শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬ ।। ২৭ চৈত্র ১৪৩২ ।। ২২ শাওয়াল ১৪৪৭


২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ডলার ছুঁবে বাংলাদেশ, সরকারের প্রতিশ্রুতি

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সংসদে দেওয়া বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময়ের অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা, সামাজিক বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকার এরইমধ্যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরপরই প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্বাধীন সরকার দ্রুত কার্যক্রম হাতে নেয়।

আমির খসরু বলেন, গত দীর্ঘ ১৬ বছরের দুঃশাসন, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও লুটপাট, সামাজিক বৈষম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ধ্বংসের প্রক্ষাপটে জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তার নির্বাচনি ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট, লক্ষ্যভিত্তিক এবং বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচি ঘোষণা করে। যার পরিপ্রক্ষিতে জনগণ ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট উৎসবের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে দেশ পরিচালনায় নিরঙ্কুশভাবে নির্বাচিত করেছে। নির্বাচিত হয়েই কালবিলম্ব না করে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি, বলেন অর্থমন্ত্রী।

জনগণকে দেওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের উল্লেখযোগ্য নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।

প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে—

>বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে প্রাথমিক ভাবে ৫০ লক্ষ ‌‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান, যা এরইমধ্যে শুরু করা হয়েছে এবং পর্যক্রমে সব পরিবারকে প্রদান করা হবে।

> প্রকৃত কৃষক, মৎস্যজীবী ও প্রাণিসম্পদ খামারিদের জন্য 'কৃষক কার্ড' প্রদান, যার পাইলটিং ইতোমধ্যে করা হয়েছে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফ করা, যা ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।

>এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে সড়ক, রেল, নৌ ও বন্দর অবকাঠামোর আধুনিকীকরণ, সুনীল অর্থনীতি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ ও ইকো-ট্যুরিজম খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

> দেশজুড়ে আঞ্চলিক সৃজনশীল হাব গড়ে তোলার মাধ্যমে এখাতে ৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃজন।

> আন্তর্জাতিক বাজারে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে নতুন ব্র্যান্ড চালু।

> ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির আওতায় ১২-১৪ বছরের প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদদের বৃত্তি প্রদান।

> রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী ও অটোমেশনের মাধ্যমে কর-জিডিপির অনুপাত মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশ ও ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ উন্নীতকরণ।

> ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীতকরণ।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উন্নয়ন নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, উন্নয়নের সুফল যাতে প্রতিটি নাগরিক ভোগ করতে পারে। পাশাপাশি, সৃজনশীল অর্থনীতি যেমন- আর্ট, কালচার, স্পোর্টস ইত্যাদিকে গুরুত্ব প্রদানের মাধ্যমে উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করা। এ জন্য সরকারের উন্নয়নের অন্যতম স্লোগান হলো-‘২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি’, যা অর্জনে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা নিরসন, সুশাসন নিশ্চিত করা ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে- বলেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, এক্ষেত্রে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি তথা এডিপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে বিধায় সরকার বর্তমান আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আগামী অর্থবছর হতে এডিপিতে বরাদ্দ যৌক্তিক পরিমাণে বৃদ্ধি করতে এবং কৌশলগত উন্নয়ন দর্শনের সঙ্গে সম্পদের বরাদ্দ সমন্বয় করে প্রকল্প গ্রহণে পরিকল্পনা কমিশনকে গুরত্ব দিয়েছে। এর পাশাপাশি চলমান প্রকল্পগুলোকে পর্যালোচনা করে জনগুরুত্বহীন, বহুদিন ধরে চলমান ও অর্থায়ন-বিবর্জিত ‘জম্বি’ প্রকল্প (অচল প্রকল্প) চিহ্নিত করে বাতিলের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই-এর গুণমান বৃদ্ধি, প্রকল্প বাস্তবায়ন কাল মেনে চলা ও বাস্তবায়নের হার পরিবীক্ষণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমাদের সরকারের এক্ষেত্রে একটি অনুসৃত সামাজিক চুক্তির প্রতিপাদ্য হলো-রাজস্ব আদায়ে আনতে হবে স্বচ্ছতা, সরকারি ব্যয়ের সুবিধাসমূহ হবে দৃশ্যমান এবং নীতি হবে সামনে এগিয়ে চলার। এর মাধ্যমে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়িয়ে উন্নয়ন অর্থায়ন করে ঋণ নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা এবং জনগণকে তার প্রদেয় করের বিনিময়ে সুশাসন, নিরাপদ ও উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করা। রাজস্ব ব্যবস্থাপনা জনবান্ধব করার মাধ্যমে জনগণকে কর প্রদানে উৎসাহিত করে ক্রমান্বয়ে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ২০৩৪ সালে ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া এ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য- যোগ করেন আমির খসরু।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব প্রদান করছে, ঘাটতি অর্থায়নের বিকল্প ও সহজ শর্তের বৈদেশিক উৎস ও অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজার উন্নয়ন গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে, ঘাটতি অর্থায়ন ও এর উৎসের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ ও ঋণের ঝুঁকি হ্রাসের দিকে নজর দিচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পে রাজস্ব খাত হতে অর্থায়ন বাড়িয়ে ঋণ নির্ভরতা হ্রাস করা এবং জিডিপি'র উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমিয়ে আনা এবং ফিসক্যাল স্পেস তৈরির মাধ্যমে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করা হবে।

তিনি আরও বলেন, মধ্যমেয়াদি বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক (এমটিবিএফ) এবং মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনীতি ফ্রেমওয়ার্ক (এমটিএমএফ) প্রণয়নে একটি ডায়নামিক ম্যাক্রো ফিসকাল মডেল উন্নয়ন করে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবায়ন উপযোগী প্রক্ষেপন করে সে অনুযায়ী সেক্টরাল বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। বানিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই লক্ষ্য করেছি যে, ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি পূরণে শক্ত পদক্ষেপ প্রয়োজন। আমরা ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর, যা ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিদ্যমান ছিল। এ সময় সরকারের লক্ষ্যগুলো তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।

এর মধ্যে রয়েছে-

> মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশে নামিয়ে আনা, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন সহজতর হয়।

> রাজস্ব সংস্কার: আমরা করজাল বৃদ্ধি, কর ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন ও অটোমেশন করছি যাতে ঋণের নির্ভরতা কমে। পাশাপাশি রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশ অর্জিত হয়।

> পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা: আমরা ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ শুরু করেছি।

> বিনিযোগবান্ধব পরিবেশ: আমরা এসএমই খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছি যা প্রকৃত জিডিপি বাড়াবে এবং উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এটি করা হবে ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, ঋণ প্রাপ্তি সহজীকরণ এবং সহনীয় হারে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে।

> সামাজিক সুরক্ষা: শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ মানব উন্নয়ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষার দক্ষ সম্প্রসারণ। পুঁজিবাজারের ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে হবে বিশেষ কমিশন পুঁজিবাজারের প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, মূলধন গঠনে ব্যাংকিং খাতের পরিবর্তে পুঁজিবাজারকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে যা বাস্তবায়নে উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিএসইসিকে প্রকৃত স্বাধীনতা দেওয়া হবে, বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং গত ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ কমিশন গঠন করা হবে।

পাশাপাশি কর্পোরেট বন্ড, সুকুক ও গ্রীণ বন্ড চালু করে পুঁজিবাজারকে বহুমাত্রিক করা হবে। বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ভোগ ও রাজস্বের স্বাভাবিক চক্রকে সচল করার মাধ্যমে আমাদের সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করবে।

জেডএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ