বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬ ।। ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ২ সফর ১৪৪৮


অনলাইনের দীনদার, পরিচয় নাকি মুখোশ?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

আকিদুল ইসলাম সাদী

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে আজ জীবনসঙ্গী খোঁজাও অনেকের কাছে অনলাইনে চলে এসেছে। প্রযুক্তির এই যুগে এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং অনেকের জন্য এটি একটি বাস্তব মাধ্যম। তবে একটি বিষয় কখনো ভুলে গেলে চলবে না— অনলাইনের পরিচয় সবসময় বাস্তব চরিত্রের প্রতিফলন নয়। কখনো কখনো দ্বীনদারিতার বাহ্যিক আবরণ ব্যবহার করা হয় মানুষের বিশ্বাস অর্জন, আবেগের সুযোগ নেওয়া কিংবা প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে।

অবশ্য অনলাইনে পরিচয়ের মাধ্যমে সফল ও সুখী দাম্পত্যের উদাহরণও রয়েছে। সমস্যা অনলাইন মাধ্যম নয়; সমস্যা হলো যথাযথ যাচাই ছাড়া অন্ধ বিশ্বাস।

দাড়ি-টুপি, হিজাব, ইসলামি পোস্ট, কুরআনের আয়াত বা হাদিস শেয়ার করা— এসব ভালো কাজ হতে পারে; কিন্তু এগুলোই একজন মানুষের প্রকৃত তাকওয়া ও চরিত্রের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। প্রকৃত দ্বীনদারিতা প্রকাশ পায় তার সততা, আমানতদারিতা, লজ্জাশীলতা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং আল্লাহভীতির মাধ্যমে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, "হে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা ভালোভাবে যাচাই করে নাও। অন্যথায় অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে ফেলবে, অতঃপর নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হবে।"

— সূরা আল-হুজুরাত: ৬

যদিও এই আয়াত সংবাদ যাচাইয়ের প্রসঙ্গে নাজিল হয়েছে। তবে এর শিক্ষা আরও ব্যাপক। মানুষের পরিচয়, দাবি এবং বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রেও যাচাই-বাছাই ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি।

দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, কেউ কেউ বিয়ের আশ্বাস দিয়ে দীর্ঘদিন সম্পর্ক বজায় রেখে আবেগের সুযোগ নেয়, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য সংগ্রহ করে এবং একপর্যায়ে আপত্তিকর দাবিও করে বসে। এসব কাজ ইসলামের শিক্ষা নয়; বরং এটি প্রতারণা, আমানতের খিয়ানত এবং একজন মুসলিমের চরিত্রের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

রাসুলুল্লাহ স. বলেছেন, "যখন এমন ব্যক্তি তোমাদের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে, যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তখন তার সঙ্গে বিয়ে সম্পন্ন করো। যদি তা না করো, তবে পৃথিবীতে ফিতনা ও ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।"

— জামে আত-তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৪; সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস: ১৯৬৭

জীবনসঙ্গী নির্বাচন শুধু আবেগের ভিত্তিতে নয়; পরিবার, অভিভাবক এবং বিশ্বস্ত মানুষের পরামর্শ নিয়ে, যথাযথ খোঁজখবর ও যাচাই-বাছাই করে হওয়া উচিত। অনলাইনে পরিচিত কারও প্রতি অন্ধ বিশ্বাস কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

মনে রাখতে হবে, একজন মুমিনের সম্মান, লজ্জাশীলতা ও আত্মমর্যাদা তার অমূল্য সম্পদ। সাময়িক আবেগের কাছে এগুলো বিসর্জন দেওয়া নয়; বরং এগুলোর হেফাজত করাই প্রকৃত তাকওয়ার পরিচয়। কারণ, একটি ভুল সিদ্ধান্ত শুধু একটি সম্পর্ক নয়, কখনো কখনো একটি মানুষের সম্মান, মানসিক শান্তি এবং পুরো ভবিষ্যৎকেও বিপন্ন করে দিতে পারে।

অনলাইনে পরিচয় হতে পারে, কিন্তু বিয়ের সিদ্ধান্ত কখনোই শুধু প্রোফাইল, ছবি বা মিষ্টি কথার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। বিশ্বাসের ভিত্তি হওয়া উচিত সততা, চরিত্র, পরিবার ও সমাজের মাধ্যমে যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল। কারণ, প্রকৃত দ্বীনদারিতা প্রোফাইলে নয়—প্রকাশ পায় মানুষের আমল, আখলাক ও দায়িত্বশীলতায়।

লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও ঔপন্যাসিক

আরএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ