগের চেয়ে প্রবলভাবে ছিল (কলেজে ডে-শিফটের পাশাপাশি ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের নাইট শিফটও ছিল)। আর জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় তো আগে থেকেই চালু থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে। নতুনভাবে কিছু চালু করেনি।
আমাদের প্রত্যাশা শীঘ্রই পরিস্থিতি পরিবর্তন হবে। সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ চালু হবে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও বিভাগটি খোলা হবে। পাশাপাশি ইসলামিক স্টাডিজ ব্যতীত অবশিষ্ট সকল বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য আবশ্যিক একটি ‘ইন্ট্রোডাকশন টু ইসলাম’ কোর্স চালু হবে। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির মধ্যে মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি কোর্স চালু আছে।
আগে থেকে চালু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর সাথে নতুনভাবে যদি অবশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামিক স্টাডিজ চালু হয়, কলেজগুলোও যদি এই পথ অনুসরণ করে, তাহলে বাংলাদেশে এককভাবে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সংখ্যা হবে সবচেয়ে বেশি। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জগন্নাথ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধীন কলেজগুলোর পাশাপাশি ইসলামি-আরবি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সার্টিফিকেটধারী শিক্ষার্থীই বের হবে।
তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উত্থাপিত হবে, এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থানের উপায় কী? উপায় আছে অসংখ্য।
প্রথমত, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ইসলাম শিক্ষাকে নানা গুচ্ছের বেড়াজালে ফেলে যেভাবে তুচ্ছ করা হয়েছে তা তুলে দিতে হবে। বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য একে নৈর্বাচনিক বিষয় হিসেবে (চতুর্থ বিষয় হিসেবে নয়) উন্মুক্ত রাখতে হবে। তাহলে সকল কলেজে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক প্রয়োজন হবে।
দ্বিতীয়ত, অনার্স ও মাস্টার্স স্তরে ইসলামিক স্টাডিজ ব্যতীত অবশিষ্ট সকল বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম শিক্ষার একটি পূর্ণাঙ্গ আবশ্যিক কোর্স থাকবে। সেখানেও বিপুল সংখ্যক শিক্ষক প্রয়োজন হবে।
তৃতীয়ত, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সিলেবাসে ইসলামি ব্যাংকিং ও ইন্সুরেন্স বিষয়ক প্রয়োজনীয় সংখ্যক কোর্স রেখে সিলেবাস সংস্কার করতে হবে এবং সকল ইসলামিক ব্যাংকিং, ইন্সুরেন্স ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ তখন তারা একইসাথে ইসলাম ও ব্যাংকিং দু ধারাতেই দক্ষ থাকবেন। (কয়েক বছর আগে সেন্ট্রাল শরীআহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশ-এর সাথে এমন একটি মতবিনিময় সভায় আমি ছিলাম এবং সেন্ট্রাল শরীআহ বোর্ড খুবই আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু আমরাই নানা কারণে সিলেবাস সংস্কারের কাজ করতে পারিনি।)
চতুর্থত, বিসিএস এবং এ জাতীয় সকল চাকরিতে ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, শিক্ষার্থীদেরকে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জবমার্কেটের জন্য যোগ্য করে তুলতে হবে। যেমন কর্মকর্তা, দাঈ, শিক্ষক, ইমাম ইত্যাদি পদের জন্য। কেবল শ্রমিক নয়।
ষষ্ঠত, শিক্ষার্থীদেরকে চাকরিমুখী মানসিকতার পরিবর্তে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার উপযোগী শিক্ষা দিতে হবে এবং সেভাবেই শিক্ষাক্রম বিন্যস্ত করতে হবে।
আপাতত আমার ভাবনা এতটুকুই। তবে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। সিদ্ধান্ত হওয়া দরকার। জাতীয় পর্যায়ে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালানো প্রয়োজন।
লেখক: শিক্ষক, জনগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
আরএইচ/