বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬ ।। ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ৪ জিলহজ ১৪৪৭


কুরবানি: ত্যাগের মহিমা ও তাকওয়ার শিক্ষা


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| হাসনাইন সারওয়ার ||

বছর ঘুরে এলো কুরবানি। ইবরাহিমি চেতনায় উজ্জীবিত হওয়ার সোনালি সময়। কুরবানি ইসলামের অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আমাদের আজকের প্রচলিত এই কুরবানির—আল্লাহর নবী হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম থেকেই পাওয়া। এজন্যই কুরবানিকে বলা হয় সুন্নতে ইবরাহিমি।

ইবরাহিম আলাইহিস সালাম স্বপ্নে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে কলিজার টুকরা আপন পুত্র ইসমাইল কে কুরবানির আদেশ পান। তিনি প্রিয় পুত্রকে কাছে ডেকে নিজ স্বপ্নের কথা বলেন। শিশু ইসমাইল পিতার কথা শোনে দ্বিধা-সংশয়হীন চিত্তে সম্মতি প্রকাশ করেন। দৃড়তার সাথে বলেন, ‘সম্মানিত পিতা, অবশ্যই আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।’

এর পরের ঘটনা আমাদের সবারই জানা। সুরা সাফফাতে এর বিস্তারিত বিবরণ এসেছে।

পিতা-পুত্র—ত্যাগ, সমর্পণ ও উৎসর্গের যে পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন, খোদাপ্রেমের এ অনুপম নাজরানা আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত পছন্দ করেছেন। তাই কিয়ামত অবধি আগত সকলের জন্য তাঁদের এই কর্মকে অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় বানিয়ে দিয়েছেন।

প্রতি বছর ঈদুল আজহা আসে। এ-দিনে আমরা কুরবানি করে থাকি। কিন্তু এখান থেকে যে মহান শিক্ষাটা গ্রহণ করা জরুরি—তা আমরা অনেকেই বাস্তব জীবনে ধারণ করি না।

কুরবানির অন্যতম একটি শিক্ষা হলো—সকল ভালো ও নেক কাজ একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য করা। আল্লাহর হুকুম পালনে যেকোন ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতা রাখা।

হজরত ইবরাহিম ও ইসমাইল আলাইহিমাস সালাম আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আদেশ পালনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন নি। আল্লাহ তাআলা চান, তাঁর সকল বান্দাই যেন এ-রকম ইমানদার ও আল্লাহমুখি হয়। আমাদের প্রিয় নবীজিকে উদ্দেশ করে আল্লাহ বলেছেন—قل ان صلاتي و نسكي و محياي و مماتي لله رب العالمين .لا شريك له و بذلك امرت و انا اول المسلمين.

আপনি বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ আমার কুরবানি আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোন শরিক নেই। এরই আদেশ করা হয়েছে আমাকে এবং আমিই (এই উম্মতের) প্রথম আনুগত্যকারী। (সুরা আনআম, আয়াত: ১৬২-১৬৩)

উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্বোধন করে গোটা মুসলিম জাতিকে বার্তা দিয়েছেন—‘মুমিনের জীবনের সবকিছুই হবে একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের লক্ষে। কুরবানিসহ সকল ইবাদত কেবল আল্লাহর জন্যই করবে। তাঁর জন্য প্রাণোৎসর্গ করতেও সদা প্রস্তুত থাকবে।

আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও নিজ কুরবানির পশু জবাইয়ের সময় উপরোক্ত আয়াতের কথাগুলো উচ্চারণ করতেন। হাদিসে বর্ণিত আছে, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন দুম্বা জবাইয়ের সময় বলতেন,

اني وجهت وجهي للذي فطر السماوات والارض علي ملة ابراهيم حنيفا. وما انا من المشركين. ان صلاتي و نسكي و محياي و مماتي لله رب العالمين. لا شريك له و بذلك امرت و انا من المسلمين.

আমি আমার মুখ তাঁর অভিমুখী করলাম,যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, ইবরাহিমের মিল্লাতের উপর, যিনি একনিষ্ঠ ছিলেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয়ই আমার নামায আমার কুরবানি আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎ সমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোন শরিক নেই। আমাকে এরই আদেশ করা হয়েছে এবং আমি আনুগত্যকারীদের অন্তর্ভুক্ত। (সুনানে আবু দাউদ—২৭৯৫, মুসনাদে আহমাদ—১৫০২২)

পশু জবাই হলো, আল্লাহর আদেশ মতো কুরবানির বাহ্যিক রূপ। কুরবানি এভাবেই করতে হবে। কুরবানির গোশত আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য মেহমানদারি। আল্লাহ তাআলা মূলত বান্দার অন্তরের রূপটা দেখতে চান। কুরবানির রক্ত গোশত কোন কিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, পৌঁছে বান্দার তাকওয়া ইখলাস ও অন্তরের নিয়ত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—

لن ينال الله لحومها ولا دماؤها ولكن ينال التقوي منكم.

আল্লাহর কাছে সেগুলোর গোশত পৌঁছে না এবং সেগুলোর রক্তও না। বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া। (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)

কুরবানির পশু জবাইয়ের মাধ্যমে মূলত আল্লাহ তাআলা দেখেন, বান্দা তাঁর হুকুম ও সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ মনোভাব রাখে কিনা। কুরবানিসহ যাবতীয় ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য করার মতো নিয়ত ও ইখলাস আছে কিনা।

প্রিয়নবীর হাদিস থেকেও একথা সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ দেখেন বান্দার ইখলাস ও অন্তরের নিয়ত। নবীজি বলেন—ان الله لا ينظر الي صوركم و اموالكم و لكن ينظر الي قلوبكم و اعمالكم.

আল্লাহ তাআলা তোমাদের রূপ ও আকৃতি এবং সম্পদের দিকে তাকান না, বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও আমল। (সহিহ মুসলিম—২৫৬৪, মুসনাদে আহমাদ—৭৮২৭)

অতএব কেউ যদি তাকওয়া ও ইখলাসের সাথে যথাযথভাবে কুরবানি আদায় করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ে উত্তম প্রতিদান দিবেন।

উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ما عمل ادمي من عمل يوم النحر احب الي الله من اهراق الدم ،انه لياتي يوم القيامة بقرونها و اشعارها و اظلافها و ان الدم ليقع من الله بمكان قبل ان يقع من الارض.

কুরবানির দিনের আমল সমূহের মধ্যে পশু কুরবানি করার চেয়ে আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় কোন আমল নেই। কিয়ামতের দিন এই কুরবানির পশুকে তার শিং পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে। আর কুরবানির রক্ত জমিনে পড়ার আগে আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কুরবানি করো। (সুনানে তিরমিজি—১৪৯৩)

নবীজির প্রিয় সাহাবি জায়েদ ইবনু আরকাম রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—قال اصحاب رسول الله صلي الله عليه و سلم: يا رسول الله ما هذه الاضاحي ؟ قال : سنة ابيكم ابراهيم قالوا: فما لنا فيها يا رسول الله ؟ قال: بكل شعرة حسنة قالوا: فالصوف؟ يا رسول الله قال: بكل شعرة من الصوف حسنة.

রাসুলের সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন ইয়া রাসুলুল্লাহ! কুরবানির তাৎপর্য কী? (কেনো আমরা জবাই করে থাকি?) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা তোমাদের পিতা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সুন্নত। তারা জিজ্ঞেস করলেন, এতে আমাদের কী সওয়ার রয়েছে? তিনি বললেন, প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে। তারা আবার জিজ্ঞেস করলেন, পশমের মধ্যে যে ছোট ছোট লোম রয়েছে এগুলোর বিনিময়ে কী?

তিনি বললেন : হ্যাঁ এগুলোর বিনিময়েও একটি করে নেকি রয়েছে। (সুনানে ইবনে মাজাহ—৩১২৭)

বিশিষ্ট সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রা. কে উদ্দেশ করে বললেন—قومي الي اضحيتك فاشتريها فان لك باول قطرة تقطر من دمها يغفر لك ما سلف من ذنوبك قالت يا رسول الله! هذا لنا اهل البيت خاصة او لنا للمسلمين عامة ؟ قال: بل لنا و للمسلمين.

তুমি তোমার কুরবানির পশুর নিকট জবাই সময় উপস্থিত থাকো। কেননা তার প্রথম রক্তের ফোটা জমিনে পড়ার সাথে সাথে তোমার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। ফাতেমা রা. বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! এটা কি শুধু আমাদের নবী পরিবারের জন্যই খাছ নাকি ব্যাপকভাবে আমাদের ও সকল মুসলমানের জন্য? তিনি বললেন, আমাদের জন্য এবং সকল মুসলমানের জন্য। (মুস্তাদরাকে হাকেম—৭৫২৫)

এ মহান ফজিলতপূর্ণ ইবাদতের প্রাণ হচ্ছে ইখলাস ও তাকওয়া। কাজেই আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইখলাসের সাথে কুরবানি করার তাওফিক দান করুন। গোটা মুসলিম জাতিকে কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা বাস্তব জীবনে ধারণ করার মতো শক্তি সাহস ও ধৈর্য দান করুন।

জেডএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ