মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ।। ১১ কার্তিক ১৪৩৩ ।। ১৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :

হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ.: বর্ণাঢ্য জীবন, কর্ম ও সাধনা (পর্ব: ৪)

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

পর্ব-৪

পূর্বপ্রকাশের পর থেকে...

রাজনীতির ময়দানে তিনি
সমাজ পরিবর্তন এবং একটি সুশৃঙ্খল ইসলামি খেলাফত ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সুমহান আদর্শের কথা যেভাবে বয়ানের মঞ্চে উচ্চারণ করতেন তিনি, সেভাবে ধর্মের সঠিক সচেতনা বাস্তবায়নের স্বার্থে পা রেখেছিলেন রাজনীতির বন্ধুর ও পিচ্ছিল পথেও। তাঁর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক জীবনের সুদৃঢ় প্রেরণার মূল উৎস ছিলেন শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ.। তাঁর দীর্ঘ সান্নিধ্য, প্রজ্ঞাপূর্ণ দিকনির্দেশনা এবং আপসহীন আন্দোলন-সংগ্রামের চেতনা আল্লামা আনছারীকে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হতে গভীরভাবে উদ্দীপ্ত করে।

১৯৯৫ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস’-এ যোগদান করেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর বলিষ্ঠ অংশগ্রহণ ও প্রচারণায় এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হওয়ার পর মাঠপর্যায়ে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি আরও গভীরভাবে পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে। সাংগঠনিক দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রথমে তাঁকে জেলা শাখার সহ-সভাপতি মনোনীত করা হয়। পরবর্তী সময়ে নিজের মেধা, প্রজ্ঞা, আন্তরিকতা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের বলে তিনি দলটির কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ লাভ করেন। শুরুতে কেন্দ্রীয় সদস্য, পরবর্তী সময়ে সমাজকল্যাণ সম্পাদক এবং সর্বশেষ দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক পর্যায়ে ‘সিনিয়র নায়েবে আমির’ হিসেবে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বলিষ্ঠ প্রতিনিধিত্ব করেন। নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং জাতীয় যেকোনো সংকটময় ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তিনি সবসময় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পক্ষে অত্যন্ত সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে জোরালো ভূমিকা পালন করেন।

জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ
জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা সর্বদা ছিল অত্যন্ত সক্রিয় ও গতিশীল। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ‘ইসলামী ঐক্যজোট’-এর ব্যানারে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পক্ষে ‘মিনার’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পরেই বিপুল পরিমাণ ভোট পেয়ে তিনি তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভাবনীয় চমক সৃষ্টি করতে সক্ষম হন।

মুসলিম উম্মাহর সংকটে
মুসলিম উম্মাহর যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ. সামনের সারির লড়াকু সৈনিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় বর্বরোচিত মুসলিম নিধনের খবর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশেও এর তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ.-এর উদাত্ত আহ্বানে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বসনিয়ায় মুজাহিদ পাঠানোর যে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার সঙ্গে তিনি সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হন এবং কাফেলা নিয়ে ঢাকার রাজপথে আয়োজিত জাতীয় সমাবেশে যোগদান করেন।

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারত সরকার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা-সংক্রান্ত ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর সেখানকার নিরস্ত্র ও নিরপরাধ মুসলমানদের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ জুলুম-নিপীড়ন। এই নির্মমতার প্রতিবাদে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস রাজপথে জোরালো প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করে। পূর্বঘোষিত সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২৭ আগস্ট জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সেই সমাবেশে যোগদানের উদ্দেশে মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন। কিন্তু গাড়ি যখন নরসিংদী পৌঁছায়, তখন হঠাৎ করেই তাঁর মুখ থেকে অবিরাম রক্তক্ষরণ শুরু হয়। টিস্যু দিয়ে চেপে ধরেও সেই রক্ত কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছিল না; তাঁর পরিধানের জামা, তোয়ালে ও হাতের রুমাল রক্তে ভিজে একাকার হয়ে যায় এবং তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন।

পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক দেখে সফরসঙ্গীরা তাঁকে দ্রুত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু তাদের সেই পরামর্শ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী অত্যন্ত আবেগঘন ও ঐতিহাসিক এক উক্তি করেন। তিনি বলেন- ‘কাশ্মীরের মজলুম মুসলমান ভাইয়েরা আজ চরম অত্যাচারিত ও রক্তাক্ত! আর আমি আমার এই সামান্য রক্তক্ষরণের অজুহাতে ঘরে বসে আরাম করব-তা কখনোই হতে পারে না!’

অত্যন্ত অসুস্থ শরীর ও চরম শারীরিক কষ্টকে উপেক্ষা করে তিনি শেষ পর্যন্ত ঢাকার বায়তুল মোকাররমের প্রতিবাদ সভায় ঠিকই উপস্থিত হন এবং মজলুম কাশ্মীরি মুসলমানদের পক্ষে জোরালো ভাষায় বক্তব্য দেন।

 এমএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ